সূরা আন-নমল; আয়াত ১২-১৬ (পর্ব-৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের আসরে আমরা সূরা আন-নমলের ১২ থেকে ১৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু করব। এই সূরার ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
خِلْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ فِي تِسْعِ آَيَاتٍ إِلَى فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ (12)
"(হে মুসা!) তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, তা শুভ্র ও (উজ্জ্বল) হয়ে বের হয়ে আসবে কোনো ধরনের ক্ষতির শিকার না হয়েই। (এগুলো) হচ্ছে ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের সামনে নয়টি নিদর্শনের অন্যতম। তারা পাপাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (২৭:১২)
আগের আয়াতে আমরা বলেছি, হযরত মুসা (আ.) যখন পরিবারসহ মিশরে যাচ্ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে নবুয়ত দান করেন। আর নবুয়তের মু’জিযা স্বরূপ লাঠিকে মাটিতে নিক্ষেপ করতে বলেন, আর তখন লাঠি ছোট্ট সাপে পরিবর্তন হয়ে যায় এবং মুসা(আ.) ভয় পান।
আর এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.)’র অন্য একটি মু’জিযা সম্পর্কে বলেছেন। আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.)-কে বলেন, তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, এ লাঠি শুভ্র ও উজ্জ্বল হয়ে বের হয়ে আসবে। আর এ উজ্জ্বলতা ও শুভ্রতা কোনো ধরনের শ্বেত রোগ নয়।
এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.)-কে এও বলছেন যে, হে মুসা তোমার মু’জিযা শুধুমাত্র এ দু’টি নয়। তোমার আরো সাতটি মু’জিযা অপেক্ষা করছে। যেসব মু’জিযা তুমি ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে একত্ববাদের দাওয়াত দিতে কাজে লাগাতে পারবে এবং অজুহাত তোলার পথ বন্ধ করে দিতে পারবে। আর তাই হজরত মুসা (আ.) তাঁর লাঠির মাধ্যমে আরো কয়েকটি মোজেজা প্রদর্শন করেন। নীল নদ পার হওয়ার সময় তিনি ওই লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করেন এবং নদীর পানি দুই ভাগ হয়ে যায়। মাঝখানে সৃষ্টি হয় শুষ্ক রাস্তার। এর ফলে মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা নদী পার হন। এ ছাড়া, একবার যখন প্রচণ্ড খরা দেখা দেয়, তখন মুসা (আ.) লাঠি দিয়ে পাহাড়ে আঘাত করেন, এর ওই পাহাড় থেকে ১২টি ঝর্ণার সৃষ্টি হয়।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. প্রাকৃতিক ব্যবস্থাসহ সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহ হও বললেই তা হয়ে যায়, তা যত অলৌকিক ও কঠিন কাজই হোক না কেন।
২.কোন কোন ব্যক্তি আল্লাহর একটি মু’জিযা দেখে সন্তুষ্ট হতে পারতো না, আর তাই তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের মু’জিযা দেখানোর প্রয়োজন হতো, যাতে তারা ঈমান আনতে পারে।
সূরা নমলের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ آَيَاتُنَا مُبْصِرَةً قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ (13) وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنْفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ (14)
“অতঃপর যখন তাদের কাছে আমার স্পষ্ট নিদর্শন এলো, তখন তারা বলল, এটা তো সুস্পষ্ট জাদু।”(২৭:১৩)
"তারা অন্যায়ভাবে ও অহংকার করে নিদর্শনাবলীকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখুন, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল?” (২৭:১৪)
হজরত মুসা (আ.) তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য ফেরাউন ও তার গোত্রের কাছে এলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিলেন। তারা এ দাওয়াত গ্রহণ না করে উল্টো মুসা (আ.)-কে সুস্পষ্ট জাদুকর বলে অপবাদ দিল।
এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরো বলেন: মুসা (আ.) সম্পর্কে তাদের মধ্যে কোন প্রকার সন্দেহ নেই, তারা সবই বুঝতে পেরেছে, তারা মুসার কথাও বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তারা তাদের অহংবোধের কারণে সত্যকে মেনে নিতে পারছে না। কারণ, তাদের চেয়ে সামাজিকভাবে নিচু মর্যাদার কারো কথা মেনে নেয়া ওই সব ব্যক্তির জন্য অনেক কঠিন ও কষ্টের। এ কারণে তারা ভুলের মধ্যে পড়ে থাকল এবং মুসা (আ.)কে জাদুকর বলে অপবাদ দিল। অহংকারই তাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। অবশ্য তারা এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের উপরই জুলুম করেছে। আর এ কারণে তাদেরকে নীল নদের মধ্যে পড়ে ডুবে মরতে হয়েছে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ঈমানের স্তর, বিশ্বাস ও জ্ঞানের চেয়েও ঊর্ধ্বে। মানুষ যদি সত্যকে বোঝার পরও প্রকাশ্যে সেটাকে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে ঈমানদার বলা যাবে না।
২. যে অহংকারী ও নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় মনে করে, সে কখনো অন্যের কথা মেনে নিতে পারে না। এ কারণে সে কখনো সত্যকে মেনে নিতে পারে না।
৩. পতন ও ধ্বংসই হচ্ছে ফাসেক লোকদের চূড়ান্ত পরিণতি।
সূরা নমলের ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَقَدْ آَتَيْنَا دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ عِلْمًا وَقَالَا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي فَضَّلَنَا عَلَى كَثِيرٍ مِنْ عِبَادِهِ الْمُؤْمِنِينَ (15) وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَيْءٍ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ (16)
“আমি অবশ্যই দাউদ ও সুলায়মানকে জ্ঞান দান করলাম। তাঁরা বলে ছিলেন, আল্লাহর প্রশংসা, যিনি আমাদেরকে তাঁর অনেক মু’মিন বান্দার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” (২৭:১৫)
“সুলায়মান দাউদের উত্তরাধিকারী হলেন। বললেন, ‘হে লোক সকল, আমাকে পাখির ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাকে সব কিছু দেয়া হয়েছে। নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।” (২৭:১৬)
হজরত মুসা (আ.)’র ঘটনা বর্ণনা করার পর এ আয়াতে হজরত দাউদ (আ.) ও হজরত সুলাইমান (আ.)’র ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এই দুই নবীর অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য আগের নবীদের তুলনায় আলাদা ছিল। কারণ, এ দুই নবী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করেছিলেন।
যেখানে অন্য নবীগণ সবসময় নির্বাসন ও কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্যে জীবন-যাপন করেছেন, সেখানে ওই দুই নবী হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল মানব সমাজের ওপরই নয়, তারা জিন সম্প্রদায়ের ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাদের ক্ষমতার রহস্য ছিল আল্লাহর বিশেষ জ্ঞান। যার মাধ্যমে হজরত দাউদ (আ.) ও হজরত সুলাইমান (আ.) ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছিলেন। আর এ জন্য তারা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
আল্লাহর বিশেষ জ্ঞানের একটি হল, পশু-পাখির সঙ্গে কথা বলতে পারা। আর এ সবই পরম করুণাময় মহান আল্লাহর দয়ায় অর্জিত।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নবীগণের জ্ঞান ঐশী জ্ঞান, যা নবী-রাসূলদেরকে আল্লাহ বিশেষভাবে প্রদান করেন।
২.ধর্ম, রাজনীতি থেকে আলাদা নয়, যেখানে আল্লাহর নবীরা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করতে পারেন, সেখানে মু’মিনরা কেন ইসলামি হুকুমত কায়েম করতে পারবেন না? তাছাড়া অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অনুমতিতো রয়েছেই।
৩. জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হতে হবে। শুধুমাত্র শাসক বা ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
৪. আমাদের কাছে যেসব জ্ঞান ও নেয়ামত আছে, সবই পরম করুণাময় মহান আল্লাহর দয়ায় অর্জিত। কখনই এটা মনে কারা যাবে না যে, এসব জ্ঞান ও নেয়ামত আমাদের ব্যক্তিগত অর্জন। তাই সবসময় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে। আমরা কখনই অহংকারী হয়ে আল্লাহকে ভুলে যাব না।#