মে ১৭, ২০১৭ ১২:৫৯ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ২২ থেকে ২৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ (22) وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأتَيْنِ تَذُودَانِ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ (23)

“এবং যখন মূসা মাদায়েন অভিমুখে যাত্রা করল, তখন বলল- আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরলপথ প্রদর্শন করবেন।” (২৮:২২)

“এবং যখন সে মাদায়েনের কূপের নিকট পৌঁছাল, দেখল একদল লোক তাদের (চতুস্পদ জন্তুগুলোকে) পানি খাওয়াচ্ছে এবং ওদের পশ্চাতে দুজন রমণী তাদের পশুগুলো আগলে রাখছে (যাতে সেগুলো কূপের দিকে যেতে না পারে)। মূসা বলল- তোমাদের কি ব্যাপার (কেন তোমরা নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছ)? ওরা বলল- যতক্ষণ রাখালেরা ওদের জন্তুগুলোকে নিয়ে সরে না যায় ততক্ষণ আমরা আমাদের জন্তুগুলোকে পানি খাওয়াতে পারি না এবং আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ (বলে আমাদেরকে এ কাজে আসতে হয়েছে)।” (২৮:২৩)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, মিশরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের দরবারের এক পারিষদ হযরত মূসা (আ.)কে এ খবর পৌঁছে দেন যে, রাজদরবারে তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি আল্লাহর নবীকে অবিলম্বে শহর ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত মূসা (আ.) ফেরাউনের শাসনাধীন দেশ মিশর থেকে বেরিয়ে শাম বা বর্তমানের সিরিয়ার দক্ষিণে মাদায়েন এলাকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন যাতে ফেরাউনের সৈন্যরা তাঁর খোঁজ না পায়। কিন্তু এই সফরে তিনি যেকোনো সময় ফেরাউনের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বন্দি হতে পারতেন। এ কারণে তিনি সরলপথে পরিচালিত হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চান। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মাদায়েন শহরে পৌঁছে যান। তবে শহরে ঢোকার মুখে তিনি একটি পানির কূপ দেখতে পান। সেখানে রাখালরা তাদের মেষগুলোকে পানি খাওয়াচ্ছিল। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি তৃষ্ণা মেটানোর জন্য তিনি স্বাভাবিকভাবেই কূপের কাছে যান।

সেখানে তিনি দেখেন, অন্যান্য রাখালের মতো দুই যুব মহিলা তাদের মেষগুলোকে পানি খাওয়ানোর জন্য কূপের কাছে অপেক্ষা করছে। তবে তারা পানি খাওয়ানোর পরিবর্তে তাদের মেষগুলো যাতে কূপের কাছে অন্য রাখালদের মেষপালের সঙ্গে মিশে না যায় সে চেষ্টা করছে। হযরত মূসার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লাগল। তিনি ওই দুই নারীকে জিজ্ঞাসা করলেন তারা কেন নিজেদেরকে কূপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে? তারা উত্তরে বলল: আমাদের বাবার বয়স হয়েছে বলে আমরা নারী হওয়া সত্ত্বেও মেষ চড়াতে মাঠে এসেছি। কিন্তু আমরা পুরুষদের কাছ থেকে দূরে থাকি বলে রাখালদের মেষগুলো পানি না খাওয়া পর্যন্ত আমরা প্রতিদিনই এভাবে দূরে অপেক্ষা করি। তারা চলে যাওয়ার পর আমরা আমাদের মেষগুলোকে পানি খাওয়াই।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নিজের জনপদ থেকে হিজরত করে অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছিল প্রায় সব নবী-রাসূলের বৈশিষ্ট্য। এই প্রক্রিয়ায় তারা নিজেদেরকে সম্ভাব্য বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করতেন।

২. যেকোনো কর্মে উদ্যত হওয়ার পরই আল্লাহর কাছে দোয়া করলে সুফল পাওয়া যায়। হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার কোনো অর্থ হয় না।

৩. কর্মক্ষেত্রসহ যেকোনো স্থানে নারী ও পুরুষের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখা ইসলামের নীতি। হযরত মূসা যে দুই নারীকে দেখেছিলেন তারা ছিলেন আল্লাহর আরেক নবী হযতর শোয়াইব (আ.)-এর কন্যা এবং তারা নিজেদের পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য রাখালদের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেন।

৪. প্রয়োজনে আল্লাহর নবীর কন্যারা রাখালের কাজ করেন কিন্তু জীবনধারণের জন্য নিজেদেরকে ছোট করেন না বা মানুষের কাছে হাত পাতেন না।

সূরা কাসাসের ২৪ ও ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ (24) فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (25)  

“মূসা তখন ওদের জন্তুগুলোকে পানি খাওয়াল, তৎপর সে ছায়ার নীচে আশ্রয় গ্রহণ করে বলল- হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই দেখাবে আমি তার মুখাপেক্ষী।” (২৮:২৪)

“(কিছুক্ষণের মধ্যে) রমণীদ্বয়ের একজন সলজ্জ পদক্ষেপে তার নিকট এলো ও বলল, আমার পিতা (হযরত শোয়াইব) তোমাকে পুরস্কৃত করবার জন্য আমন্ত্রণ করেছেন কেননা তুমি আমাদের জানোয়ারগুলোকে পানি খাইয়েছ, অতঃপর মূসা তার (অর্থাৎ হযরত শোয়াইবের) নিকট এসে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করলে সে বলল- ভয় করো না, তুমি জালেম সম্প্রদায়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছ।” (২৮:২৫)

প্রচণ্ড ক্লান্তি সত্ত্বেও হযরত মূসা ওই দুই নারীর সাহায্যে এগিয়ে যান এবং রাখালদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কূপ থেকে পানি তুলে তাদের মেষগুলোকে খাওয়ান। পানি খাওয়ানো শেষ হলে হযরত মূসা নারীদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক দাবি না করেই একটি গাছের ছায়ায় গিয়ে ক্লান্তিতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েন। কিন্তু তখন তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। এলাকাটি অপরিচিত বলে কার কাছে খাবার চাইবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। এ কারণে তিনি কোনো একটি আশ্রয় ও খাবারের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

অন্যদিকে হযরত শোয়াইবের দুই কন্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় আগেভাগেই বাড়িতে ফিরে যান। বাবা তাদেরকে তাড়াতাড়ি আসতে দেখে তাদের কাছে জানতে চান- তোমরা কি আজ মেষগুলোকে পানি না খাইয়েই বাড়ি ফিরে এসেছ? এর জবাবে মেয়েরা হযরত মূসার সাহায্য করার কাহিনী তাদের বাবাকে শোনায়। বাবা তাদেরকে বলেন, ওই ব্যক্তিকে বাড়িতে ডেকে আনো যাতে তার পরিশ্রমের পুরস্কার দিতে পারি। এ অবস্থায় ওই কন্যাদের একজন সলজ্জ পদক্ষেপে হযরত মূসার কাছে গিয়ে তাকে হযরত শোয়াইবের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেয় এবং তাকে বাড়ি আসার আমন্ত্রণ জানায়। হযরত মূসা বুঝতে পারেন, ওই নারীরা কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং তাদের বাবা যেকোনো উপায়ে তাকে পারিশ্রমিক দিতে চান। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাদের বাড়িতে যান। হযরত মূসা বুঝতে পারেন গৃহকর্তা হযরত শোয়াইব (আ.) আল্লাহর নবী। তাই তিনি নিজের জীবনের সব কাহিনী তার কাছে বর্ণনা করেন। হযরত শোয়াইব সব শুনে বলেন: তুমি অত্যাচারীদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছ এবং এখন যতদিন খুশি আমার বাড়িতে থাকতে পারো।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হলো:

১.  নিজেরা সমস্যায় জর্জরিত থাকার পরও অন্যকে সাহায্য করার কথা ভুলে যাওয়া যাবে না।

২. যেকোনো সংকটে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। তাহলে আমাদের জন্য উপকারী কোনো পথ আল্লাহতায়ালা অবশ্যই বাতলে দেবেন।

৩. নবী-রাসূলদের জীবনে আমরা দেখতে পাই, নারীরা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এ বিষয়টি এখনো বৈধ; তবে শর্ত হচ্ছে- নারীদেরকে সতীত্ব বজায় রাখতে হবে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশার সুযোগ দেয়া যাবে না।

এবং

৪. কেউ আমাদের উপকার করলে যেকোনো উপায়ে হোক তার প্রতিদান দিতে হবে।#