মে ১১, ২০১৭ ১৬:৪৫ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৫ থেকে ৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫ থেকে ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ (5) وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُمْ مَا كَانُوا يَحْذَرُونَ (6)

“এবং সেদেশে যাদের হীনবল করা হয়েছিল আমি ইচ্ছা করলাম তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে (জনগণের) নেতৃত্ব দান করতে ও দেশের অধিকারী করতে।” (২৮:৫)

“এবং তাদের পৃথিবীতে শক্তিশালী করতে এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা- সেই শ্রেণির পক্ষ হতে ওরা আশঙ্কা করত।” (২৮:৬)

গত আসরে আমরা বলেছি, মহান আল্লাহ বনি-ইসরাইল জাতির প্রতি জুলুম ও নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বান জানাতে হযরত মূসা (আ.)কে অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কাছে পাঠান। কারণ, ফেরাউন এই জাতির লোকদেরকে হীনবল করে রেখেছিল। নানা অজুহাতে সে বনি-ইসরাইল জাতির পুরুষ লোকদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেরকে দাসী বানিয়ে রাখত।

আজকের এ দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: ফেরাউন ভাবত সে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে এবং তার মন যা চায় তাই করতে পারবে। কিন্তু তার জানা ছিল না, মহান আল্লাহ সাম্রাজ্যবাদী ও অহংকারীদেরকে এই পৃথিবীতেই অপমানিত করেন এবং তারা যাদের ওপর জুলুম ও নির্যাতন করেছে তাদেরকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন।

ফেরাউন ও তার উজির হামান এই আশঙ্কা করত যে, বনি-ইসরাইল জাতি যেকোনো সময় তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। এই ভয় থেকেই তারা এই জাতির ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাত। যুবক বয়সের যেকোনো যুবককে সন্দেহভাজন মনে হলেই তাকে হত্যা করত। কিন্তু ফেরাউন ও তার বাহিনী যে আশঙ্কায় সারাক্ষণ ভীত ছিল মহান আল্লাহ সে আশঙ্কাই বাস্তবায়ন করেন। বনি-ইসরাইল জাতি হযরত মূসা (আ.)-এর নেতৃত্বে ফেরাউনের বাহিনীকে পরাজিত করে এবং বিশাল সাম্রাজ্য ও এর অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যায়।

অবশ্য মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ কোনো কারণ ও যুক্তি ছাড়াই এমনটি করেন না। নির্যাতনের স্বীকার যেকোনো জাতিকে অত্যাচারী শাসকের জুলুম থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জনগণের পক্ষ থেকে আন্তরিক প্রচেষ্টা শুরু হলে তারপরই কেবল আল্লাহর সাহায্য আসবে এবং অত্যাচারী শাসকের পতন হবে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে আল্লাহর এই অমোঘ নিয়ম বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রতিটি জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে সেই জাতির কর্ম ও প্রচেষ্টার ভিত্তিতে। যেসব জাতি হাত গুটিয়ে বসে ছিল আল্লাহতায়ালা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেননি।

ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, শেষ জামানায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)-এর বংশধর হযরত মাহদি (আ.)-এর আবির্ভাব হবে। তিনি অত্যাচারী ও দাম্ভিক শক্তিগুলোর পতন ঘটিয়ে নির্যাতিত জাতিগুলোকে ক্ষমতায় অধিষ্টিত করবেন। আর এভাবে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য- সর্বত্র ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অত্যাচারী ও অহংকারী শাসকদের পতন ঘটিয়ে নির্যাতনের শিকার জাতিগুলোকে ক্ষমতায় বসানো মহান আল্লাহর নীতি।

২. আত্মম্ভরী শাসকরা আজীবন ক্ষমতায় চেপে থাকার লক্ষ্যে সমাজের সবচেয়ে কর্মঠ শ্রেণিকে হীনবল করে রাখে।

৩. ভবিষ্যতে মহান আল্লাহ নির্যাতনের শিকার মানুষকে ক্ষমতার মালিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এজন্য নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

৪. জালিম ও অত্যাচারী শাসকদের জন্য আখেরাতে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করার পাশাপাশি এই দুনিয়াতেও প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিদের হাতে তারা অপমানিত হবে।

সূরা কাসাসের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَأَوْحَيْنَا إِلَى أُمِّ مُوسَى أَنْ أَرْضِعِيهِ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ (7) فَالْتَقَطَهُ آَلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنًا إِنَّ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ (8)   

“এবং মূসা-জননীর অন্তরে আমি ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলাম- শিশুটিকে স্তন্য দান করো, যখন তুমি এর সম্পর্কে (ফেরাউনের পক্ষ থেকে) কোনো আশঙ্কা করবে তখন একে (সিন্দুকের মধ্যে ঢুকিয়ে) দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না ও (সে দূরে থাকবে বলে) দুঃখও করো না। (কারণ) আমি তাকে তোমার নিকট ফিরিয়ে দেব এবং একে একজন রাসূল করব।” (২৮:৭)

“অতঃপর ফেরাউনের লোকজন মুসাকে (নীল নদ থেকে) উঠিয়ে নিল, এর পরিণাম তো এই ছিল যে- (মূসা) ওদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হবে। নিঃসন্দেহে ফেরাউন, হামান এবং ওদের বাহিনী ছিল অপরাধী।” (২৮:৮)

এই দুই আয়াতে হযরত মূসা (আ.)-এর জন্ম ও তার পরবর্তী ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে। ফেরাউনের দরবারের জ্যোতির্বিদরা এই অত্যাচারী শাসককে জানিয়েছিল, এই বছর বনি-ইসরাইল জাতির কোনো এক ঘরে এমন এক পুত্রসন্তানের জন্ম হবে, যে ভবিষ্যতে তোমাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে ফেরাউন ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। সে চলতি বছর বনি-ইসরাইল জাতির প্রতিটি ঘরে নজরদারি করতে এবং কোনো ঘরে পুত্রসন্তানের জন্ম হওয়া মাত্র তাকে হত্যা করতে তার বাহিনীকে নির্দেশ দেয়। এরকম এক কঠিন পরিস্থিতিতে হযরত মূসা (আ.)-এর জন্ম হয়। তখন মহান আল্লাহ তার মায়ের অন্তরে গায়েবি আওয়াজের মাধ্যমে তাকে দুধ খাওয়ানোর নির্দেশ দেন। এরপর বলেন, একটি কাঠের সিন্দুক তৈরি করে তার মধ্যে হযরত মূসাকে রেখে নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও। মহান আল্লাহ নিজে তাকে রক্ষা করারও প্রতিশ্রুতি দেন।

হযরত মূসার মা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী কাঠের সিন্দুকে ভরে নিজের নবজাতক শিশুকে উত্তাল দরিয়ায় ভাসিয়ে দেন। কিন্তু মায়ের মনে থেকে যায় চরম শঙ্কা ও দুর্ভাবনা।

ওদিকে ঠিক এ সময় ফেরাউন ও তার স্ত্রী রাজপ্রাসাদের পাশে নীল দরিয়ার তীরে বসে অবকাশযাপন করছিল। তারা নদীতে একটি সিন্দুক ভেসে আসতে দেখে। ফেরাউন সিন্দুকটিকে পানি থেকে উপরে তুলে আনার নির্দেশ দেয়। সিন্দুকটি উপরে এনে এর মুখ খোলার পর দেখা যায় এর ভেতরে রয়েছে ফুটফুটে একটি নবজাতক শিশুপুত্র। ফেরাউন বনি-ইসরাইল জাতির পুত্রসন্তানদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল। কাজেই নদীতে ভেসে আসা শিশু দেখে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, এটি বনি-ইসরাইল জাতির কোনো দম্পতির শিশুসন্তান। কারণ, সরকারি বাহিনীর হাতে হত্যার হাত থেকে শিশুটিকে বাঁচাতে তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছে। এ অবস্থায় ফেরাউনের নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় তাকে হত্যা করা। অন্যদিকে ফেরাউনের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না বলে তার স্ত্রী বিবি আসিয়া চাচ্ছিলেন শিশুটিকে পালকপুত্র হিসেবে প্রতিপালন করতে।

কিন্তু দৃশ্যপটের পেছনে চলছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়তির খেলা। তিনি একদিকে একজন মাকে নির্দেশ দেন তার সন্তানকে উত্তাল দরিয়ায় ভাসিয়ে দিতে। অন্যদিকে সন্তানহীন নারী বিবি আসিয়ার অন্তরে এমন দয়ার সঞ্চার করে দেন যাতে এই শিশুসন্তানটি অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে হযরত মূসা (আ.) তার চরম শত্রু ফেরাউনের নিরাপদ প্রাসাদে প্রতিপালিত হন এই জালিম শাসককে একদিন ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার লক্ষ্যে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. চরম বিপদের মুখে মহান আল্লাহ হলেন মুমিন বান্দাদের সর্বোত্তম সহযোগী ও পরামর্শদাতা। তিনিই তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে বিপদ থেকে মুক্তির পথ বাতলে দেন।

২. অদৃশ্য মদদের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বস্তুগত উপকরণ ব্যবহার করে বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা করা কোনো অপরাধ নয়। আমাদেকে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করার পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

৩. মহান আল্লাহর অনেক আদেশ-নিষেধের কারণ আমাদের অজানা হলেও তাঁর নির্দেশ পালনে অবাধ্য হওয়া যাবে না। মনেপ্রাণে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করতে হবে যে, আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ এসেছে আমাদেরই মঙ্গলের জন্য। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা তা বুঝতে না পারলেও চূড়ান্তভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালন করলে আমাদেরই লাভ।#