সূরা আশ-শুআরা; আয়াত ৭-১৩ (পর্ব-২)
এ পর্বে সূরা শুআরার ৭ থেকে ১৩ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ৭, ৮ এবং ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَمْ يَرَوْا إِلَى الْأَرْضِ كَمْ أَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ (7) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (8) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (9)
“আর তারা কি কখনো পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি? আমি কত রকমের কত বিপুল পরিমাণ উৎকৃষ্ট উদ্ভিদ তার মধ্যে সৃষ্টি করেছি?” (২৬:৭)
“নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়।“ (২৬:৮)
“আর যথার্থই আপনার রব পরাক্রান্ত এবং অনুগ্রহশীলও।” (২৬:৯)
আগের পর্বে ইসলামের নবীকে নিয়ে এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কুরআন নিয়ে কাফেরদের ঠাট্টা মশকরার ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে যে দুটো আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে তাতে বলা হয়েছে: কাফেররা আল্লাহর এই বিস্তীর্ণ জমিনে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব এবং শক্তির বিচিত্র নিদর্শন দেখতে পায় ঠিকই কিন্তু তারপরও আল্লাহকে স্বীকার করে না এবং তাঁর ওপর ঈমান আনে না। সত্য শোনার ক্ষমতা বা শক্তি তাদের নেই। তারা সত্য থেকে পালিয়ে বেড়ায়। তাদের দৃষ্টিশক্তিও প্রকৃতিরাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আল্লাহর নিদর্শনগুলো দেখা থেকে বঞ্চিত, যার ফলে তারা সত্যে উপনীত হতে পারে না।
এই যে বন-জঙ্গল আর তার মাঝে বিদ্যমান বিচিত্র গাছ-গাছালি এবং উদ্ভিদরাজি, এগুলোর দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালে বোঝা যেত আল্লাহর অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠ প্রতীক বা নিদর্শন এগুলো। এদের মাঝেও জোড়া বা জুটির বিধান বিদ্যমান আছে। পুরুষ এবং নারী উদ্ভিদের বিচিত্র সমাবেশ কতো চমৎকারভাবে পাশাপাশি লক্ষ্য করা যায়। আজকের বিজ্ঞান এগুলো সুন্দর করে ব্যাখ্যা করছে। আঠারো শ খ্রিষ্টাব্দে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী লিনা উদ্ভিদের মাঝে প্রাণীদের মতোই জুটি’র বিধান আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ চৌদ্দ শ’ বছর আগে কুরআন উদ্ভিদ জগতে এই নর এবং নারীর সাধারণ বিধানের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। এটা কুরআনের অলৌকিকত্বে আরেকটি উদাহরণ।
এই দুই আয়াত থেকে শিক্ষণীয় হলো:
১. সৃষ্টিজগতের সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা আল্লাহকে চেনার সর্বোত্তম উপায়।
২. প্রকৃতিরাজ্যে আল্লাহর কুদরতের একটি নমুনা হলো উদ্ভিদের মাঝেও নর এবং নারীর বিধান।
৩. পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কাফের হয়ে গেলেও এটা তাদের কুফুরির সত্যতার প্রমাণ নয়। যেমন বেশিরভাগ মানুষ ধূমপান করলেও ধূমপান করাকে সঠিক বলার কোনো সুযোগ নেই।
৪. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সর্বশক্তিমান, সম্মান ও মর্যাদাবান এবং অপরাজেয় হবার পাশাপাশি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে দয়ালু এবং উদার।
সূরা শু'আরার ১০ এবং ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (10) قَوْمَ فِرْعَوْنَ أَلَا يَتَّقُونَ (11)
“তাদেরকে সে সময়ের কথা শোনাও যখন তোমার রব মূসাকে ডেকে বলেছিলেন, যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও।” (২৬:১০)
“ফেরাউনের সম্প্রদায়ের কাছে তারা কি ভয় করে না?" (২৬:১১)
এই সূরায় আল্লাহর সাতজন নবীর প্রসঙ্গ একত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম হলেন হযরত মূসা (আ.)। মূসা (আ.) এর জীবনের ইতিহাস আরও বহু সূরায় এসেছে। তবে সেসব বর্ণনা ছিল খণ্ডিত জীবনের গল্প। ইসলামের নবীর জীবনেতিহাসের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের প্রসঙ্গও উল্লেখিত হয়েছে। কেননা কোনো কোনো বিষয় ছিল অভিন্ন। এই সূরার প্রথম কয়েকটি আয়াতে নবী কারিম (সা) এর বিরোধিতাকারীদের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে -সুখকর নয়-এমন আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: তারা একগুঁয়ে এবং অবাধ্য হয়ে গেছে, সুতরাং তারা ঈমান আনবে না। তাই রাসূলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে: হযরত মূসাও একইরকম কাফির গোত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তারাও নোংরা কাজগুলো পরিহার করে নি, জুলুম-অত্যাচারে লিপ্ত ছিল তারা। তবু মূসা (আ.) দাওয়াতি কাজ থেকে বিরত হন নি কিংবা তাদেরকে ছেড়ে দেন নি।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আজকের মুসলমানদের জীবনপথ সুগম করার জন্য আগেকার যুগের নবী এবং তাঁদের কওমের ইতিহাস চর্চা করা দরকার। ইতিহাস ইসলামের অনুসারীদের শেখাবে কী করে বিরোধীদের বিচিত্র কৌশল মোকাবেলা করতে হয়।
২. সমাজ সংস্কারের জন্য অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে এবং ময়দানে আসতে হবে,ঘরে বসে থাকলে চলবে না কিংবা শুধু বক্তৃতা বিবৃতি দিলে হবে না।
৩. জুলুম ফাসাদ মোকাবেলা করতে হলে তার মূল উৎসে যেতে হবে। এ কারণেই তাগুতি শক্তির মোকাবেলা করা আল্লাহর নবীদের কর্মসূচির শীর্ষে ছিল।
সূরা শু'আরার ১২ এবং ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
قَالَ رَبِّ إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ (12) وَيَضِيقُ صَدْرِي وَلَا يَنْطَلِقُ لِسَانِي فَأَرْسِلْ إِلَى هَارُونَ (13)
“সে বলল, হে আমার রব! আমার ভয় হয় তারা আমাকে মিথ্যা বলবে, (২৬:১২)
আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সঞ্চালিত হচ্ছে না। আপনি (আমার ভাই) হারুনের প্রতিও রিসালাত পাঠান (যাতে সে আমাকে সহযোগিতা করতে পারে)। (২৬:১৩)
ফেরাউনদের কাছে যাবার ব্যাপারে মূসা (আ.)কে যখন আদেশ দেওয়া হলো মূসা (আ.) তখন তাঁর বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ কিছু সীমাবদ্ধতার কথা আল্লাহর কাছে পেশ করলেন। যেমন তাঁর কথা মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম এবং ফেরাউনরা তাঁর কথাকে মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করতে পারে। অন্যদিকে রেসালাতের দায়িত্ব পালন করা তো এমনিতেই কঠিন একটা ব্যাপার তার উপরে মূসা (আ.) এর বাচন বা স্বরভঙ্গি ছিল ভাঙা ভাঙা। এ কারণে আল্লাহর দরবারে মূসা (আ.) দরখাস্ত করলেন, তাঁর ভাই হারুনকেও রেসালাত দিতে যেন তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালনে তাঁকে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু মূসা (আ.) যে দরখাস্ত পেশ করেছেন সে ব্যাপারে আল্লাহ আগে থেকে ই জানতেন। তারপরও এতো বড়ো একটা দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত করেছেন। অবশ্য আল্লাহ মূসা (আ.) এর আবেদন গ্রহণ করেছেন এবং হারুনের সাথে ফেরাউনের দরবারে যাবার আদেশ দিয়েছেন।
এই আয়াতগুলো ভালোভাবেই প্রমাণ করছে,আলেমরা বা দ্বীনী দাওয়াত দানকারীরা-যাদের ওপর সমাজের হেদায়েতের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে-তাঁরা যদি অসুস্থতার কারণে কিংবা বয়সের কারণে একাকি সেই গুরুদায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাদের কাঁধ থেকে কিন্তু ওই দায়িত্বের বোঝা সরে যাবে না, সুতরাং অর্পিত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে যুবক ও তরুণ শক্তিমানদের সহযোগিতা নিতে হবে, তাদের কথা কিংবা লেখালেখির যোগ্যতাকে দ্বীনি প্রচার ও প্রসারের কাজে লাগাতে হবে।
এ আয়াতগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো:
১. জনতার পক্ষ থেকে গ্রহণ না করা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। দ্বীনি আলেমদের উচিত জনগণকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাওয়া।
২. নবীরাসহ সকল মানুষেরই ক্ষমতা সমস্যা ও বিরোধিতার মোকাবেলায় সীমিত। সুতরাং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।
৩. বড় বড় কাজের ক্ষেত্রে অভিন্ন চিন্তার অধিকারী সাথীর প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদের সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন নাও হতে পারে।#