মে ১৫, ২০১৭ ১৩:৩৯ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৯ থেকে ১৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَقَالَتِ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ قُرَّةُ عَيْنٍ لِي وَلَكَ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (9)

“এবং ফেরাউনের স্ত্রী বলল- (এই নবজাতক) আমার ও তোমার জন্য নয়ন-প্রীতিকর; একে হত্যা করো না, সে আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি। প্রকৃতপক্ষে ওরা এর পরিণাম বুঝতে পারেনি (এবং কাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নিচ্ছে তা ওদের জানা ছিল না)।” (২৮:৯)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, মিশরের অত্যাচারী ও খোদাদ্রোহী সম্রাট ফেরাউন ও তার স্ত্রী নীল নদের তীরে তাদের প্রাসাদের পাশে বসে থাকা অবস্থায় নদীতে ভেসে আসা একটি সিন্দুক দেখতে পান। ফেরাউনের নির্দেশে সিন্দুকটি তীরে এনে খুলে দেখা যায়, এর ভেতর একটি নবজাতক শুয়ে আছে। ফেরাউনের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, বনী-ইসরাইল জাতির এই শিশুটি যেহেতু পুত্রসন্তান তাই তাকে হত্যা করার কথা ছিল। সৈন্যরা শিশুটিকে হত্যা করতে উদ্যত হলে ফেরাউনের সতিসাধ্বী স্ত্রী আসিয়া তাকে বলে: কি কারণে তাকে হত্যা করতে চাও? আমাদের কোনো সন্তান নেই বলে ওকে আমরা নিজেদের সন্তানের মতো লালন পালন করে বড় করতে পারি যাতে একদিন সে এই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে।

বিবি আসিয়ার এই আবেগঘন বক্তব্য শুনে ফেরাউন শিশুটিকে হত্যা না করে প্রাসাদে রেখে দেয়ার নির্দেশ দেয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তকদির সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। কারণ, আল্লাহই চেয়েছিলেন ফেরাউনের শত্রু হযরত মূসাকে তার হাতেই রক্ষা করতে। যে মূসা (আ.)-এর ভয়ে ফেরাউন বনি-ইসরাইল জাতির অসংখ্য নবজাতককে হত্যা করেছে শেষ পর্যন্ত সেই নবজাতকের জীবন নিজের হাতে বাঁচিয়েছে ফেরাউন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শুধুমাত্র একজন নারী একটি জাতির ইতিহাস ও ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারেন। ফেরাউনের স্ত্রী শিশু মূসাকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করে বনি-ইসরাইল জাতিকে এই অত্যাচারী সম্রাটের হাত থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।

২. মানুষের অন্তরের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনি ইচ্ছা করলে কঠিনতম হৃদয়েও দয়ার সঞ্চার করতে পারেন। যে ফেরাউন একটি জাতির সব নবজাতককে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল তার হৃদয়েই নবজাতক মূসাকে দেখে দয়ার সঞ্চার হয় এবং তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

সূরা কাসাসের ১০ ও ১‌১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (10) وَقَالَتْ لِأُخْتِهِ قُصِّيهِ فَبَصُرَتْ بِهِ عَنْ جُنُبٍ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (11)

“এবং মূসা-জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিল। যাতে সে আস্থাশীল হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে- সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিত।” (২৮:১০)

“এবং সে মূসার ভগিনীকে বলল- এর পিছনে পিছনে যাও, সে ওদের (অর্থাৎ ফেরাউন ও তার অনুচরদের) অজ্ঞাতসারে দূর হতে তাকে দেখছিল।” (২৮:১১)

হযরত মূসার মা নিজের সন্তানকে নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয়ার পর ভীষণভাবে অস্থির হয়ে পড়েন। সন্তানের প্রতি মায়ার টানে তিনি নদী থেকে আবার হযরত মূসাকে তুলে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যে আল্লাহ তাকে তার সন্তানকে আবার তার কোলে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনিই এ সময় তার মনকে শক্ত করে দেন। গায়েবি প্রতিশ্রুতিতে হযরত মূসার মায়ের মন শান্ত হয়। তিনি হযরত মূসার বড় বোনকে সিন্দুকটি অনুসরণ করে নীল নদের তীর ধরে হাঁটতে বলেন যাতে দেখা যায় এটি কার হাতে পড়ে এবং এর পরিণতি কি হয়।

হযরত মূসার বোন সরকারি সেনাদের অগোচরে দূর থেকে সিন্দুকটি অনুসরণ করে হাঁটতে থাকেন। ফেরাউন ও তার স্ত্রী যখন নদী থেকে সিন্দুক তুলে আনে তখনও সৈন্যরা তাকে দেখতে পায়নি। যদি দেখতে পেত তাহলে তারা বুঝে ফেলত যে, এই শিশুর সঙ্গে মেয়েটির কোনো সম্পর্ক আছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. গোপন কথা অন্তরে ধারণ করা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়া ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ। বিশেষ করে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ও মুজাহিদদের জিহাদ সংক্রান্ত গোপন কথা কোনো অবস্থাতেই প্রকাশ করা যাবে না।

২. ঈমানদার ব্যক্তিরা মহান আল্লাহর প্রতি নির্ভর করেন বলে যেকোনো বিপদ-আপদে স্থিরচিত্ত থাকেন।

৩. আল্লাহর ওপর নির্ভরতার অর্থ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। আল্লাহ ওপর পূর্ণ নির্ভরতা সত্ত্বেও হযরত মূসার মা তার শিশুপুত্রের পরিণতি দেখার জন্য নিজের মেয়েকে সিন্দুকের পেছনে পাঠিয়েছিলেন।

সূরা কাসাসের ১২ ও ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِنْ قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ (12) فَرَدَدْنَاهُ إِلَى أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (13)   

“এবং পূর্ব হতেই আমি ধাত্রীস্তন্য পান থেকে তাকে (অর্থাৎ মূসাকে) বিরত রেখেছিলাম। মূসার ভগিনী বলল- তোমাদের কি আমি এমন এক পরিবারের কথা বলব, যারা তোমাদের হয়ে একে লালন-পালন করবে এবং এর মঙ্গলকামী হবে?” (২৮:১২)

“অতঃপর আমি (এভাবেই) তাকে তার মাতার নিকট ফিরিয়ে দিলাম- যাতে (সন্তানকে দেখে) তার নয়ন জুড়িয়ে যায়, সে দুঃখ না করে এবং বুঝতে পারে যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা বোঝে না।” (২৮:১৩)

যে নবজাতক কয়েক ঘন্টা তার মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় সে চিৎকার করবে এবং মায়ের দুধ ছাড়া কিছুতেই শান্ত হবে না। শিশু মূসার চিৎকারে ফেরাউন তার জন্য ধাত্রী আনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় শিশুটি কোনো ধাত্রী স্তনই পান করছিল না। এ অবস্থায় প্রাসাদের চাকর-বাকর ও সৈন্যরা অস্থির হয়ে পড়ে।  এ সময় সেখানে উপস্থিত হযরত মূসার বোন প্রস্তাব দেয়, তার জানা একজন ধাত্রী আছেন যিনি এই শিশুটিকে লালন-পালন করতে পারবেন। ফেরাউনের সৈন্যরা বাধ্য হয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং কোনোকিছু না বুঝেই হযরত মূসাকে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করে। শিশুটি এই নারীর কোলে যাওয়ার পর কান্না থামায় এবং ফেরাউনের সেনারাও বড় ধরনের ঝামেলা থেকে মুক্তি পায়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শত্রুর মোকাবিলায় বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করতে হবে এবং শত্রুকে বুঝতে না দিয়েই নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। হযরত মূসার বোন একবারও বলেনি যে, সে তার মাকে আনতে যাচ্ছে। সে শুধু বলেছে, সে এমন একজন নারীকে চেনে যে এই শিশুর ধাত্রী হতে পারে।

২. আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। মহান আল্লাহর সব নির্দেশ আমাদের সীমাবদ্ধ বুদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না।

৩. সন্তানের উপস্থিতি মাকে প্রশান্তি দেয়। যেসব মা সন্তান নিতে চান না এবং মনে করেন সন্তান ছাড়া ঝামেলামুক্ত জীবন কাটাতে পারবেন তারা সন্তানের প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হন।#