মে ১০, ২০১৭ ১২:০২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আন-নমলের ৮৯ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮৯ ও ৯০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِنْهَا وَهُمْ مِنْ فَزَعٍ يَوْمَئِذٍ آَمِنُونَ (89) وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَكُبَّتْ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ هَلْ تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (90)

"যে সৎকাজ করবে, সে (কিয়ামতের দিন) উৎকৃষ্টতর প্রতিফল পাবে এবং সেদিন ওরা ভয় ও শঙ্কা হতে নিরাপদে থাকবে।" (২৭:৮৯)

"এবং যে মন্দকর্ম করবে (কিয়ামতের দিন) তাকে অধোমুখে নিক্ষেপ করা হবে অগ্নিতে এবং ওদের বলা হবে তোমরা যা করতে তারই প্রতিফল ভোগ করছো।" (২৭:৯০)

আগের পর্বে বলা হয়েছে যে, এই দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর মানুষের কৃতকর্মের হিসাব নেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত প্রতিষ্ঠা করবেন। এই দুই আয়াতে কিয়ামতের দিন পুরস্কার ও শাস্তি দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হচ্ছে: আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী পার্থিব জীবনে মানুষ যা কিছু করেছে তার ভিত্তিতে সেদিন তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। কারণ, মহান আল্লাহ মানুষকে বিবেকবুদ্ধির পাশাপাশি কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। নবী-রাসূল পাঠিয়ে তাদেরকে ভালো ও মন্দের পার্থক্য শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কাজেই এতকিছুর পর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে তাকে তার শাস্তি পেতেই হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, এই পৃথিবীতে মানুষ তার কর্মের খুব কম প্রতিদানই পায়। এর কারণ হচ্ছে, দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনে মানুষের সব কর্মের পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কিয়ামতের দিন পৃথিবীর মতো স্থান বা কালের সীমাবদ্ধতা থাকবে না। সেদিন প্রত্যেক মানুষ তার কৃতকর্মের স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী ফল দেখতে পাবে এবং সেই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে। এই দুই আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন সৎকর্মশীল ব্যক্তিদেরকে তাদের কর্মের চেয়ে অনেক বেশি পুরস্কার আল্লাহ দেবেন। তবে শর্ত হচ্ছে, সৎকর্মটি যেন লোক দেখানো বা অহমিকা প্রদর্শনের জন্য না হয় এবং আল্লাহর নির্ধারিত অন্য কোনো খারাপ কাজের কারণে সৎকর্মটি যেন ধ্বংস হয়ে না যায়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ভালো কাজ করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে সেই ভালো কাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা।

২. আল্লাহ ভালো কাজের পুরস্কার দেবেন কয়েক গুণ। কিন্তু খারাপ কাজের শাস্তি দেবেন কৃতকর্মের সমপরিমাণ।

সূরা নমলের ৯১ ও ৯২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا وَلَهُ كُلُّ شَيْءٍ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ (91) وَأَنْ أَتْلُوَ الْقُرْآَنَ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَقُلْ إِنَّمَا أَنَا مِنَ الْمُنْذِرِينَ (92)

"আমি তো আদিষ্ট হয়েছি এই নগরীর রক্ষকের উপাসনা করতে, যিনি একে সম্মানিত করেছেন, সমস্ত কিছুই তাঁর। আমি আরো আদিষ্ট হয়েছি যেন- আমি (তাঁর সামনে) আত্মসমর্পণকারীদের একজন হই।" (২৭:৯১)

"আমি আরো আদিষ্ট হয়েছি (মানুষের সামনে) কুরআন তেলাওয়াত করতে; সুতরাং যে ব্যক্তি সৎপথ অনুসরণ করে সে তা করে নিজেরই কল্যাণের জন্য এবং কেউ ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করলে (সে ক্ষতি তার নিজেরই) সুতরাং (হে রাসূল) তুমি বলো- আমি তো কেবল একজন সতর্ককারী।" (২৭:৯২)

এই দুই আয়াতের পাশাপাশি এর পরবর্তী আয়াতে মক্কার মুশরিকদের প্রতি বিশ্বনবী (সা.)’র চূড়ান্ত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলছেন: তোমরা যদি মূর্তিপূজা থেকে বিরত না হও তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, আমি আমার দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করে তোমাদের কাছে দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দিয়েছি এবং সতর্ক করেছি। এখন তোমরাই কোন পথ অবলম্বন করবে তা বেছে নাও। হয় আল্লাহর বক্তব্য গ্রহণ করে হেদায়েত প্রাপ্ত হও অথবা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে পথভ্রষ্ট হয়ে যাও। অবশ্য তোমরা সঠিক বা ভ্রান্ত যে পথই অনুসরণ করো না কেন তার লাভ-ক্ষতি তোমাদেরকেই ভোগ করতে হবে। তোমরা একথা ভেব না যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলে আমার কোনো লাভ হবে এবং সত্য গ্রহণ না করলে আমার ক্ষতি হয়ে যাবে।

আমি আমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পন করেছি। তোমরা কাবাঘরে কাঠ ও পাথর দিয়ে যেসব মূর্তি তৈরি করে রেখেছ তাদের উপাসনা করার পরিবর্তে আমি কাবার মালিকের উপাসনা করছি। তিনি শুধু এই কাবাঘরের মালিক নন বরং গোটা সৃষ্টিজগতের প্রভু।

এই দুই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)’র দু’টি আলাদা দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তার আদেশ নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা। এই দিক দিয়ে অন্যান্য মুমিন মুসলমানের সঙ্গে রাসূলের মিল রয়েছে। দ্বিতীয় দায়িত্বটি হচ্ছে, আল্লাহর আয়াতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করা। বিষয়টি এরকম নয় যে, তিনি প্রতাপশালী শাসকদের মতো শুধু নির্দেশ দিয়ে যাবেন এবং জনগণ শুধু তা পালন করবে। বিশ্বনবী আগে নিজের জীবনে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করে মানুষকে দেখিয়েছেন তারপর অন্যদের কাছে দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলরা ছিলেন আল্লাহর আদেশের সামনে একনিষ্ঠ আত্মসমর্পনকারী। তাঁরা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বলেন নি এবং খেয়ালখুশি মতো কোনো কাজ করেন নি।

২. নবী-রাসূলসহ দ্বীন প্রচারকদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহর স্পষ্ট আয়াতের বাণী পৌঁছে দেয়া। এই বাণী গ্রহণ বা বর্জন এবং এর পরিণতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিজের ওপর বর্তায়।

৩. মানুষ যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে। এ কারণে ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব হচ্ছে সব সময় মানুষকে সতর্ক করা যাতে তারা ঈমানের পথ ত্যাগ করে অসৎ কর্ম করে না বসে।

সূরা নমলের শেষ আয়াত অর্থাৎ ৯৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ سَيُرِيكُمْ آَيَاتِهِ فَتَعْرِفُونَهَا وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (93)

"(হে রাসূল) তুমি বলো- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, তিনি শীঘ্রই তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন দেখাবেন, তখন তোমরা তা বুঝতে পারবে। তোমরা যা করো, সে সম্পর্কে তোমাদের প্রতিপালক অমনোযোগী নন।" (২৭:৯৩)

মহান আল্লাহর প্রশংসাসূচক এই আয়াত দিয়ে সূরা নামল শেষ হয়েছে। তাঁর প্রশংসা এজন্য করতে হবে যে, তিনি মানবজাতির মুক্তি ও হেদায়েতের জন্য আমাদের কাছে পবিত্র কুরআনের মতো মস্তবড় নেয়ামত পাঠিয়েছেন। সেইসঙ্গে প্রশংসা বিশ্বনবী (সা.)’রও যিনি একজন আন্তরিক শিক্ষক হিসেবে মানবজাতিকে সৌভাগ্যের পথ দেখাতে গোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: ভবিষ্যতে মানুষ আল্লাহর জ্ঞান ও অপার মহিমার অনেক নিদর্শন দেখতে পাবে। আমরা যদি বিশ্বজগতকে আল্লাহর সৃষ্টি মনে করি তাহলে আমরা সবক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পাবো। কিন্তু যদি এই সৃষ্টিজগতকে দৈবক্রমে ঘটে যাওয়া কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ভাবি তাহলে আমরা আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে। এই ব্যর্থতা আমাদেরকে পথভ্রষ্টতার দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআন নাজিল ও বিশ্বনবীর নবুওয়াত প্রাপ্তি মানবজাতির প্রতি মহান আল্লাহর দু’টি বড় অনুগ্রহ। কাজেই আমাদেরকে এজন্য মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

২. আমরা এ পর্যন্ত আল্লাহর যেসব নিদর্শন দেখতে পেয়েছি তা তাঁর বিশাল সৃষ্টির তুলনায় অতি নগণ্য। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে ভবিষ্যতে এরকম আরো অসংখ্য নিদর্শন মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

৩. আমাদেরকে যেকোনো কাজ করার যে স্বাধীনতা আল্লাহ দিয়েছেন তাকে আমাদের প্রতি তাঁর উদাসিনতা হিসেবে দেখলে চলবে না। মহান আল্লাহ প্রতিটি ক্ষণ আমাদের প্রতিটি কর্মের প্রতি নজর রেখেছেন। যেকোনো সময় ইচ্ছা করলেই তিনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন।

(সূরা আন-নমল সমাপ্ত)