সূরা আল-কাসাস; আয়াত ১৮-২১ (পর্ব-৫)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ১৮ থেকে ২১ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১ ও ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَائِفًا يَتَرَقَّبُ فَإِذَا الَّذِي اسْتَنْصَرَهُ بِالْأَمْسِ يَسْتَصْرِخُهُ قَالَ لَهُ مُوسَى إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُبِينٌ (18) فَلَمَّا أَنْ أَرَادَ أَنْ يَبْطِشَ بِالَّذِي هُوَ عَدُوٌّ لَهُمَا قَالَ يَا مُوسَى أَتُرِيدُ أَنْ تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالْأَمْسِ إِنْ تُرِيدُ إِلَّا أَنْ تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَنْ تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ (19)
“অতঃপর ভীত শঙ্কিত অবস্থায় সেই নগরীতে তার (অর্থাৎ মূসার) প্রভাত হলো। হঠাৎ সে শুনতে পেল- আগের দিন যে ব্যক্তি তার সাহায্য চেয়েছিল সে (আবার) তার সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে, মূসা তাকে বলল- নিশ্চয়ই তুমি প্রকাশ্য বিপথগামী।” (২৮:১৮)
“অতঃপর মূসা যখন উভয়ের শত্রুকে প্রহার করতে উদ্যত হলো, তখন সে ব্যক্তি বলে উঠল- হে মূসা! গতকাল তুমি যেভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, সেভাবে কি আমাকেও হত্যা করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চাও, শান্তি স্থাপনকারী হতে চাও না।” (২৮:১৯)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত মূসা (আ.) যৌবনে পদার্পনের পর একদিন অত্যাচারী সম্রাট ফেরাউনের প্রাসাদ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাঁটছিলেন। সে সময়ে বনি-ইসরাইল জাতির মানুষ মিশরের শাসকের পাশাপাশি স্থানীয় কিবতি জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চরম জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল। হযরত মূসা রাস্তায় দেখলেন এক কিবতি ব্যক্তি বনি-ইসরাইলের এক যুবককে প্রহার করছে। আল্লাহর নবী নির্যাতিত ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে যান এবং কিবতি ব্যক্তিকে সজোরে ঘুষি মারেন। এক আঘাতেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: এ ঘটনার পর হযরত মূসা ফেরাউনের প্রাসাদে ফিরে না গিয়ে শহরে আত্মগোপন করেন। সরকারি সেনারা তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে- এই ভয়ে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি আগের দিনের প্রহারের শিকার সেই ব্যক্তিকে দেখেন আরেক লোকের সঙ্গে মারামারি করছে। বনি-ইসরাইলের সেই লোকটি এবারও হযরত মূসার সাহায্য চায়। এ সময় আল্লাহর নবী তাকে বলেন, তুমি তো মস্তবড় আহম্মক! প্রতিদিনই তুমি একজন করে কিবতির সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছো এবং নিজের পাশাপাশি আরো কিছু লোকের জীবনকে বিপদাপণ্ন করে তুলছো! তোমার এ কাজের কারণে বনি-ইসরাইল জাতির বাকি লোকরাও বিপদে পড়ছে! কিন্তু তারপরও হযরত মূসা যখন দেখলেন লোকটি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তখন তিনি তার সাহায্যে এগিয়ে যান। তবে এবার কিবতি লোকটিকে আঘাত করার পরিবর্তে তার দু’হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন যাতে সে বনি-ইসরাইলের ব্যক্তিকে আঘাত করতে না পারে।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ছাড়া ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া যাবে না। সেইসঙ্গে কোনো ফল পাওয়ার আশা না থাকলে সংঘর্ষেই যাওয়া যাবে না।
২. আপনজন ভুল করলে তার সমালোচনা করার পাশাপাশি তাকে সঠিক পথ দেখাতে হবে। সেইসঙ্গে শত্রুর অত্যাচারের মোকাবিলায় তাকে একা ফেলে রাখা যাবে না।
৩. শত্রুর মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।
এবার সূরা কাসাসের ২০ ও ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى قَالَ يَا مُوسَى إِنَّ الْمَلَأَ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ (20) فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (21)
“(এবং সেই সময়) নগরীর দূরপ্রান্ত হতে এক ব্যক্তি (তার কাছে) ছুটে এলো ও বলল- হে মুসা! ফেরাউনের পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে। সুতরাং তুমি (অনতিবিলম্বে শহরের) বাইরে চলে যাও, আমি তো তোমার মঙ্গলকামী।” (২৮:২০)
“মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়ল এবং বলল- হে আমার প্রতিপালক! তুমি এই জালেম-সম্প্রদায়ের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করো।” (২৮:২১)
হযরত মূসা (আ.)’র হাতে একজন কিবতির হত্যাকাণ্ডের খবর ফেরাউনের দরবারে পৌঁছে গিয়েছিল। সেইসঙ্গে তখনকার ক্রীতদাস শ্রেণি অর্থাৎ বনি-ইসরাইল জাতির এক যুবক পরপর দু’দিন যে দু’জন কিবতির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে সে খবরও ফেরাউন জেনে গিয়েছিল। রাজদরবারে এ খবরও পৌঁছাল যে, দু’দিনই মূসা বনি-ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে কিবতিদের পরাজিত করেছে। এ অবস্থায় ফেরাউনের দরবারের এক ব্যক্তি হযরত মূসার কাছে গিয়ে খবর দেয় যে, তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনা হচ্ছে রাজ দরবারে। সে আল্লাহর নবীকে শহর ত্যাগ করার পরামর্শ দেয়।
হাদিসে এসেছে, এই ব্যক্তির নাম ছিল ‘হাযকিল’ এবং পরবর্তীতে হযরত মূসা নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তিনি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং ‘আলে-ফেরাউনের মুমিন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তিনি এবং ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আসিয়া রাজপ্রাসাদে বসবাস করলেও ফেরাউনের রাজত্বের বিরোধী ছিলেন এবং তারা মনেপ্রাণে চাইতেন কোনো এক বিদ্রোহে এই সাম্রাজ্যের পতন হোক। ‘হাযকিল’ হযরত মূসার আচরণ দেখে বুঝেতে পেরেছিলেন ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার যোগ্যতা তার আছে। তাই তাঁকে সরকারি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাজপ্রাসাদ থেকে শহরে ছুটে গিয়েছিলেন।
আল্লাহর নবী ওই ব্যক্তির বার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শহর ত্যাগ করেন। তিনি প্রতি মুহূর্তে সমূহ বিদপের আশঙ্কা করলেও মহান আল্লাহ তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে রক্ষা করে নিরাপদে মিশরের ভূখণ্ড থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. জালেম বা অত্যাচারীকে সাহায্য করা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে মজলুম ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের সাহায্য করার পাশাপাশি অত্যাচারী শাসকের জুলুম প্রতিহত করার জন্য রাজপ্রাসাদে প্রভাবশালী ব্যক্তির পদ গ্রহণকে ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে।
২. আমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্য কাজ করি তাহলে বিপদে-আপদে তিনি আমাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবেন।
৩. কখনো কখনো দ্রুতগতিতে সঠিক সময়ে একটি খবর পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। ফেরাউনের দরবারের ওই ব্যক্তি সঠিক সময়ে হযরত মূসার কাছে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের খবর পৌঁছে না দিলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।
৪. অত্যাচারী রাজার দরবারেও ঈমানদার ব্যক্তি থাকতে পারেন। অন্যদিকে জীর্ণ কুটিরে বসবাসকারীদের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে অসৎকর্মশীল ও বেঈমান ব্যক্তির সন্ধান। কাজেই ব্যক্তির ঈমান আছে কি নেই সেটিই মাপকাঠি হওয়া উচিত; রাজপ্রাসাদ বা জীর্ণ কুটির নয়।#