সূরা আন-নমল; আয়াত ৬-১১ (পর্ব-২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আমরা সূরা আন-নমলের ৬ থেকে ১১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু করব। এই সূরার ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنَّكَ لَتُلَقَّى الْقُرْآَنَ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ عَلِيمٍ (6)
“আর (হে মুহাম্মাদ) নিঃসন্দেহে তুমি এ কুরআন লাভ করছো এক প্রাজ্ঞ ও সর্বজ্ঞ সত্ত্বার পক্ষ থেকে।” (২৭:৬)
সূরা নমলের শুরুতেই পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব এবং মু’মিনদের হেদায়েত করার ক্ষেত্রে কুরআনের ভূমিকা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য ও যারা কেয়ামতে বিশ্বাস করে না তাদের পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরো বলছেন: হে পয়গম্বর, এক জ্ঞানবান প্রাজ্ঞ সত্ত্বা এগুলো নাজিল করেছেন। তিনি নিজের সৃষ্টির প্রয়োজন ও কল্যাণ এবং তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন। বান্দাদের সংশোধন ও পথনির্দেশনার জন্য তাঁর জ্ঞান সর্বোত্তম কৌশল ও ব্যবস্থা অবলম্বন করে। আল্লাহর প্রজ্ঞাময় আইন-কানুনও মানুষের মঙ্গলের জন্য যা মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে সহযোগিতা করে। পরের আয়াতগুলোতেও এসব বিষয়ে আরও আলোচনা হবে।
এবার ওই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরছি:
১. আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা পবিত্র কুরআনের মধ্যে ফুটে উঠেছে। নবী করিম (স.)’র জ্ঞানও ঐশী জ্ঞান। মহান আল্লাহই ওহির মাধ্যমে রাসূলকে এ জ্ঞান দান করেছেন। এখানে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের কথা বলা হচ্ছে না।
২. ধর্মীয় বিধিমালা ও নির্দেশনার উৎস হচ্ছে ঐশী জ্ঞান। আর প্রত্যেক ধর্মীয় নির্দেশনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আল্লাহর হিকমাত। এসব রহস্যের বেশিরভাগই মানুষের স্বল্প ও সীমিত জ্ঞানের মাধ্যমে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
সূরা নমলের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِذْ قَالَ مُوسَى لِأَهْلِهِ إِنِّي آَنَسْتُ نَارًا سَآَتِيكُمْ مِنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ آَتِيكُمْ بِشِهَابٍ قَبَسٍ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ (7) فَلَمَّا جَاءَهَا نُودِيَ أَنْ بُورِكَ مَنْ فِي النَّارِ وَمَنْ حَوْلَهَا وَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (8) يَا مُوسَى إِنَّهُ أَنَا اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (9)
“যখন মুসা তাঁর পরিবারবর্গকে বললেন: আমি (দূর থেকে) আগুন দেখেছি, (তোমরা এখানেই থাক) খুব শিগগিরই আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্যে কোন খবর আনব অথবা তোমাদের জন্যে আগুন নিয়ে আসব যাতে তোমরা উষ্ণতা লাভ করতে পারো।” (২৭:৭)
“সেখানে পৌঁছবার পর আওয়াজ এলো-ধন্য সেই সত্ত্বা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত।” (২৭:৮)
“হে মুসা, আমি আল্লাহ, প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (২৭:৯)
এ সূরায় পাঁচজন বিশিষ্ট রাসূল (স.) ও তাদের গোত্র সম্পর্কে বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে হজরত মুসা (আ.)’র নব্যুয়তপ্রাপ্তি সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। বিভিন্ন রেওয়ায়েতে এসেছে: হজরত মুসা (আ.) যখন তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হজরত শোয়াইব (আ.)'র কাছ থেকে মিশর যাচ্ছিলেন, তখন রাতে রাস্তা ভুলে যান এবং ঝড়-তুফানের মধ্যে পড়েন। ঝড়-তুফান ও শীত থেকে পরিবারকে বাঁচানোর জন্য হজরত মুসা (আ.) চিন্তিত ছিলেন। এমন সময় দূরে আগুন দেখতে পান। তখন তিনি বললেন: অবশ্যই ওখানে কেউ আছে যে আগুন জ্বালিয়েছে। যে আমাদের সহযোগিতা করতে পারবে অথবা কমপক্ষে আমাদেরকে রাস্তা বলে দিতে পারবে। অন্যদিকে আগুনের পাশে চোর-ডাকাত থাকতে পারে এই ভয়ে পরিবারসহ সেখানে যেতে যাচ্ছিলেন না।
আর তাই পরিবারের সদস্যদের বললেন: তোমরা এখানেই থাক আমি সংবাদ নিয়ে ফিরে আসব। আশাকরি সেখান থেকে কোনো সহযোগিতা পাব অথবা তোমাদের জন্যে অন্তত আগুন নিয়ে আসতে পারব, যাতে তোমরা উষ্ণতা লাভ করতে পার। এরপর মুসা (আ.) যখন আগুনের কাছে গেলেন, তখন কাউকে সেখানে দেখতে পেলেন না। তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির স্বীকার হলেন। দেখলেন আগুন সবুজ গাছ-পালাগুলোকে পুড়িয়ে ফেলছে ও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। দেখলেন আগুনের ফুলকি হজরত মুসা(আ.)’র দিকেই এগিয়ে আসছে। মুসা(আ.) ভয় পেয়ে পেছনে সরে গেলেন। এরপর হঠাৎ একটি শব্দ ভেসে এলো। হে মুসা ভয় পেও না। আমি তোমার প্রভু। আমি তোমাকে নবুয়ত দান করতে চাই। এ আগুন আমরাই সৃষ্ট। এই আগুন তোমার অথবা গাছপালার কোনো ক্ষতি করবে না। যারা আগুনের ভেতরে এবং এর আশেপাশে আছে তারা আমার নিরাপত্তায় থাকবে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নবী-রাসূলদের জীবন-যাপন ছিল সাধারণ মানুষের মত। একদিকে হজরত মুসা (আ.) যখন নিজের পরিবারকে বাঁচাতে মরিয়া, তখন আল্লাহ তাকে নবুয়ত দান করলেন।
২. আল্লাহ চাইলে আগুন তার নিজস্ব ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। যা হজরত ইব্রাহিম (আ.)’র সময়ও ঘটেছিল। যখন হজরত ইব্রাহিম (আ.)কে আগুনের মধ্যে ফেলা হয়েছিল, তখন আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
সূরা নমলের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَأَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَا مُوسَى لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَيَّ الْمُرْسَلُونَ (10) إِلَّا مَنْ ظَلَمَ ثُمَّ بَدَّلَ حُسْنًا بَعْدَ سُوءٍ فَإِنِّي غَفُورٌ رَحِيمٌ (11)
“তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। (মুসা (আ.) লাঠি ফেলে দিলেন) অতঃপর যখন সে সেটাকে সাপের মতো ছুটাছুটি করতে দেখল, তখন সে বিপরীত দিকে ছুটতে লাগলো এবং পেছন ফিরেও তাকালোও না। (আল্লাহ বললেন) হে মুসা, ভয় কর না। নবীরা আমার কাছে পায় না।” (২৭:১০)
“তবে হ্যাঁ, যদি কেউ সীমালঙ্ঘন করে। তারপর যদি সে মন্দ কাজের পর যদি ভালো কাজের (নিজের কাজ) পরিবর্তিত করে নেয় তাহলে আমি ক্ষমাশীল ও করুণাময়।” (২৭:১১)
মুসা (আ.) শব্দ শুনে এবং এ ধরনের আগুন দেখে তা আল্লাহর পক্ষ হতে কিনা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আর তখন আল্লাহতায়ালা বললেন: তুমি তোমার লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ কর। মুসা(আ.) লাঠি মাটিতে ফেলে দিলেন, অতঃপর দেখলেন সে লাঠি সর্প হয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসছে। মুসা (আ.) ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ এমন অবস্থা হবে মুসা (আ.) এর আগে বুঝে উঠতে পারেননি। তখন আল্লাহ বললেন: তুমি ভয় কর না, এটা তোমার নবুয়তপ্রাপ্তির ঘোষণা। তুমি এখন থেকে আমার নবী। এখন যা কিছু তুমি দেখেছ সবই আমার মুজিযা ছিল। আর তুমি এখন বিশ্বাস করতে পার, যা কিছু শুনেছ সবই আমার ওহী। এখানে শয়তানের কোন কিছু নেই। এখন থেকে তোমার মুজিযা হিসেবে এ লাঠিকে তুমি ব্যবহার করবে। তুমি আমার কাছে যাদুকর নও। আর এতে কোনপ্রকার জাদুর ছোঁয়াও নেই। এটা তোমার নিরাপত্তা ও শান্তির স্থান। এখানে তোমার কোন ভয় নেই। ভয়তো সেই করবে, যে নিজের ওপর ও অন্যের ওপর জুলুম করেছে। এরপরও সে যদি তওবা করে ও গোনাহ করা থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে আমার রহমত থেকে বঞ্চিত হবে না।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মোজেজা আল্লাহর ইচ্ছায় সম্পন্ন হয়। এজন্য এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর আগে রাসূলগণকে প্রথমে মোজেজা সম্পর্কে অবগত করা হতো।
২. আল্লাহর নীতি হল, জালিমরা সবসময় ভয় ও আশঙ্কার মধ্যে থাকবে, তারা কখনো নিরাপদ ও নিশ্চিন্তায় থাকবে না।
৩. মানুষ যদি গোনাহ না করে এবং সৎ কাজ করে তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।#