এপ্রিল ০৪, ২০১৭ ১২:৪৪ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ২৯ থেকে ৩৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৯ ও ৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ إِنِّي أُلْقِيَ إِلَيَّ كِتَابٌ كَرِيمٌ (29) إِنَّهُ مِنْ سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (30) أَلَّا تَعْلُوا عَلَيَّ وَأْتُونِي مُسْلِمِينَ (31)

"সাবার রানি বলল, হে পরিষদবর্গ, আমার প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।" (২৭:২৯)

"সেই চিঠি সুলায়মানের পক্ষ থেকে।(এতে বলা হয়েছে,) পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহর নামে শুরু;" (২৭:৩০)

"আমার অবাধ্য হয়ো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও।" (২৭:৩১)

আগের আয়াতে আমরা বলেছি, সুলায়মান (আ.) সাবা ভূখণ্ড ও সেখানকার অধিবাসীদের সূর্যপুজা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর একটি চিঠি লেখেন এবং হুদহুদকে ওই চিঠি পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দেন। হুদহুদ বিলকিসের দরবারে গিয়ে সুলায়মান (আ.)'র চিঠি তার প্রতি নিক্ষেপ করে।

আর এ আয়াতে বলা হচ্ছে, সাবার রানি চিঠি দেখেই বুঝতে পারেন যে, সুন্দর পাখিটি অবশ্যই মহান কোনো ব্যক্তিত্বের চিঠি নিয়ে এসেছে। সাবার রানির দরবারে অনেক উপদেষ্টা ছিল। কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি তা নিয়ে তার আশেপাশের লোকদের সঙ্গে কথা বলতন। এ চিঠি পাওয়ার পরও তিনি তার দরবারের লোকদের ডাকলেন এবং নিজেই চিঠিটি তাদের পড়ে শোনালেন। এ চিঠি লেখা শুরু হয়েছিল, মহান আল্লাহর নামে। এ চিঠিতে মূলত: দু'টি বক্তব্য এসেছে: একটি হলো- আল্লাহর কাছে নতি স্বীকার করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো- সুলাইমানের অবাধ্য না হওয়া চলবে না।

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 
১. আমরা পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহর নামে সব কাজ শুরু করব। এমনকি কাফিরদের কাছে চিঠি লেখার সময়ও যেন শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লিখতে ভুলে না যাই।
২. আত্মম্ভরিতার কারণে মানুষ মহাসত্যকেও অস্বীকার করে বসে। 

সূরা নমলের ৩২ থেকে ৩৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَتْ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي أَمْرِي مَا كُنْتُ قَاطِعَةً أَمْرًا حَتَّى تَشْهَدُونِ (32) قَالُوا نَحْنُ أُولُو قُوَّةٍ وَأُولُو بَأْسٍ شَدِيدٍ وَالْأَمْرُ إِلَيْكِ فَانْظُرِي مَاذَا تَأْمُرِينَ (33)  

"(পত্র শুনিয়ে) রানি বলল, হে নেতৃবৃন্দ। আমার কাজে পরামর্শ দিন। আপনাদের বাদ দিয়ে তো আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করি না।" (২৭:৩২)

"তারা বলল, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন।" (২৭:৩৩)

সাবার রানি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ। তিনি চিঠি পড়ার পর তিনি তার দেশের রাজনীতিবিদ ও সামরিক কমান্ডারদের মতামত চাইলেন। চিঠির কী উত্তর দেয়া যায় তিনি তা জানতে চাইলেন। সুলাইমানের মোকাবিলা করার জন্য তাদের প্রস্তুতি কেমন তা জানতে এবং সর্বোত্তম উপায় অবলম্বন করতে পরামর্শসভা সাবার রানিকে সহযোগিতা করেছে। সভায় উপস্থিত ব্যক্তিত্বরা সুলাইমানের যে কোনো হামলার জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করল।চিঠির বিষয়বস্তু শুনে তারা ভেবেছিল সুলায়মান (আ.) যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এজন্য তারা অন্যান্য অঞ্চলের সামরিক কমান্ডারদের মতো আত্মসমর্পন না করে যুদ্ধের পথ বেছে নেয়ার পরামর্শ দিলেন। তবে তারা রানিকে এও বলল যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আপনি, আমরা আপনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করব না। 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 
১. রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সরঞ্জামের প্রয়োজন রয়েছে। তবে তা যেন অহঙ্কারের জন্ম না দেয় এবং সৎপথ প্রাপ্তির পথে অন্তরায় না হয়।
২. যে কোনো কাজে বিশেষকরে রাষ্ট্রীয় কাজে পরামর্শ করা জরুরি।তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব থাকবে একজনের ওপর। তা না হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।

সূরা নমলের ৩৪ থেকে ৩৫ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ (34) وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِمْ بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ (35)

"(সাবার রানি) বিলকিস বলল, রাজা বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে, তখন সেটাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাশালীদের লাঞ্ছিত করে। এ রকম কাজ করাই তাদের রীতি।" (২৭:৩৪)

"আমি তাঁর কাছে কিছু উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি আমার দূতেরা কী জবাব নিয়ে ফেরে।" (২৭:৩৫)

রানি বিলকিস তার লোকদের কথা শুনে এবং সামরিক প্রস্তুতির কথা জনে বলল: যুদ্ধ কেবল ধ্বংসযজ্ঞ ও বিপর্যয় ডেকে আনে। কারণ আমরা দেখেছি, রাজা বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে, তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার লোকদের হত্যা করে। 

এরপর তিনি হযরত সুলায়মান (আ.)'র কাছে দামী উপহার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, যাতে সুলায়মান (আ.)'র প্রতিক্রিয়া জানা যায় এবং প্রতিক্রিয়া জানার পর তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সম্ভবত: সাবার রানি হজরত সুলায়মান (আ.)'র কাছে দামী উপহার পাঠিয়ে এটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন যে, সুলায়মান প্রকৃতই আল্লাহর নবী নাকি যুদ্ধ করে দেশ দখলই তার উদ্দেশ্য। কারণ সাবার রানি বিলকিস জানত, আল্লাহর নবীগণের ধন-সম্পদের লোভ নেই এবং তাঁরা কখনোই কোন কারণে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা থেকে ক্ষান্ত হন না। কিন্তু দুনিয়াপুজারী রাজারা সব কিছু করেন ব্যক্তিগত স্বার্থে ও ক্ষমতার জন্য। 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না তারা বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেয়া এবং অকারণে যুদ্ধ বাধানোর পথ অনুসরণ করে। তারা ক্ষমতা দখলের জন্য হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

২. অন্যের উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ উপহারদাতা এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ঘুষ দিয়ে থাকতে পারেন। এর ফলে অন্যের অধিকারও ক্ষুণ্ণ হতে পারে।#