ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৬ ১৬:২৩ Asia/Dhaka

সুরা আন্‌ফাল মদিনায় অবতীর্ণ একটি সুরা। এতে রয়েছে ৭৫টি আয়াত ও দশটি রুকু। অবতীর্ণ হওয়ার ধারাক্রম অনুযায়ী এ সুরা হল ৮৮ নম্বর সুরা। কিন্তু চূড়ান্ত সংকলন বা বিন্যাসে এ সুরা পবিত্র কুরআনের অষ্টম সুরা হিসেবে স্থান পেয়েছে। 'আন্‌ফাল' নাফল শব্দের বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ অতিরিক্ত ও অনুগ্রহ।

আর প্রচলিত অর্থে গনিমতের মালকে বলা হয় আন্‌ফাল। মিলের দিকটি হলো আন্‌ফালও মহান আল্লাহর এক অনুগ্রহ। আর ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে আন্‌ফাল বলা হয় কয়েকটি জিনিসকে: প্রথমত দারুল হারব বা কাফির শত্রুদের শাসিত অঞ্চলের যে সম্পদ বিনা যুদ্ধে অর্জিত হয়। দ্বিতীয়ত সেই ভূখণ্ড যার অধিবাসীরা বিনা যুদ্ধে বহিষ্কৃত হয়েছে। তৃতীয়ত সেই ভূখণ্ড যা বিনা যুদ্ধে মুসলমানদের অধীনে এসেছে। চতুর্থত মুসলমান ও কাফির নির্বিশেষে যে ভূখণ্ডের সব অধিবাসী মারা গেছে। পঞ্চমত সেইসব বন, মরুদ্যান ও ঘর যার কোনো মালিক নেই। ষষ্ঠত পাহাড়ের পাদদেশ। সপ্তমত রাজা-বাদশাহদের রাজকীয় ও শাহী আসবাবপত্র যা তারা নানা ব্যক্তিকে উপহার হিসেবে দিয়েছে ও বর্তমানে তার মালিক নেই এবং অষ্টমত খনি ইত্যাদি।

 সুরা আন্‌ফালের প্রথম আয়াতে এসেছে:

'হে রাসূল! তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, আন্‌ফাল বা গনিমত (তথা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদ ছাড়া অন্য যে কোনো সম্পদ) সম্পর্কে। বলে দিন, গণীমতের মাল হল আল্লাহ এবং রসূলের জন্য নির্দিষ্ট। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়গুলো সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।'

এ আয়াত বদর যুদ্ধে নাজিল হয়েছিল। এ যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে কাফিররা পালিয়ে গেলে তাদের বহু জিনিসপত্র গনিমত হিসেবে মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং বন্দী হয় অনেক কাফির। সাহাবিরা সে সময় তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করছিলেন: সাহাবি সাদ বিন মায়াজসহ কেউ কেউ মহানবী (সা.)'র তাঁবুর চারদিকে পাহারায় ছিলেন। হযরত আলী (আ.)সহ কেউ কেউ কাফির নিধনে মশগুল ছিলেন। আর কেউ কেউ গনিমতের মাল জমা করতে ব্যস্ত ছিলেন। একদল মুজাহিদের মনে করে যে তারা যুদ্ধ করাতেই জয় এসেছে বলে গনিমতের পুরো মাল তাদেরই প্রাপ্য। আবার যারা গনিমত সংগ্রহ করছিলেন তারাও একই ধারণা করছিলেন। তখন এ আয়াত নাজিল হয়। এতে বলা হয়েছে যে, এইসব মাল বা গনিমত কেবলই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। তাই তাঁরা যাকে যতটা যোগ্য মনে করেন তাকে ঠিক ততটাই গনিমতের অংশ দেবেন।

সুরা আনফালের প্রথম আয়াতটিকে গনিমতের মাল সংক্রান্ত বিশেষ বিধান বলে মনে হলেও আসলে এটি একটি সামগ্রিক হুকুম বা বিধান যা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদ ছাড়া সব ধরনের সম্পদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী এইসব সম্পদ মহান আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং রাসুলের স্থলাভিষিক্তের জন্য তথা অন্য কথায় ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট যাতে এইসব সম্পদকে মুসলিম জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। তাই আনফাল হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বায়তুল মালের অন্যতম প্রধান উৎস।

আর যুদ্ধে অর্জিত গনিমতের ৫ ভাগের চার ভাগ মুজাহিদদের প্রাপ্য এবং এটা তাদের কষ্ট ও পরিশ্রমের আংশিক প্রতিদান। বাকি এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে খোমস যার ব্যবহারের খাতগুলো এই সুরার ৪১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। (আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনিমত হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার ওপর নাজিল করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল।)

 সুরা আনফালের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ আয়াতে মহান আল্লাহ মু'মিনদের ৫টি বড় গুণের কথা উল্লেখ করেছেন:

যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কুরআনের বাণী, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজ প্রতিপালকের ওপর ভরসা রাখে। তারা হচ্ছেন সেইসব ব্যক্তি যারা নামায কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুজি দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হল সত্যিকার ঈমানদার! নিজ প্রতিপালকের কাছে তাদের জন্য রয়েছে মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।

সমস্ত জীবন্ত সত্তার রয়েছে বেড়ে ওঠার ও পূর্ণতা লাভের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত মু'মিনও তাই সব সময়ই উন্নতির সংগ্রামে মশগুল। তাদের ঈমান একটি বাড়ন্ত গাছপালার মতই দিনকে দিন বিকশিত হয় এবং ফুল ও ফল দান করে। তারা কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা করে। তারা নামাজ কায়েম করে যা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক এবং তাদেরকে যে রুজি দেয়া হয় তা থেকে দান করে।

সুরা আনফালের অনেক আয়াত বদর যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধের প্রকৃতি সম্পর্কিত।মক্কার অন্যতম প্রধান সর্দার আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গী আমর ইবনুল আস সিরিয়া থেকে ব্যবসায়ের মালপত্র নিয়ে মক্কায় আসছিল। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবী (সা.) এ সংবাদ জানিয়ে জিহাদের নির্দেশ দেয়া হয়। বিশ্বনবী (সা.) ৩১৩ জনের এক ক্ষুদ্র সেনাদল নিয়ে রওনা হন। মক্কার মুশরিক ও কাফিররা সেখান থেকে হিজরতকারী মুসলমানদের সহায়-সম্পদ দখল করেছিল বলে আবু সুফিয়ানের এই কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে মুসলমানরা সেইসব সম্পদের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারতো।

কিন্তু আবু সুফিয়ানের গুপ্তচররা মুসলমানদের হামলার প্রস্তুতির খবর তাকে জানিয়ে দেয়। ফলে সে মক্কা থেকে কাফিরদের সাহায্য চায়। আবু জাহেল মক্কার কুরাইশদের নানাভাবে উত্তেজিত করে প্রায় এক হাজার সদস্যের একটি সেনাদল তৈরি করে যুদ্ধের জন্য রওনা হয়। পথে উভয় পক্ষের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়। মহানবী (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কারণ সাহাবিদের অনেকেই শত্রুর সেনাসংখ্যার আধিক্যে ভয় পেয়েছিলেন।#