পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (আবু রায়হান বিরুনি-৩)
পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার ১৭তম পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আবু রায়হান বিরুনির জীবনের নানা দিক ও বিশেষ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় তার কিছু অবদানের কথা আমরা গত পর্বের আলোচনায় তুলে ধরেছি। আজও আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে বিশ্ববিশ্রুত এই মনীষীর অবদান নিয়ে কথা বলব।
ঝর্ণা ও ফোয়ারার পানি কিভাবে উপরের দিকে ওঠে আলবিরুনি তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এরই আলোকে কুয়া বা ঝর্ণার পানির প্রবাহকে কিভাবে পাহাড়ের চুড়ায় বা উঁচু মিনারে তোলা যায় সেই পদ্ধতি তিনি উল্লেখ করে গেছেন। বিরুনি পৃথিবীর আয়তক্ষেত্র পরিমাপ করেছিলেন। তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধের পরিমাপ সম্পর্কিত নানা সমীকরণও উল্লেখ করে গেছেন তার নিজের লেখা ‘উস্তুরলবাত’ শীর্ষক বইয়ের শেষের দিকে। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা বিরুনির নামে এই সমীকরণগুলোর নামকরণ করেছেন।
বিরুনি নানা দেশের প্রচলিত বর্ষ, মাস ও সপ্তা’র দিনগুলোর বর্ণনা এবং বহু দেশের ইতিহাসও লিখে গেছেন। তিনি ১৮ ধরনের মূল্যবান পাথরের ঘনত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ও এ সংক্রান্ত একটি সারণী বা তালিকা তৈরি করেছিলেন। সমসাময়িক যুগের বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতরা বিরুনির এইসব তথ্য ব্যবহার করতেন। তারা বিরুনিকে একজন অত্যন্ত বড় মাপের বিজ্ঞানী হিসেবে সম্মান করতেন।
আলবিরুনি পৃথিবীর দ্রাঘিমা রেখার পরিমাপ বের করেছিলেন। তার হিসেবে এর দৈর্ঘ্য ছিল ১১ হাজার ৬২ দশমিক চার কিলোমিটার। আধুনিক যুগের হিসেবে এই দৈর্ঘ্য ১১ হাজার ১১০ কিলোমিটার। অর্থাৎ বিরুনির পরিমাপ করা দ্রাঘিমার হিসেবের সঙ্গে আধুনিক নিখুঁত হিসেবের খুব একটা পার্থক্য হয়নি। অথচ বিরুনি ছিলেন এক হাজার বছর আগের একজন গবেষক! এক্ষেত্রে বিরুনির আবিষ্কৃত বিশেষ পরিমাপ-পদ্ধতিটিকে পশ্চিমারা সপ্তদশ শতকের রাইট নামক ব্যক্তির আবিষ্কার বলে প্রচার করে আসছেন। অথচ মূল আবিষ্কারক হলেন আল-বিরুনি।
বিরুনির সবচেয়ে সাড়া-জাগানো বইগুলোর মধ্যে ‘আসার আল বাকিয়া’ অন্যতম। এটি বহু বছর আগে ইউরোপে অনূদিত হয়েছে। বিশ্ব-ইতিহাস বিষয়ে এ বইটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত হয়। গবেষকরা মনে করেন, আমরা যদি নানা জাতির পরিচিতি ও ইতিহাস বিষয়ে বিরুনির গবেষণাগুলোকে উপেক্ষা করি, তবুও ইতিহাস বিষয়ে বিরুনির কেবল এই একটি বইই সমসাময়িক যুগের নানা জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিরুনির চিন্তাধারার গভীরতার সাক্ষ্য তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট হত।
‘আসার আল বাকিয়া’ নামক বইটিতে আলবিরুনি নানা জাতির বিশ্বাস, প্রথা ও সম্প্রদায় এবং তাদের মধ্যকার নানা মিল ও অমিল নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বিরুনি এই বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বনি ইসরাইল বংশে জন্ম-নেয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী নবী-রাসুল এবং রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। এ ছাড়াও তিনি অ্যাসিরিয়া, ব্যাবিলন, ইরান ও রোমের শাসকদের এবং ফিরআউন উপাধিধারী মিশরের শাসকদের ইতিহাসও তুলে ধরেছেন। ইরানের হাখামানেশিয়, পার্থিয়ান ও শাসানিয় রাজাদের ইতিহাসসহ পারস্যের কিংবদন্তীতুল্য রাজাদের ইতিহাসও স্থান পেয়েছে বিরুনির ‘আসার আল বাকিয়া’ বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে। বিরুনি ঐতিহাসিক কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণে কোনো অসঙ্গতি দেখতে পেলে এ সম্পর্কে প্রচলিত সব বর্ণনাই তুলে ধরতেন তার লেখা ইতিহাসে। অবশ্য বড় বড় গবেষকরাও যেমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল করেন তেমনি আল-বিরুনিও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ভুল করেছেন। আসার আল বাকিয়া বইটির অনুবাদ লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সনে। বইটি অনুবাদ করেছেন অ্যাডওয়ার্ড যাখাও।
আলবিরুনির আরেকটি অমর বই হল ‘তাহকিক মালাল আল হিন্দ’। এ বইটি সমাজবিজ্ঞানে মুসলিম গবেষকদের বিস্ময়কর অগ্রগতির স্বাক্ষর বহন করছে। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাদের এই দক্ষতা গড়ে উঠেছিল নানা দেশ সফরের সুবাদে। বিরুনি এই বইয়ে জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিত বিষয়ে ভারতীয়দের মতামত এবং হিন্দুদের নানা ধর্ম-বিশ্বাসের পাশাপাশি ভারতের ভৌগলিক ও ভূতাত্ত্বিক নানা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। অনেকেই মনে করেন যে পশ্চিমা পণ্ডিতরা মূলত এ বইয়ের মাধ্যমেই ভারত সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। বিরুনির এই বই ভারতীয়দের ধর্ম, প্রথা, ইতিহাস ও নানা জ্ঞান সম্পর্কে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বই হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই বিরুনিকে তুলনামূলক নৃতত্বের অগ্রপথিকও বলা যায়।
ভারত সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা চালাতে গিয়ে নানা বিপত্তির শিকার হতে হয়েছিল বিরুনিকে। কারণ, সে যুগের ভারতীয়রা মুসলমানদের সঙ্গে সখ্যতা রাখত না। আর ভারতীয়দের ভাষা শেখাও ছিল বিরুনির জন্য বেশ কঠিন ব্যাপার। তা সত্ত্বেও বিরুনি সংস্কৃতি ভাষা শিখেছিলেন এবং তিনি এর মাধ্যমে ভারত সফরের সময় নানা অঞ্চলের ভারতীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
‘তাহকিক মালাল আল হিন্দ’ বইয়ে বিরুনি হিন্দুদের নানা প্রথা এবং আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে নিরপেক্ষ মতামত দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এ বইয়ে তিনি হিন্দু জাতিগুলোর চিন্তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যান্য জাতির চিন্তা-বিশ্বাসের পার্থক্য তুলে ধরতে গিয়ে এ বিষয়ে চমৎকার তুলনামূলক গবেষণা আর বিশ্লেষণ উপহার দিয়েছেন। যেমন, বিরুনি খ্রিস্ট-পূর্ব যুগের গ্রিকদের চিন্তাধারা ও বিশ্বাসের সঙ্গে ভারতীয় হিন্দুদের চিন্তা-বিশ্বাসের তুলনা করেছেন। বইটির অন্য অংশে ভারতের জাতিভেদ প্রথার সঙ্গে শাসানিয় যুগের ইরানিদের জাতিভেদ প্রথার তুলনা করেছেন বিরুনি। এই দুই দেশের সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ব্যাপক মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় হিন্দুদের বিয়ের আচার-অনুষ্ঠানগুলো তুলে ধরার সময় তিনি ইরানিদের, ইহুদিদের ও ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবদের আচার-অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কেও মতামত ব্যক্ত করেছেন।
আলবিরুনির আরেকটি অমর বই হল কানুনে মাসুদি। বইটির বিষয়বস্তু হল জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল ও গণিত। এ বইয়ের রয়েছে ১১টি অধ্যায়। বইটি মুসলিম জ্যোতির্বিদদের সুস্পষ্ট অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করছে। এ বইয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল গতিবিধি তুলে ধরেছেন আল বিরুনি। এ বইয়ে বিরুনি তার উদ্ভাবিত ত্রিকোণমিতির নানা সূত্র তুলে ধেরেছেন। বিশেষ করে তিনি ‘সাইন’ কোনের সম্প্রসারণ সম্পর্কিত একটি সমীকরণও উল্লেখ করেছেন এ বইয়ে যার সঙ্গে নিউটনের সমীকরণের ব্যাপক মিল রয়েছে। এ বইয়ে আলবিরুনি ভৌগলিক আকার ও আকৃতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন তার নানা অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে। আর এ সংক্রান্ত সারণীও দিয়ে গেছেন তিনি যাতে এ বিষয়ে আরও গবেষণা করা যায়। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে ভারতের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৯ সনে।
আলবিরুনি অতীতের গবেষক ও লেখকদের লেখা এবং মন্তব্যের ওপর সব সময় নির্ভর করেননি। অনেক ক্ষেত্রে তিনি তাদের নানা মতকে চ্যালেঞ্জও করেছেন। বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের মতামতকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন বিরুনি। অন্যদের ও নিজের তত্ত্ব মূল্যায়নের জন্য বিরুনি পুরো বিষয় সম্পর্কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং এমনকি সাধারণ জনগণের মতামতও নিতেন।
আলবিরুনিই হচ্ছেন একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি তার পূর্বসূরিদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা করেছেন ও তাদের মতামতের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। বিরুনি কেবল বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়েই বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর ফলে বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ক গবেষকদের জন্য এ ক্ষেত্রে এক নতুন ধারার সূচনা হয়েছে।
বিরুনি অনেক ভাষা জানতেন। তিনি ফার্সি, তুর্কি, আরবি, হিব্রু, সিরিয়াক ও সংস্কৃতি ভাষায় খুব দক্ষ ছিলেন। গ্রিক ভাষাও মোটামুটি জানতেন তিনি। সভ্যতা ও সংস্কৃতিগুলোকে জানার জন্য সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলো শেখা যে সব কিছুর আগে জরুরি তা বিরুনি উপলব্ধি করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট অনুবাদ এক্ষেত্রে তেমন লাভজনক নয় বলে তিনি মনে করতেন। তাই ভারত সফরে গিয়েই তিনি প্রথমেই সংস্কৃতি ভাষা শেখেন। তিনি এই ভাষা এতটা আয়ত্ত করেন যে তিনি সংস্কৃতি থেকে আরবিতে কয়েকটি বই অনুবাদ করেন এবং গ্রিক ভাষা থেকে কয়েকটি বই সংস্কৃতিতে অনুবাদ করতে সক্ষম হন। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/১