এপ্রিল ০১, ২০১৭ ১৬:০৩ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ১৭ থেকে ২২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنِّي وَجَدْتُ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيمٌ (23) وَجَدْتُهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ (24)  

"(হুদহুদ বলল:) আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন রয়েছে।" (২৭:২৩)

"আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলী সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় না।" (২৭:২৪) 

আগের আয়াতে আমরা বলেছি, হুদহুদ নিজের অনুপস্থিতির কারণ হজরত সুলাইমান (আ.)'র কাছে ব্যাখ্যা করে। সে বলে, আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ দুই আয়াতে হুদহুদ বলছে, আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। সে অনেক কিছুর মালিক। তার রয়েছে বিলাসবহুল প্রাসাদ ও সিংহাসন। আর এ খবর শোনার পর যখন হজরত সুলাইমান (আ.) অবাক হন, তখন হুদহুদ বললো, ঐ নারীর মুকুট ও সিংহাসনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি একজন নবী হিসেবে আপনার জানা উচিত তা হলো, ওই নারী ও তার সম্প্রদায় আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করে। এছাড়া তারা নানা ধরনের পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলীকে সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। তাই সৎপথ খোঁজে পাওয়া তাদের জন্য কষ্টকর।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত হলেই একজন ব্যক্তিকে ভালো বলা যাবে না। যেমনিভাবে হজরত সুলাইমান (আ.) এবং বিলকিস উভয়ই দুনিয়াতে অনেক কিছুর অধিকারী ছিলেন, কিন্তু তাদের একজন ছিলেন আল্লাহর নবী, আর একজন ছিল কাফেরদের শাসক।

২. সাধারণত: শাসকের ধর্ম ও বিশ্বাস জণগনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। মানুষ শাসকদের ধর্ম ও বিশ্বাসকেই বেশি অনুসরণ করে।

সূরা নমলের ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: 

أَلَّا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ (25) اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ (26)

"(শয়তান তাদেরকে এভাবে ধোঁকা দেয়) যাতে তারা আল্লাহকে সিজদা না করে, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের গোপন বস্তু প্রকাশ করেন এবং তিনি জানেন, যা তোমরা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর।" (২৭:২৫)

"আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তিনি মহা আরশের মালিক।" (২৭:২৬)   

হুদহুদ দেখল, সাবাবাসী আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে,এজন্য হুদহুদ অবাক হল ও বলল:  আমি জানিনা, সাবাবাসী কেন আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করে। অথচ আল্লাহই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের গোপন বস্তু প্রকাশ করেন এবং যা গোপন করা হয় ও যা প্রকাশ্য, তার সবই আল্লাহ জানেন। আকাশ ও জমিনের গোপন বস্তু প্রকাশ করার যে কথা বলা হয়েছে সে ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে আকাশ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ ও মাটির নীচ থেকে গাছের চারা বের হয়ে আসার বিষয়টিকে তুলে ধরা যেতে পারে। হজরত সুলাইমান (আ.) আল্লাহর নবী ও মহান বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি অনেক কিছু জানেন না। কারণ তার জ্ঞান সীমিত। এ কারণে সাবা অঞ্চলে কী ঘটছে তা তার জানা নেই। একমাত্র আল্লাহই সর্বজ্ঞ। কেবল তারই এবাদত করা যাবে অন্য কারো নয়। আল্লাহতায়ালা আসমান-জমিনে সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তিনি ইচ্ছা করলেই গোপনকে প্রকাশ করতে পারেন এবং সবাইকে তা অবগত করতে পারেন। তার কাছে সৃষ্টিজগতের গোপন ও প্রকাশ্য বস্তুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের মধ্যে উপাসনার প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে মানুষ যুগে যুগে জড় বস্তু, পশু ও ব্যক্তির উপাসনা করেছে।

২. প্রাণের অস্তিত্বের জন্য সূর্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু তাই বলে কখনোই সূর্যকে সিজদা করা যাবে না। সূর্যসহ সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন আল্লাহ। কেবল তারই উপাসনা করা যাবে। অন্য কারো নয়।

৩. মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করতে শয়তান মানুষের সামনে খারাপ কাজগুলোকে ভালো হিসেবে তুলে ধরে।

৪. সব কিছুই আল্লাহর অধীনে। তার কাছে কোনো কিছুই গোপনীয় নয়।

সূরা নমলের ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ سَنَنْظُرُ أَصَدَقْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْكَاذِبِينَ (27) اذْهَبْ بِكِتَابِي هَذَا فَأَلْقِهِ إِلَيْهِمْ ثُمَّ تَوَلَّ عَنْهُمْ فَانْظُرْ مَاذَا يَرْجِعُونَ (28)

"(সুলায়মান হুদকে বললেন), খুব শিগগিরই আমি দেখব তুমি সত্য বলছ, নাকি তুমি মিথ্যবাদী।" (২৭:২৭)

"তুমি আমার এই পত্র নিয়ে যাও এবং এটা তাদের প্রতি নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সরে পড় এবং দেখ, তারা কি প্রতিক্রিয়া দেখায়।" (২৭:২৮)

হজরত সুলায়মান (আ.) দরবারে হুদহুদের অনুপস্থিতির কারণ শোনার পর হুদহুদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। হুদহুদের প্রতিবেদন শোনার পর তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্তের পদক্ষেপ নেন। তিনি সত্যতা যাচাইয়ের পদক্ষেপ নেন। তিনি হুদহুদকে একটি চিঠি দিয়ে বলেন, চিঠিটি সাবার রানীর কাছে পৌঁছে দাও এবং সে চিঠির কী জবাব দেয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা কর। আরও অনেক নবী-রাসূলই চিঠির মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। যেমন বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.)-ও রোম ও ইরানের বাদশাহর কাছে চিঠির মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষকে ইসলাম তথা সত্যের দাওয়াত দেয়ার জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে। সরাসরি কথা বলা যেতে পারে। অথবা চিঠি ও প্রতিনিধি পাঠিয়ে ইসলামের পথে আহ্বান জানানো যেতে পারে।

২. একজন একটি কথা বললেই তা সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেয়া যাবে না। নানা পন্থায় সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। প্রয়োজনে তদন্ত চালাতে হবে।

৩. বিরোধীদের বিষয়ে  যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তাদের অনুসৃত পথ যে সঠিক নয় তা বুঝিয়ে বলতে হবে। এরপর তাদের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।#