মে ১৭, ২০১৭ ১৪:৩২ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৩৩ থেকে ৩৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُونِ (33) وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُونِ (34)

“মূসা বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমি তো সত্যত্যাগী একজনকে হত্যা করেছি, ফলে আমি আশঙ্কা করছি ওরা আমাকে হত্যা করবে।” (২৮:৩৩)

“এবং আমার ভ্রাতা হারুন আমার চেয়ে বাগ্মী, অতএব তাকে আমার সাহায্যকারীরূপে প্রেরণ করো। সে আমাকে সমর্থন করবে। আমি আশঙ্কা করি- ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে (ও আমাকে প্রত্যাখ্যান করবে)।” (২৮:৩৪)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)কে ফেরাউনের দরবারে গিয়ে তাকে ও তার পারিষদবর্গকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে- হযরত মূসা তুর পাহাড়ে তার প্রতি আরোপিত এই দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে দু’টি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। প্রথম সমস্যা হচ্ছে, তিনি বহু বছর আগে বনি-ইসরাইলের এক ব্যক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে মিশরের একজন কিবতি নাগরিককে হত্যা করে ফেলেছিলেন। তখন ফেরাউনের সেনাবাহিনী তাকে আটক করার জন্য তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করেছিল। হযরত মূসা (আ.)’র ভাষায় তাঁর দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে- আমি সুন্দর করে কথা বলতে পারি না বলে এই দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করা আমার জন্য সম্ভব নাও হতে পারে। কাজেই আমার ভাই হারুনকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিন যাতে ফেরাউনের পারিষদবর্গের প্রত্যাখ্যানের জবাবে সে তার অনর্গল বক্তৃতার ক্ষমতা দিয়ে সত্যের সমর্থনে আমাকে সাহায্য করতে পারে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যেকোনো দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিজের দুর্বল দিকগুলোর পাশাপাশি এ কাজের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে হবে। সেইসঙ্গে এসব সমস্যার সম্ভাব্য উপযুক্ত সমাধানগুলিও প্রস্তাব করতে হবে।

২. কাউকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়ার জন্য সুন্দরভাবে বক্তব্য উপস্থাপন জরুরি।

৩. মহান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অন্যের সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে। একাকী সব কাজ করে ফেলতে হবে- এমন কোনো কথা নেই।

সূরা কাসাসের ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا فَلَا يَصِلُونَ إِلَيْكُمَا بِآَيَاتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغَالِبُونَ (35)

“আল্লাহ বললেন- (হে মূসা! ভয় পেয়ো না) আমি তোমার ভ্রাতার দ্বারা তোমার বাহু শক্তিশালী করব এবং তোমাদের উভয়কে প্রাধান্য দান করব। আমার নিদর্শনবলে ওরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তোমরা ও তোমাদের অনুসারীরা ওদের উপর বিজয়ী হবে।” (২৮:৩৫)

মহান আল্লাহ হযরত মূসার আবেদন কবুল করেন। তিনি তাঁর ভাইকে এই বিপদসঙ্কুল কাজে নিজের সঙ্গে নেয়ার অনুমতি দেন। এর ফলে হযরত মূসার পক্ষ থেকে উত্থাপিত দু’টি সমস্যারই সমাধান হয়। প্রথমত, এর ফলে কেউ হযরত মূসার ওপর হামলা চালানোর বা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হওয়ার সাহস পাবে না। দ্বিতীয়ত, হারুনের উপস্থিতিতে তাঁরা দুই ভাই স্পষ্ট যুক্তিসহ আল্লাহর বাণী তুলে ধরার পাশাপাশি খোদায়ী নিদর্শন দেখিয়ে ফেরাউনের পারিষদবর্গকে পরাভূত করতে পারবেন।

হারুন ছিলেন মূসার চেয়ে বয়সে বড় এবং তিনি যেকোনো বক্তব্য সাবলীল ভাষা ও বাচনভঙ্গিতে তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে হযরত মূসা অধিকতর যোগ্য হওয়ার কারণে মহান আল্লাহ তাঁকে রাসূল হিসেবে নির্বাচিত করেন; যিনি ছিলেন কিতাব ও শরীয়তের অধিকারী। হারুনকেও আল্লাহ নবুওয়াত দান করেছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন হযর মূসার সহযোগী মাত্র। ফেরাউনের দরবারে দুই ভাইয়ের একজন তাঁর বাগ্মিতা দিয়ে এবং অন্যজন আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শন দেখিয়ে দরবারের লোকদের পরাভূত করেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে হক ও বাতিলের অনুসারীদের সংখ্যা সমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো মাত্র দুই ব্যক্তি স্পষ্ট ও শক্তিশালী যুক্তি দিয়ে বাতিলের অনুসারী বিশাল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হন।

২. মহান আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ ও হকপন্থিদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া উচিত যাতে জালেমরা তাদের উপর জুলুম করতে না পারে।

৩. মহান আল্লাহর বাণী প্রচার এবং বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে তাঁর প্রেরিত পুরুষদেরও ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা রাখতে এবং আশাবাদী হতে হয়। আল্লাহতায়ালা হযরত মূসা, হারুন ও তাঁদের অনুসারীদেরকে অত্যাচারী সম্রাট ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি ও সুসংবাদ দিয়েছিলেন।

এই সূরার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَى بِآَيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُفْتَرًى وَمَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آَبَائِنَا الْأَوَّلِينَ (36) وَقَالَ مُوسَى رَبِّي أَعْلَمُ بِمَنْ جَاءَ بِالْهُدَى مِنْ عِنْدِهِ وَمَنْ تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ (37)

“মূসা যখন ওদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো আনল, (তখন) ওরা বলল- এই (মুজিযা) তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র! আমাদের পূর্বপুরুষগণের কালে কখনও এইরূপ ঘটতে শুনিনি।” (২৮:৩৬)

“মূসা (ফেরাউনের পারিষদবর্গের প্রত্যাখ্যানের জবাবে) বলল- আমার প্রতিপালক সম্যক অবগত আছেন- কে তাঁর নিকট হতে পথ-নির্দেশ এনেছে এবং কার পরিণাম শুভ হবে। নিঃসন্দেহে অত্যাচারীরা সফলকাম হবে না।” (২৮:৩৭)

আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর হযরত মূসা ও তাঁর ভাই হারুন যেকোনো উপায়ে ফেরাউনের দরবারে পৌঁছে যান। তাঁরা ফেরাউন ও তার দরবারের লোকদের এক আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানানোর পর অলৌকিক নিদর্শনগুলো দেখান। হযরত মূসার হাতের লাঠি বিশাল অজগরে পরিণত হয় এবং তাঁর হাত বগলের নীচ থেকে বের করার পর হাতের তালু দিয়ে উজ্জ্বল রশ্মি বের হতে থাকে।

কিন্তু এসব দেখার পরও রাজ দরবারের লোকেরা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং দুই নবীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে। ফেরাউনের পারিষদবর্গ দাবি করে, তাদের পূর্বপুরুষরা কোনোদিন এক আল্লাহর ইবাদত করেনি বলে হযরত মূসার আহ্বান কবুল করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা বলে, অলৌকিক নিদর্শনগুলিও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসেনি বরং মূসা জাদু দেখিয়েছি মাত্র। যাদুকে সে আল্লাহর নিদর্শন বলে চালিয়ে দেয়ার এবং অতিমানবীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

এই অপবাদের জবাবে হযরত মূসা (আ.) বলেন: আমি যদি নিজে থেকে এসব কথা বলি ও মুজিযাগুলো দেখিয়ে থাকি এবং আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে থাকি; তাহলে বিষয়টি তিনি তোমাদের চেয়ে ভালো জানেন। কাজেই আমি যদি তেমনটি করে থাকতাম তাহলে তিনি আমাকে এমনভাবে বাধা দিতে পারতেন যাতে আমি নিজেকে নবী হিসেবে তুলে ধরতে এবং মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারি।

হযরত মূসা (আ.) আরো বলেন, বিষয়টি এমন নয় যে, আমার নবুওয়াতের পক্ষে যুক্তি কম থাকার কারণে তোমরা আমাকে অস্বীকার করছো বরং তোমরা তোমাদের জুলুম ও পাপের পথে অটল থাকার লক্ষ্যেই এ কাজ করছো। তোমরা ভাবছো অন্যায় ও জুলুম করে তোমরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু তোমাদের এ ধারণা ঠিক নয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা সফলকাম হতে পারবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধর্মীয় বাণী ও শিক্ষা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনা মাপকাঠি হওয়া উচিত; পূর্বপুরুষদের বক্তব্য বা তাদের জীবনধারা নয়।

২. ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় কাফেররা সব সময় নবী-রাসূলদের ঘায়েল করার লক্ষ্যে তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী বলার পাশাপাশি তাদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে।

৩. নবী-রাসূলদের হেদায়েতের বাণী আমল করলে আমাদেরই লাভ। কারণ, এর ফলে আমরাই সফলকাম হবো এবং পরকালে জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবো। #