সূরা আল-কাসাস; আয়াত ২৯-৩২ (পর্ব-৮)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ২৯ থেকে ৩২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَلَمَّا قَضَى مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آَنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا قَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آَنَسْتُ نَارًا لَعَلِّي آَتِيكُمْ مِنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ جَذْوَةٍ مِنَ النَّارِ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ (29)
“মূসা যখন (শোয়াইবের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী) তার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সপরিবারে (মিশরের দিকে) যাত্রা করল তখন তূর পর্বতের দিকে আগুন দেখতে পেল, সে তার পরিজনবর্গকে বলল- তোমরা অপেক্ষা করো, আমি আগুন দেখেছি, সম্ভবত আমি সেখান হতে তোমাদের জন্য কোনো খবর আনতে পারি অথবা এক জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ড আনতে পারি, যাতে তোমরা আগুন পোহাতে পারো।” (২৮:২৯)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, মাদায়েনে হযরত শোয়াইবের মেয়েকে বিয়ে করেন হযরত মূসা (আ.)। বিয়ের আগে তিনি আট বছর হযরত শোয়াইবের পরিবারের জন্য রাখালের কাজ করতে সম্মত হন এবং বলেন আট বছর পর তিনি চাইলে আরো দু’বছর তাদের পরিবারের সেবা করবেন। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর হযরত মূসা নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মাতৃভূমি মিশরের দিকে রওনা হন। কিন্তু এ সফর ছিল অনেক লম্বা ও বিপদসঙ্কুল। শাম বা বর্তমান সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর রাতের অন্ধকারে তারা পথ হারিয়ে ফেলেন এবং এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজতে থাকেন যিনি তাঁদেরকে সঠিক পথ বলে দিতে পারেন। এমন সময় হযরত মূসা তুর পাহাড়ের চূড়ায় আগুন দেখতে পান। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের বলেন, যে ব্যক্তি ওখানে আগুন জ্বালিয়েছে সে নিশ্চয়ই এই এলাকা চেনে এবং আমাদেরকে মিশর যাওয়ার পথ বলে দিতে পারবে। আর তা না হলে ওখান থেকে অন্তত একখণ্ড জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে আসতে পারবো যা দিয়ে এই শীতের রাতে আগুন পোহানো যায়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পরিবারের অভিভাবক পুরুষ ব্যক্তি তার স্ত্রী ও সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব পালন করেন। কাজেই পরিবারের অন্য সদস্যদেরও উচিত সব সমস্যা সমাধানে অভিভাবককে সাহায্য করা।
২. মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা একটি স্বাভাবিক বিষয়। বহু বছর প্রবাসে কাটানোর পর প্রতিটি ব্যক্তির মার্তৃভূমিতে ফিরে আসার অধিকার রয়েছে।
৩. যে মূসা পরাক্রমশালী সম্রাট ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে বড় হয়েছেন সেই মূসাকেই ১০ বছর অন্যের রাখালের দায়িত্ব পালন করতে হয়। মহান আল্লাহ এটি করেন যাতে রাজপ্রাসাদের অহংকার থেকে মূসা (আ.) বেরিয়ে আসতে এবং নবুওয়াতের কঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন।
সূরা কাসাসের ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ مِنْ شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَنْ يَا مُوسَى إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ (30)
“যখন মূসা আগুনের নিকট পৌঁছাল তখন উপত্যকার দক্ষিণ পার্শ্বে পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত এক বৃক্ষ হতে তাকে আহ্বান করে বলা হলো- হে মূসা! আমিই আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (২৮:৩০)
হাদিসে এসেছে, হযরত মূসা আগুনের কাছাকাছি যাওয়ার পর উপলব্ধি করেন, জীবনে যত আগুন তিনি দেখেছেন তার সঙ্গে এই আগুনের পার্থক্য আছে। কোনো শুকনো গাছে নয় বরং আগুন জ্বলছে একটি তাজা ও সবুজ গাছে। এ ছাড়া, এই আগুন থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটলেও এখান থেকে কোনো উত্তাপ বেরুচ্ছে না। অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে তিনি আগুনের সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এমন সময় হঠাৎ ডান দিকের একটি গাছের ভেতর থেকে তিনি একটি ধ্বণি শুনতে পান। কেউ তাঁকে উদ্দেশ করে বলছে: হে মূসা! তোমাকে যে এখানে নিয়ে এসেছে সে হচ্ছি আমি। আমি আল্লাহ, তুমিসহ সকল সৃষ্টির পরিচালক। মহান আল্লাহ এভাবে তার প্রিয় বান্দা ও রাসূল হযরত মূসার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। আল্লাহর সঙ্গে হযরত মূসার এই কথোপকথন অন্যান্য নবীর সঙ্গে তাঁর পার্থক্য তৈরি করে দেয় এবং তিনি ‘কলিমুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত হন।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হলো:
১. ইসলামি সংস্কৃতিতে যেসব স্থান আল্লাহতায়ালার সঙ্গে সম্পর্কিত সেগুলো পবিত্র স্থান। এসব জায়গা পাহাড় নাকি মরুভূমি সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
২. হযরত মূসা হারিয়ে যাওয়া পথ খুঁজে পেতে এবং উত্তপ্ত আগুনের কাষ্ঠখণ্ড আনার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় যান। অথচ মহান আল্লাহ সেখানে তাঁকে মানব জাতির হেদায়েতের দায়িত্ব অর্পন করেন। এখান থেকে বোঝা যায়, যেকোনো কিছু পাওয়ার জন্য আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে ঠিকই; কিন্তু এর ফল কি হবে তার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
এই সূরার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ فَلَمَّا رَآَهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّى مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ يَا مُوسَى أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ إِنَّكَ مِنَ الْآَمِنِينَ (31) اسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ وَاضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ فَذَانِكَ بُرْهَانَانِ مِنْ رَبِّكَ إِلَى فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ (32)
“আরো বলা হলো- (হে মূসা) তুমি তোমার ষষ্ঠি নিক্ষেপ করো, অতঃপর যখন সে লাঠিটিকে সাপের ন্যায় ছোটাছুটি করতে দেখল তখন পেছনে না তাকিয়ে বিপরীত দিকে ছুটতে লাগল, তাকে বলা হলো, হে মূসা! ফিরে এস, ভয় করো না; তুমি তো নিরাপদ।” (২৮:৩১)
“তোমার হাত তোমার বগলে রাখো, এটি নির্মল উজ্জ্বলরূপে বের হয়ে আসবে। ভয় দূর করবার জন্য তোমার হস্তদ্বয় বুকের উপর চেপে ধরো, এই দু’টো ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গের জন্য তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত প্রমাণ, ওরা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়।” (২৮:৩২)
অভূতপূর্ব আগুন দেখার ও অস্বাভাবিক শব্দ শোনার পর হযরত মূসা স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ হযরত মূসাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, তিনি যা দেখেছেন ও যা শুনছেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। সেইসঙ্গে তিনি তাঁর নবীকে দু’টি মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেন। একটি হচ্ছে হযরত মূসার হাতের লাঠির সাপে পরিণত হওয়া এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাঁর হাতের তালু উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। প্রথমে ভয় পেলেও পরে আল্লাহর নবী যা কিছু শুনেছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হন। এরপর মহান আল্লাহ তাঁকে এই দু’টি অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে মিশরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। হযরত মূসার ওপর দায়িত্ব পড়ে সেই প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার- যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তবে এবার আর বসবাসের জন্য নয় বরং ফেরাউনকে এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দেয়ার পাশাপাশি বনি-ইসরাইল জাতির প্রতি জুলুম ও অত্যাচার থেকে ফেরাউনকে বিরত রাখার আহ্বান জানানোর জন্য ওই প্রাসাদে যেতে হবে তাঁকে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. তাঁর পক্ষেই অন্যকে সত্যের দিকে আহ্বান জানানো সম্ভব যে তার নিজের সঠিক পথে থাকার নিশ্চয়তা পেয়েছে।
২. কোনো সমাজকে সংশোধন করতে হলে আগে সেই সমাজের সব সংকটের উৎসস্থলে যেতে হবে।
৩. বিপদ দেখে পালিয়ে যাওয়া হচ্ছে মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এই দিক দিয়ে নবী-রাসূলরা ব্যতিক্রমি ছিলেন না।#