মে ১৬, ২০১৭ ১৩:৩৩ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ১৪ থেকে ১৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آَتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (14)

“এবং যখন মূসা (শারিরীক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে) পূর্ণ যৌবনে উপনীত ও পরিণত বয়স্ক হলো, তখন আমি তাকে হিকমত ও জ্ঞান দান করলাম; এইভাবে আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি।” (২৮:১৪)

এই আয়াতে হযরত মূসা (আ.)-এর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: যখন হযরত মূসা যুব বয়সে উপনীত হন তখন মহান আল্লাহ তার চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি এতটা বাড়িয়ে দেন যে, তিনি সৃষ্টির রহস্য উপলব্ধি করার পাশাপাশি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সহজেই বুঝতে সক্ষম হন। এখানে মনে রাখতে হবে, যুব বয়স হচ্ছে শারিরীক দিক দিয়ে প্রতিটি মানুষের শ্রেষ্ঠ সময়। এই সময়টায় পুত-পবিত্র থাকা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এই কঠিন কাজটিকে নিজেদের জন্য সহজ করে নিয়েছেন। হযরত মূসা (আ.)ও নিজেকে পবিত্র রাখার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সৎকর্মর্শীল হতে পারলে যেকোনো মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। অবশ্য, আল্লাহতায়ালা এখানে হযরত মূসার প্রতি অনুগ্রহ বলতে তাঁকে নবুওয়াত দানের কথাও বুঝিয়েছেন যা তাঁকে পরবর্তীতে দেয়া হয়েছে।

এ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. যৌবনকাল হচ্ছে একজন মানুষের শ্রেষ্ঠ সময়। আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মের দিক দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য এই সময়টার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা উচিত।

২. সাধ্য অনুযায়ী সৎকর্ম অর্থাৎ পরোপকার করার মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করতে পারি।

সূরা কাসাসের ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَى حِينِ غَفْلَةٍ مِنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهَذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَى فَقَضَى عَلَيْهِ قَالَ هَذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُضِلٌّ مُبِينٌ (15)   

“এবং সে নগরীতে প্রবেশ করল যখন এর অধিবাসীরা (তার আগমন এবং শহরের ঘটনাবালী সম্পর্কে) কিছুই জানত না। তারপর সেখানে সে দু’জন লোককে মারামারিতে লিপ্ত অবস্থায় পেয়েছিল, একজন তার নিজের দলের এবং অপরজন তার শত্রু দলের, মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল, তখন মূসা ওকে ঘুষি মারল এবং তাকে হত্যা করে বসল। মূসা (স্বগোতক্তি করে) বলল- শয়তানের প্ররোচনায় এই (সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড) ঘটল, সে তো প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী।” (২৮:১৫)

হযরত মূসা (আ.) যুব বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত মিশরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের প্রাসাদে বসবাস করেন। সেখানে তিনি প্রাসাদের অন্যান্য সদস্যের মতো ঘোড়সওয়ার এবং যুদ্ধবিদ্যার কলাকৌশল রপ্ত করেন। একদিন তিনি প্রাসাদ থেকে বাইরে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের বেশে রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এমন সময় তিনি দু’জন লোককে মারামারি করতে দেখেন যারা পরস্পরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। তাদের একজন ছিল মিশরের স্থানীয় কিবতি সম্প্রদায়ের এবং অন্যজন ছিল হযরত মূসার নিজ সম্প্রদায় বনি-ইসরাইলের। বনি-ইসরাইলের লোকটি বুঝতে পারল যে, মূসা তার নিজের সম্প্রদায়ের। তাই সে তাঁর সাহায্য চাইল। হযরত মূসা তখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকটির পক্ষ নিয়ে কিবতি সম্প্রদায়ের লোকটিকে সজোরে ঘুষি মারলেন। এক ঘুষিতেই লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা গেল।

হযরত মূসা নিজেও ঘুষি মারার আগে বুঝতে পারেননি যে, তার এক ঘুষিতেই লোকটির ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল বনি-ইসরাইলের লোকটি নির্যাতিত হচ্ছে, কাজেই তিনি তাকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিবতি সম্প্রদায়ের লোকটিকে হত্যা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। এ অবস্থায় সম্বিত ফিরে পান হযরত মূসা। তিনি মনে মনে বলেন, শয়তানের প্ররোচনায় তিনি এ কাজ করে ফেলেছেন কারণ, অভিশপ্ত শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু এবং তার কাজই হলো মানুষের মধ্যে বিবাদ ও সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়া।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. হযরত মূসা ফেরাউনের প্রাসাদে লালিত পালিত হলেও অত্যাচার করতে শেখেননি বরং তিনি ছিলেন নির্যাতিতদের পৃষ্ঠপোষক। ঠিক যেমনটি বিবি আসিয়া ফেরাউনের প্রাসাদে বসবাস করা সত্ত্বেও পরবর্তীতে হযরত মূসা (আ.)-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার কারণে তাকে জীবন দিতে হয়েছিল।

২. বীরত্বপূর্ণ আচরণ, নির্যাতিতদের প্রতি সাহায্য এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল সব  নবী-রাসূলের বৈশিষ্ট্য।

৩. মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়া শয়তানের কাজ। কাজেই আমাদেরকে নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যাতে শয়তান আমাদের ওপর চড়াও হতে না পারে।

এই সূরার ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (16) قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ (17)  

“মূসা বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করো, অতঃপর আল্লাহতায়ালা তাকে ক্ষমা করলেন, তিনি তো নিঃসন্দেহে ক্ষমাশীল, দয়াময়।” (২৮:১৬)

“মূসা আরো বলল- হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ তার শপথ, আমি কখনও অপরাধীকে সাহায্য করব না।” (২৮:১৭)

কিবতি সম্প্রদায়ের একজন লোক নিহত হওয়ার পর অন্য কিবতিরা তার হত্যাকারীকে আটক করে তাকে হত্যা করতে চাইবে-এটাই স্বাভাবিক। এ অব্স্থায় হযরত মূসা নিজের প্রতি জুলুম করার কারণে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ফেরাউনের বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। মহান আল্লাহ তাঁর আবেদন কবুল করে তাকে কিবতিদের হাত থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহতায়ালার এই অনুগ্রহের কারণে তিনি সৃষ্টিকর্তাকে এই প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি জীবনে কখনও অপরাধী ও সীমালঙ্ঘনকারীদের সাহায্য করবেন না। এ কারণে তিনি আর অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের প্রাসাদে ফিরে যাননি এবং চিরতরে সীমালঙ্ঘনকারী কিবতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মুমিন ব্যক্তিদেরকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দেখতে হবে, এই কাজ করতে গিয়ে যেন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।

২. অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো অপরাধ করে ফেললেও তার কিছু স্বাভাবিক পরিণতি আছে যা মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলতে পারে।

৩. শারীরিক ও আর্থিকভাবে আল্লাহ যদি আমাদের শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান করেন তাহলে তার শোকর আদায় করতে হবে নির্যাতিতদের সাহায্য ও অপরাধীদের প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে।#