সুরা আম্বিয়ার প্রাথমিক পরিচিতি ও এর কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা
সুরা আম্বিয়া পবিত্র কুরআনের ২১ তম সুরা। এতে রয়েছে ১১২টি আয়াত। হিজরতের আগে নাজিল হয়েছে বলে এটি অন্যতম মাক্কি সুরা। আম্বিয়া শব্দটি নবী শব্দের বহুবচন।
সুরা আম্বিয়ায় ১৮ জন নবীর নাম এসেছে। তাঁদের জীবনের কোনো কোনো ঘটনা ও কখনওবা তাঁদের জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনার কেবল ইঙ্গিত এ সুরায় এসেছে। আর এই মহান নবীরা হলেন: হযরত মুসা, হারুন, ইব্রাহিম, লুত, ইসহাক, ইয়াকুব, নুহ, দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইসমাইল, ইদ্রিস, জুলকিফল, জুন্নুন বা ইউনুস, জাকারিয়া এবং ইয়াহইয়া (আলাইহিমুসসালাম)। এ ছাড়াও এসেছে মহান নবী ঈসা (আ) এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা)’র পবিত্র নাম।
মহান ও সৎ ব্যক্তিরা জীবনে অনেক কঠিন সংকট ও সমস্যার শিকার হন। এসবই অনেক সময় মহান আল্লাহর পরীক্ষা মাত্র। নবীর-রাসুলরাও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁদের ওপর নেমে আসা পরীক্ষা বা বিপদ ছিল সবচেয়ে কঠিন। সেইসব কঠিন অচলাবস্থার মধ্যে তাঁরা মহান আল্লাহর দয়া ও করুণার শরণাপন্ন হতেন। মহান আল্লাহও তাঁদের প্রার্থনা শুনতেন এবং অচলাবস্থা বা সংকট থেকে মুক্তি দিতেন। যেমন, ইব্রাহিম নবীকে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে ও ইউনুস নবীকে মাছের পেট থেকে মুক্ত করার ঘটনা এবং জাকারিয়া নবীকে বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে তথা জীবন-সায়াহ্নে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ইয়াহিয়া নামক সন্তান দান করা। আর ওই সন্তান ছিলেন মহান এক নবী। (এখানে) তাঁদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে জানাচ্ছি সালাম।
সুরা আম্বিয়া শুরু হয়েছে এক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে। এতে বলা হয়েছে:
মানুষের হিসাব-কিতাবের সময় আসন্ন; অথচ তারা বেখবর হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে এতই মত্ত যে, যখন তাদের কাছে তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে যখনই কোন নতুন উপদেশ আসে, তারা তা খেলার ছলে শোনে।
অর্থাৎ যখনই কোনো আয়াত নাজিল হত ও বিশ্বনবী (সা) সেই আয়াত পড়ে শোনাতেন তখন মক্কার কাফির-মুশরিকরা শুনেও না শোনার ভান করত এবং বিষয়টিকে ক্রীড়া-কৌতুক হিসেবে গ্রহণ করত। অথচ তাদের উচিত ছিল এইসব জাগরণী-বার্তাকে গুরুত্ব দেয়া এবং এ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা। কারণ, তাদের ভাগ্যের ওপর কুরআনের এইসব বাণীর গভীর প্রভাব রয়েছে। আসলে যারা দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের চিন্তায় সব সময় ব্যস্ত থাকে তারাই আল্লাহকে এবং পরকাল বা বিচার-দিবসের কথা ভুলে যায় বলে কুরআনের এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তি নবী-রাসূলদের দাওয়াত গ্রহণ করবে না-এটাই স্বাভাবিক। একই কারণে মক্কার কাফির-মুশরিকরা বিশ্বনবী (সা) সম্পর্কে নানা অযৌক্তিক ও অশালীন কথা বলত এবং নানা অপবাদ দিত। তারা বিশ্বনবী (সা)-কে জাদুকর বলে অপবাদ দিত এবং বলত যে তিনি জাদুময় বাণীর মাধ্যমে মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করছেন! আবার বিশ্বনবীর সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার জন্য ও কুরআন থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য তারা কখনও কখনও এটাও বলত যে, মুহাম্মাদ একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। তার বক্তব্যের প্রভাব আসলে জাদুরই প্রভাব।
মক্কার কাফির ও মুশরিকরা এও বলত যে, মুহাম্মাদ ওহি বলে যা প্রচার করছেন তা আসলে তার অসংলগ্ন ও খারাপ কিছু স্বপ্ন মাত্র যাকে সে সত্য বলে মনে করছে! (নাউজুবিল্লাহ) আবার তারা এটাও বলত যে, মুহাম্মাদ একজন মিথ্যাবাদী, সে নিজের কথাকে আল্লাহর কথা বলে প্রচার করছে! (নাউজুবিল্লাহ) কখনও কখনও কাফিররা বলত: মুহাম্মাদ একজন কবি। তাঁর বক্তব্যগুলো তারই কাব্যময় কল্পনা মাত্র! তারা এও বলত, মুহাম্মাদ যদি সত্যিই আল্লাহর নবি হতেন তাহলে পূর্ববর্তী নবীরা যেমন মু’জিজা দেখিয়েছেন তেমনি তিনিও মু’জিজা বা অলৌকিক নানা নিদর্শন দেখাতেন। আল্লাহর নবি হয়ে থাকলে তাঁকে মু’জিজা দেখাতে হবে। এভাবে কাফির-মুশরিকরা বিশ্বনবী (সা) সম্পর্কে পরস্পর-বিরোধী ও স্ববিরোধী নানা কথা বলত। আর এ থেকেই বোঝা যায় তারা সত্যকে জানার চেষ্টা করত না। আসলে তারা যে কোনো উপায়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে ময়দান থেকে নির্মূল করতে চেয়েছিল।
সুরা আম্বিয়ার সাত ও আট নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: ‘(হে নবি! ) আপনার আগে আমি মানুষই পাঠিয়েছি, যাদের কাছে আমি ওহি পাঠাতাম। তাই তোমরা যদি না জান তবে যারা স্মরণ রাখে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। আমি তাদেরকে এমন দেহ বিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাদ্য খেত না এবং তারা চিরস্থায়ীও ছিল না।’
সুরা আম্বিয়ার নয় নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মু’মিনদের সুসংবাদ ও কাফিরদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ‘অতঃপর আমি (শত্রুদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে) তাদেরকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম। তাই তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছা তথা সৎকর্মশীল আর বিশ্বাসীদের বাঁচিয়ে দিলাম এবং ধ্বংস করছিলাম সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে।’
এর পরের আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: আমি তোমাদের প্রতি একটি কিতাব নাজিল করেছি;এতে তোমাদের জন্যে উপদেশ রয়েছে। তোমরা কি চিন্তা কর না?
পবিত্র কুরআন সম্পর্কে নানা অপবাদ ও অযৌক্তিক দাবির জবাবে মহান আল্লাহ এ মহাগ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে এ বার্তা দিচ্ছেন যে, কুরআন মানুষকে অজ্ঞতার আঁধার থেকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যম। মানুষের কল্যাণ ও সৌভাগ্যের জন্য যা যা দরকার তার সবই এতে রয়েছে। কুরআন মানব জাতির সমৃদ্ধি ও জাগরণের মাধ্যম। কুরআন সবাইকে চিন্তাভাবনার দিকে আহ্বান জানায়। কুরআনের এ ধরনের বাস্তব-সম্মত বক্তব্য কী করে দুঃস্বপ্ন, অর্থহীন ও কাব্যিক কল্পনাসুলভ হতে পারে? মুহাম্মাদ (সা) কি কবি ছিলেন? কুরআনের আয়াতগুলোকে কী কল্পনার জাল দিয়ে বুনা কবিতা মনে হয়? পবিত্র কুরআনের বাক্যগুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বাস্তব-সম্মত হওয়ায় এই মহাগ্রন্থ সম্পর্কে কাফিরদের নানা অপবাদের অসারতাই প্রমাণিত হয়। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/৯