সততার পুরস্কার
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, যারা তাদের চরিত্রের সৌন্দর্য দিয়ে, তাদের আচার আচরণ দিয়ে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারাই সচ্চরিত্রবান। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী মানুষেরা ভদ্র, নম্র, ও বিনয়ী হয়ে থাকেন।
বহু বর্ণনায় এসেছে, চারিত্রিক সততা ও সৌন্দর্য কিয়ামতের দিনের জন্যে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যার এই সৎ গুণটি থাকবে সে বহু রকম সহযোগিতা পাবে এবং বহুভাবে তাকে সাহায্য করা হবে। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে যে, শত্রুরা নবীজীকে নিপীড়ন করার জন্যে তাঁর কাছে এসেছিল, কিন্তু নবীজীর আচরণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অপমান করা তো দূরে থাক উল্টো বরং সমূহ আন্তরিকতার সাথে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেছে। নবী করিম (সা) বলেছিলেন: ‘সদাচরণ ও চারিত্রিক সততা- দ্বীনের অর্ধেক’।
সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎ-সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গী হও।’ (সুরা তওবা : ১১৯)
অন্যদিকে নবী কারীম (স.) বলেছেন, চারটি জিনিস যার মধ্যে থাকে তার ইসলাম পরিপূর্ণ হয়। এগুলো হলো- সততা, কৃতজ্ঞতা, লজ্জা এবং সদাচরণ। তিনি আরও বলেছেন, 'নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় আর পুণ্য নিয়ে যায় জান্নাতের দিকে।'
বন্ধুরা, রংধনু আসরে আমরা সততার পুরস্কার সম্পর্কে দুটি গল্প প্রচার করেছি। আর গল্প শেষে আছে একটি গান।
গল্প-১
অনেক দিন আগের কথা। এক বাদশাহর দরবারে আব্দুল করিম নামে এক চাকর কাজ করতো। বাদশাহ তাকে খুব বিশ্বাস করত এবং ভালোবাসত। তার প্রতি বাদশাহর আন্তরিকতা দেখে দরবারের অন্যান্য চাকরা হিংসা করতে লাগল। একবার দরবারের সকল চাকর-বাকর মিলে বাদশাহর কাছে আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে নালিশ করল। তাদের একজন বলল, “জাঁহাপনা, আমরা জানতে পেরেছি যে, আব্দুল করিম আপনার বাজার সদাই করে প্রতিদিনই কিছু কিছু পয়সা বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজে সেগুলো আত্মসাৎ করে। আপনাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য সে সব সময় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে বলে।”
আব্দুল করিমের বিরুদ্ধের চাকরদের অভিযোগ শোনার পর বাদশাহ বললেন, “ঠিক আছে, এখন থেকে আমি তার প্রতি খুব কড়া নজর রাখবো-যাতে সে আর আমাকে ধোঁকা দিতে না পারে।”
বাদশাহর কথা শুনে চাকররা মনে মনে খুশী হয়ে দরবার ত্যাগ করল।
এর কয়েকদিন পরের কথা। বাদশাহ জানতে পারলেন, শহরে এক লোক এসেছে, যে আংটির ওপর নাম লিখে দেয়। বাদশাহ তার আংটির ওপর নাম লিখানোর ইচ্ছা করলেন। তিনি এক চাকরকে ডেকে বললেন, ওই লিপিকারের কাছ থেকে জেনে এসো তো, সে নাম লিখতে অক্ষর প্রতি কত করে নেয়? চাকর গিয়ে লিপিকারের কাছ থেকে জেনে এসে বাদশাহকে জানাল যে, সে আংটির ওপর নাম লিখতে অক্ষর প্রতি পঞ্চাশ পয়সা করে নেয়। এবার বাদশাহ বললেন, যাও আব্দুল করিমকে পাঠিয়ে দাও।
বাদশাহর তলব পেয়ে আব্দুল করিম এসে হাজির হলো। বাদশাহ তাকে বললেন, 'শহরের অমুক স্থানে একজন লিপিকার এসেছে। আমি তার কাছ থেকে আংটিতে আমার নাম লেখাতে চাই। তুমি এক্ষুণি তার কাছ থেকে আরবীতে আমার নাম 'হাসান' লিখে নিয়ে এসো।' এই বলে বাদশাহ তাকে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা এবং তার আংটিটি দিয়ে দিলেন।
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো যে, বাদশাহ কেন এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা দিলেন? বাদশাহর নাম হাসান লিখতে আরবীতে তিনটি অক্ষর অর্থাৎ হা, সীন ও নুন লাগে। অক্ষর প্রতি পঞ্চাশ পয়সা করে নিলে খরচ আসে, এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা অর্থাৎ দেড় টাকা।
টাকা নিয়ে আব্দুল করিম নাম লেখাতে চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর আংটির ওপর বাদশাহর নাম 'হাসান' লিখিয়ে নিয়ে এল এবং বাদশাহকে আংটির সাথে পঞ্চাশ পয়সা ফেরত দিল।
পয়সা ফেরত পেয়ে বাদশাহ খুবই আশ্চর্য হলেন! তিনি মনে মনে ভাবলেন, 'আমি তো তাকে হিসাব করে পয়সা দিয়েছি, তাহলে সে পঞ্চাশ পয়সা বাঁচাল কী করে? আর বাঁচিয়েছিল ভালো কথা কিন্তু আমাকে তা ফেরত না দিলে তো আমার বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তাহলে দরবারের চাকররা যে অভিযোগ করেছে তা নিশ্চয়ই সত্য নয়।'
এসব ভাবনা-চিন্তার পর বাদশাহ আব্দুল করিমকে লক্ষ্য করে বললেন, আচ্ছা তুমি বলোতো, লিপিকার প্রতি হরফ প্রতি কত পয়সা নিয়ে থাকে? আব্দুল করিম জবাব দিলেন, সে হরফ প্রতি পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে থাকে। বাদশাহ বললেন, তুমি ঠিকই বলেছো। কারণ, তোমাকে পাঠানোর আগে আমি অন্য একজনকে পাঠিয়ে জেনেছি যে, লিপিকার অক্ষর প্রতি পঞ্চাশ পয়সা নেয়। তাই আমি তোমাকে হিসাব করে এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা দিয়েছি। তারপরও তুমি পয়সা বাঁচালে কি করে?
আব্দুল করিম এবার মুচকি হেসে বলল, জাঁহাপনা, আপনি যখন পয়সা বাঁচানোর রহস্য জানতে চাইছেন তবে বলছি, আমি ওই লিপিকারের কাছে গিয়ে হাসান লেখার পরিবর্তে 'খস' লিখতে বললাম। আরবীতে 'খস' লিখতে দরকার হয়,'খা' আর 'সীন' এই দুটি অক্ষর। আমার কথামতো লিপিকার যখন 'হা' ও 'সীন' লিখল। এরপর 'হা' এর উপর যখন ফোঁটা দিতে শুরু করল তখন আমি তাকে বললাম, ভাই ফোঁটাটা 'হা'-এর উপর না দিয়ে 'সীন'-এর পেটের মধ্যে রেখে দিন। সে তাই করল। ফলে এখন হাসান লেখা হয়ে গেল! এরপর আমি তাকে দুই অক্ষরের জন্য এক টাকা দিয়ে চলে এলাম। এভাবেই আমি পঞ্চাশ পয়সা বাঁচিয়েছি।
বাদশাহ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আব্দুল করিমের কথা শুনলেন। তার অদ্ভূত বুদ্ধির কাহিনী শুনে তিনি খুবই মুগ্ধ হলেন। দরবারে সবাইকে ডেকে তিনি আব্দুল করিমের বুদ্ধি ও সততার কাহিনী শোনালেন। এ ঘটনা শুনে যারা আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল তারা খুবই লজ্জিত হলো। বাদশাহ নিজ আসন থেকে উঠে আব্দুল করিমকে বুকে টেনে নিলেন। সেদিন থেকে আব্দুল করিমের মর্যাদা অনেকে বেড়ে গেল।
গল্প-২
এক রাজা ও সৎ যুবকের গল্প শোনাব। এক দেশের রাজা একদিন অনুভব করলেন উনি বৃদ্ধ হচ্ছেন। সিংহাসনের জন্য তার একজন উত্তরসূরি রেখে যেতে হবে। কিন্তু তার পুত্র-কন্যা আর মন্ত্রিসভার সবাই ভয়ানক দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিল। কারও ওপর ভরসা করতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিলেন জনগণের মধ্য থেকেই একজন যোগ্য লোক খুঁজে নেবেন এবং কিছু সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে রাজ্য চালাবার জন্য উপযুক্ত করে তুলবেন।
যেই ভাবা সেই কাজ। একদিন রাজ্যের ১৭-১৮ বছর বয়সী হাজারখানেক তরুণ-তরুণীকে একটি ময়দানে ডাকা হলো। তাদের মধ্যে ওই রাজার পুত্র-কন্যারাও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ করার সুযোগ পেল।
রাজা সবাইকে একটা করে বীজ দিয়ে বললেন, এটা একটা বিশেষ ধরনের বীজ। এটা তোমরা সবাই রোপন করবে, যত্ন নেবে, পানি দেবে। এক বছর পর যার বৃক্ষ সবচেয়ে সুন্দর হবে, সেই এই রাজ্য শাসন করার জন্য নির্বাচিত হবে। সেই পারবে আমার জনগণের ঠিক ভাবে যত্ন নিতে।
এরপর সবাই বীজ নিয়ে যার যার বাড়ি চলে গেল। যুবকদের মধ্যে এদের একজনের নাম ছিল আনিস। আনিস তার মায়ের সাহায্যে বীজটি রোপণ করল।
কিন্তু অনেক যত্ন নেবার পরও কোনো চারা বের হতে না দেখে আনিস খুব হতাশ হয়ে পড়ল। মাসখানেক পরেই নির্বাচিত অনেকের মুখেই ওদের চারা গাছের গল্প শুনতে পেল। কয়েক মাসেই অনেকের চারা বৃক্ষে পরিণত হল। আনিস ভাবছিল, নিশ্চয়ই তার কোনো পাপের কারণে বীজ থেকে চারা বেরুচ্ছে না। আনিস ওর কষ্টের কথা ওলজ্জায় কাউকে বলতেও পারল না।
এক বছর পর নির্দিষ্ট দিনে একটা বিশাল মাঠে সবাই যার যার বৃক্ষ তুলে নিয়ে হাজির। আনিস লজ্জায় যেতে চাইল না। ওর মা জোর করে পাঠাল। খালি টব নিয়ে আনিস পিছনের এককোণায় কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল সবার কী সুন্দর সুন্দর বৃক্ষ! আনিসের খালি টব দেখে অনেকে খুব হাসাহাসি করল, ব্যঙ্গ করল নানাভাবে।
এক সময় রাজা এসে ঘুরে ঘুরে সবার গাছ দেখলেন। তারিফও করলেন অনেককে। হটাৎ রাজার নজর পড়ল আনিসের উপর। রক্ষীদের বলে তিনি আনিসকে মঞ্চে নিয়ে গেছেন। আনিস ভাবল, বীজ মারা যাওয়াতে তার সম্ভবত বড় শাস্তি হতে যাচ্ছে। কিন্তু রাজা সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোষণা দিলেন, পরবর্তী রাজার নাম আনিস। এরপর সমবেত তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে তিনি বললেন, “তোমাদের সবাইকে একটা করে বীজ দিয়েছিলাম। কিন্তু বীজগুলো ছিল সিদ্ধ। যেগুলো দিয়ে কোনোভাবে চারা বেরই হবার কথা নয়। আনিস ছাড়া তোমরা সবাই ফুল, চারা ও গাছ এসব নিয়ে হাজির হয়েছো। তোমরা কখনোই বীজ থেকে চারা বের হতে দেখনি, সবাই অন্য বীজ লাগিয়ে মিথ্যা গল্প সাজিয়েছ। একমাত্র আনিস সাহস আর সততার সাথে তার ব্যর্থতা নিয়ে হাজির হয়েছে। একমাত্র ওর মধ্যেই এই রাজ্য শাসন করার মত নীতি আর চরিত্র আছে।”
রাজার কথা শুনে সবাই লজ্জায় লাল হয়ে গেল আর আনিসের মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪