সূরা আন-নমল; আয়াত ১৭-২২ (পর্ব-৪)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ১৭ থেকে ২২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَانَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ (17) حَتَّى إِذَا أَتَوْا عَلَى وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَا أَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسَاكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (18)
"সুলায়মানের জন্য জিন, মানুষ ও পাখিদের (মধ্য থেকে) সেনাদের সমবেত করা হয়েছিল এবং তাদেরকে ( বিশৃঙ্খলা থেকে দূরে) ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো । (এরপর সুলায়মান বাহিনীকে নিয়ে রওনা হলো)" (২৭:১৭)
"যখন তারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকার দল, তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর। অন্যথায় সুলায়মান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পিষ্ট করে ফেলবে।” (২৭:৮)
আগের আয়াতে আমরা বলেছি, আল্লাহতায়ালা হযরত দাউদ (আ.) ও হযরত সুলায়মান (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা দান করেছিলেন। যে ক্ষমতার বলে তারা বর্তমান সিরিয়া ও এর আশেপাশের এলাকায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী গঠনের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। আর এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে মহান আল্লাহতায়ালা এ আয়াতে বলছেন: একদল মানুষ, কিছু জিন ও একদল পাখিকে নিয়ে সুলাইমানের বাহিনী গঠিত হয়েছিল। তিনি যখনই প্রয়োজন মনে করতেন, তখনি শত্রুদের মোকাবিলার জন্য ওই বাহিনীকে ব্যবহার করতেন।
হযরত সুলায়মান (আ.) একবার তাদের সবাইকে ডাকলেন। সবাই উপস্থিত হলো। সুলাইমানের সুশৃঙ্খল বাহিনী মার্চ করতে করতে পিপীলিকা অধ্যুষিত একটি উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছাল। সুলাইমানের সেনাদলের উপস্থিতি টের পেয়ে এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকার দল, তোমরা সতর্ক থাক। অন্যথায় সুলাইমানের বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদপিষ্ট করতে পারে।
বলা হয়ে থাকে, সেখানকার পিপীলিকারাও জানত যে, হযরত সুলায়মান এবং তাঁর বাহিনী কখনোই জেনে-শুনে পিপীলিকাকেও কষ্ট দেয় না।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মানুষ জীনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এমনকি প্রয়োজনে তাদেরকে বিভিন্ন কাজেও ব্যবহার করতে পারে।
২. নিয়ম- শৃঙ্খলা মেনে চলা এবং প্রয়োজনে শত্রুর মোকাবেলায় শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা নবী-রাসূলদের অন্যতম দায়িত্ব।
৩. পশু-পাখিরা সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর একে অপরকে সতর্ক করে দেয়।
৪. আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিরা জেনেশুনে একটি পিপীলিকাকেও কষ্ট দেন না।
সূরা নমলের ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন :
فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِنْ قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ (19)
“তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসলেন এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাতে আমি তোমার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।” (২৭:১৯)
পিপীলিকাটি যখন অন্যান্য পিপীলিকাকে বলল যে, তোমরা সতর্ক হও। তা না হলে, সুলায়মান ও তার বাহিনী নিজেদের অজান্তেই তোমাদেরকে পিষ্ট করে ফেলতে পারে। এ কথা শুনে হজরত সুলায়মান (আ.) মুচকি হাসি হাসলেন ও ভাবলেন- বাহ, একটি পিপীলিকাও তার সমগোত্রের অন্যদের জীবন রক্ষার কথা ভাবছে। একইসঙ্গে তিনি এ বিষয়টিও চিন্তা করলেন যে, তাঁর শাসনামলে কোনো অধীনস্ত বা দুর্বল ব্যক্তির ওপর জ্ঞাতস্বারে বা অজ্ঞাতস্বারে যাতে কোনো ধরনের জুলুম না হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
এ অবস্থায় হজরত সোলায়মান (আ.) হাত তুলে আল্লাহর সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, আল্লাহ তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও যাতে আমি তোমার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. সমালোচনামূলক মন্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা সমাজের একজন নেতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিৎ। ক্ষুব্ধ না হয়ে সমালোচনাকে স্বাগত জানানো উচিত। যেমনিভাবে সুলায়মান (আ.) পিপীলিকার বক্তব্য শুনে মুচকি হাসি হেসে সেটাকে গ্রহণ করেছিলেন।
২. আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধুমাত্র মুখে উচ্চারণ করলেই হবে না বরং সঠিক উপায়ে আল্লাহর বিভিন্ন নেয়ামত কাজে লাগাতে হবে, ভালো কাজ করতে হবে এবং অন্যদের উপকার হতে হবে। এসবই আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হয়।
৩. খ্যাতি অর্জন ও লোক দেখানোর জন্য যেসব কাজ করা হয় সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। কেবল সেই সব কাজই আল্লাহর কাছে মর্যাদা পাবে, যেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়।
সূরা নমলের ২০ থেকে ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ (20) لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَأَذْبَحَنَّهُ أَوْ لَيَأْتِيَنِّي بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ (21) فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِنْ سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ (22)
“সুলায়মান পাখিদের খোঁজ-খবর নিলেন, অতঃপর বললেন, কি হল, হুদহুদকে দেখছি না কেন? সে কি অনুপস্থিত?” (২৭:২০)
“আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব যদি সে তার অনুপস্থিতির স্পষ্ট কারণ তুলে ধরতে না পারে।” (২৭:২১)
“কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি।” (২৭:২২)
আগের আয়াতে আমরা বলেছি, পাখিরাও হজরত সুলায়মান (আ.)’র জন্য কাজ করতো। মিশর ও এর আশেপাশের অঞ্চলে যা কিছু ঘটতো পাখিরা সেসব বিষয়ে হজরত সুলায়মান (আ.)-কে তথ্য দিত। আর এ আয়াতে আল্লাহ বলেন: একবার সুলায়মান তার দরবারের পাখিগুলোর খোঁজ-খবর নিলো। হুদহুদ ছাড়া আর সব পাখি সেখানে উপস্থিত ছিল। সম্ভবত হুদহুদ এর আগেও দরবারে এভাবে অনুপস্থিত ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের দৃঢ়তা দরকার,সে ধরনের দৃঢ়তা প্রকাশ করে
সুলায়মান বললেন, হুদহুদ যদি উপযুক্ত কারণ উপস্থাপন করতে না পারে, তাহলে আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব এমনকি হত্যাও করতে পারি। এর কিছু সময় পরই হুদহুদ পাখি হজরত সোলাইমান (আ.)-র কাছে হাজির হয়ে বলে, আমি সাবা অঞ্চল সফর করে এসেছি। আমার কাছে এমন খবর আছে যা আপনি জানেন না। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। হুদহুদ এভাবে নিজের অনুপস্থিতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে নিজেকে রক্ষা করে।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নিজের অধীনস্তদের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২. ইসলামি সমাজের নেতাকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও বিচক্ষণ হতে হবে।
৩. রাষ্ট্রের কোনো বিষয়ে সরকারের উদাসীন হওয়া চলবে না। যারা অবাধ্য হবে তাদের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। তাহলে অন্য কেউ এ ধরনের কাজ করার সাহস পাবে না।
৪. দৃঢ়তা প্রদর্শনের পাশাপাশি যুক্তি মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।#