মার্চ ২৯, ২০১৭ ১৩:৩৬ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের কিছু সূরার নাম প্রাকৃতিক বস্তু বা প্রাণীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। সূরা আন-নমল এ ধরনেরই একটি সূরা। নমল অর্থ পিপিলিকা। সূরাটির এ ধরনের নামকরণের কারণ হচ্ছে এ সূরায় পিপিলিকার সঙ্গে হজরত সুলাইমান (আ.)’র কথোপকথনও স্থান পেয়েছে।

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আমরা সূরা আন-নমলের ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু করব। এ সূরার ১ ও ২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 طس تِلْكَ آَيَاتُ الْقُرْآَنِ وَكِتَابٍ مُبِينٍ (1) هُدًى وَبُشْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ (2)

ত্বা-সীন; এগুলো আল-কুরআনের ও সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।” (২৭:১)

 যা মু’মিনদের জন্যে পথনির্দেশ ও সুসংবাদ।”  (২৭:২)

এ সূরা কুরআনের আরও ২৮টি সূরার মতো মুকাত্তায়াত হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে এবং ঐসব সূরার মতো এ সূরাতেও পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কুরআন হচ্ছে এমন এক গ্রন্থ যা সাধারণ অক্ষর দিয়ে লেখা হয়েছে। কিন্তু এসব অক্ষর সবার কাছে থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের কোনো মানুষ কুরআনের সূরা মতো একটি সূরা লিখারও ক্ষমতা রাখে না।

এ গ্রন্থের আয়াত যেমন সুস্পষ্ট, তেমনি সত্য-মিথ্যা স্পষ্টকারীও। এ পবিত্র গ্রন্থ সকল মানুষের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। যারা সত্যকে মেনে নেবে ও ঈমান আনবে তারা এ গ্রন্থ থেকে উপকৃত ও সফলকাম হবে। এসব আয়াত হচ্ছে মহান আল্লাহর বাণী।

যে সকল আয়াত রাসূল (স.)’র উপর অবতীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর দু'টি নাম রয়েছে। যেহেতু রাসূল (স.) এসব আয়াত মানুষদেরকে পাঠ করে শোনাতেন সেহেতু এর নাম কুরআন। আর অন্য নামটি হলো কিতাব। যেহেতু রাসূল (স.) আয়াত পাঠ করে মানুষদের শোনানোর পর কোনো কোনো সাহাবি তা লিখে রাখতেন, সেজন্য এর নাম কিতাব।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সমাজে নবী-রাসূলদের তৎপরতা ছিল সাংস্কৃতিক, যা সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করতো।

২. পবিত্র কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এটি একটি লিখিত গ্রন্থ এবং তা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী, সুসংবাদদানকারী ও হেদায়েতকারী।

৩. প্রকৃতপক্ষে মানুষ কতটুকু হেদায়েতপ্রাপ্ত হল তার উপর নির্ভর করে, সে আল্লাহর সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে কিনা।

সূরা নমলের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآَخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (3) إِنَّ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآَخِرَةِ زَيَّنَّا لَهُمْ أَعْمَالَهُمْ فَهُمْ يَعْمَهُونَ (4) أُولَئِكَ الَّذِينَ لَهُمْ سُوءُ الْعَذَابِ وَهُمْ فِي الْآَخِرَةِ هُمُ الْأَخْسَرُونَ (5)

যারা নামায কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং তারা এমন লোক যারা আখেরাতে পুরোপুরি বিশ্বাস করে ।” (২৭:৩)

যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কর্মকাণ্ডকে সুদৃশ্য করেছি। ফলে তারা দিশেহারার মতো ঘুরে বেড়ায়।” (২৭:৪)

তাদের জন্যেই রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং পরকালে তারাই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত।”  (২৭:৫)

এ তিন আয়াতে আল্লাহতায়ালা মু’মিনদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে দু’টি হচ্ছে আচরণগত বৈশিষ্ট্য আর একটি হচ্ছে চিন্তাগত বৈশিষ্ট্য। নামায কায়েম করা ও যাকাত দেয়া মু’মিনদের দু’টি স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কারো মধ্যে যদি এর একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া না যায়, তাহলে সে পরিপূর্ণ ঈমানদার নন। যদিও নামায কায়েম করা ও যাকাত দেয়ার চেয়েও পরকালের ওপর বিশ্বাসস্থাপন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে ব্যক্তি পরকালে বিশ্বাস করে না, সে পার্থিব স্বার্থের বেড়াজালে আটকে পড়ে এবং ধন-সম্পদের মোহে সে আখিরাতকে ভুলে যায় এবং আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। আল্লাহর জন্য কোনো কাজ করে না।

এটাই স্বাভাবিক যে, কারো যদি পরকালে বিশ্বাস না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে তার কাছে যা সুদৃশ্য ও আকর্ষনীয় মনে হবে, তাই করবে এবং এ ধরনের কাজের দিকে ধাবিত হবে। আর এসব কাজের জন্যই পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি।

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এসেছে যে, শয়তান অপছন্দনীয় কাজগুলোকে মানুষের সামনে সুদৃশ্য ও আকষর্ণীয় করে তুলে ধরে। কিন্তু এ আয়াতে বলা হয়েছে,  আল্লাহতায়ালাই আখিরাতে অবিশ্বাসীদের সামনে তাদের নিজের কাজকে সুদৃশ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরেন। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে এ কথা বলার কারণ হয়তো এটা হতে পারে- তিনি মানুষকে এমন বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, সে যখন অনবরত মন্দ কাজ করতে থাকে, তখন ওই মন্দ কাজ তার চোখে আর অপছন্দনীয় থাকে না। ঐ কাজের প্রতি সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপর সে ঐ কাজের পক্ষে অবস্থান নেয় ও কথা বলতে থাকে। ভাবতে থাকে, সে ভালো কাজই করছে। এর ফলে মন্দ কাজ করার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।   বাস্তবতা হলো, তারা প্রকৃত পথ থেকে সরে গিয়ে ভুল পথে চলতে শুরু করে। অবশেষে যখন তার ইহকালীন জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে তখন আর তা শুধরে নেয়ার উপায় থাকে না।পরবর্তীতে কেয়ামতের মাঠে সে নিজেকে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখতে পাবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো

১. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিতদের সঙ্গে সম্পর্ক করার ওপর ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে।

২. বলা হয়ে থাকে, মানুষ অভ্যাসের দাস। আসলে মানুষ কোনো কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তা মন্দ ও খারাপ কাজ হিসেবে জানার পরও সহজে সেটাকে সহজে ত্যাগ পারে না। ফলে সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

৩. যদি কেয়ামতকে আমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, তাহলে আমরা কোনো কিছুর বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে আকৃষ্ট হব না এবং সহজেই সঠিক পথে চলতে পারবো। মোট কথা, কিয়ামতে বিশ্বাস থাকলে আমরা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলব, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকব। আমরা তখন বেলাল্লাপনাকে সভ্যতার পরিচায়ক বলব না। আমরা এ কথাও বলব না যে, অপচয় ও বিলাসিতা হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি। কিয়ামতে বিশ্বাসীরা ব্যক্তি ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা নিরূপণ করে না।

৪. যারা কেয়ামতকে অস্বীকার করবে তারা জীবনে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে।#