মে ১৭, ২০১৭ ১৫:০৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৩৮ থেকে ৪২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ (38)

“এবং ফেরাউন বলল- হে পারিষদবর্গ! আমি নিজেকে ছাড়া তোমাদের জন্য অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে জানি না। (তবে আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য) হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং এক সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি কর। হয়তো আমি তাতে উঠে মূসার উপস্যের কোনো খবর পাবো, তবে আমি মনে করি সে মিথ্যাবাদী।” (২৮:৩৮)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, অত্যাচারী শাসক ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গ হযরত মূসা (আ.)’র রেসালাতকে অস্বীকার করে এবং তাঁর দেখানো মুজিযাকে যাদুমন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়। তারা আরো দাবি করে, তাদের পূর্বপুরুষরা মূসার আল্লাহকে চিনত না এবং তার উপাসনাও করেনি।

এই আয়াতে বলা হচ্ছে, হযরত মূসা (আ.)কে প্রতিহত করা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ঠেকিয়ে রাখার জন্য ফেরাউন একটি উঁচু টাওয়ার নির্মাণের নির্দেশ দেয়। ওই টাওয়ারে উঠে সে ও তার পারিষদবর্গ আসমানে হযরত মূসার আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য সে এই নির্দেশ দিয়েছিল। এর মাধ্যমে সে জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল, আমিই হচ্ছি তোমাদের প্রকৃত খোদা; এর বাইরে আর কোনো সৃষ্টিকর্তাকে আমি চিনি না। কিন্তু তোমরা যাতে একথা মনে না করো যে, আমি মূসার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে তার আল্লাহকে মেনে নিচ্ছি না, সেজন্য উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করছি যাতে সেখানে উঠে তোমাদের নেতারাও দেখতে পারে যে, আসমানে কোনো খোদা নেই বরং মূসা মিথ্যা কথা বলছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. গর্ব, অহংকার ও দাম্ভিক মানসিকতার কারণে মানুষ সত্যের বাণী মেনে নিতে পারে না।

২. সত্য অনুসন্ধানের অজুহাতে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়া সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী শাসকদের কাজ।

৩. অত্যাচারী শাসকরা নিজেদেরকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। তারা নিজেদেরকে আসমান-জমিনের মালিক মনে করে এবং অন্য কাউকে পরোয়া করে না। বর্তমান যুগেও পৃথিবীতে বহু ফেরাউনি শাসক রয়েছে যারা নিজেদেরকে সবকিছুর মালিক বলে মনে করে।

সূরা কাসাসের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:  

وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ (39) فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ (40)

“ফেরাউন ও তার বাহিনী অকারণে পৃথিবীতে অহঙ্কার করেছিল এবং ওরা মনে করেছিল যে,ওরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না।” (২৮:৩৯)

“অতএব আমি তাকে ও তার বাহিনীকে ধরে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। সুতরাং দেখো, সীমালঙ্ঘনকারীদের পরিণাম কি হয়ে থাকে।” (২৮:৪০)

এই দুই আয়াতে ফেরাউন ও তার বাহিনীর পরিণতির কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: একদিকে আল্লাহর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ও পরকালকে অস্বীকার করা, অন্যদিকে জনগণের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানোর কারণে মহান আল্লাহ তাদেরকে এই দুনিয়াতেই শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদেরকে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মারেন। যে নদী ছিল তাদের জীবন, সম্পদ ও শক্তির উৎস সেই নদীতেই তারা সবাই ডুবে মারা যায়।

ফেরাউনের শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য এই দুই আয়াতে দু’টি কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এক. দম্ভ, অহংকার এবং নিজেকে সাধারণ মানুষের চেয়ে বড় ভাবা এবং দুই. সমাজের দুর্বল শ্রেণি ও অধীনস্ত ব্যক্তিদের ওপর অত্যাচার করা এবং তাদেরকে প্রকৃতিগত ন্যুনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১. মহান আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করা যাবে না; কারণ তার পরিণতি অনিবার্য ধ্বংস।

২. পরকালের হিসাব-নিকাষের প্রতি বিশ্বাস না করলে মানুষ অহংকারী হয়ে যায়। আর এটি হচ্ছে সব সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী শাসকদের জুলুম ও নির্যাতনের মূল উৎস।

৩. আল্লাহর শাস্তি যে শুধু পরকালে পাওয়া যাবে তা নয় বরং মহান আল্লাহ দাম্ভিক ব্যক্তিদেরকে এই দুনিয়াতেও চরমভাবে অপমানিত করেন।

৪. ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় অত্যাচারী ব্যক্তিরা সব সময় একই পরিণতি ভোগ করেছে।

সূরা কাসাসের ৪১‌ ও ৪২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنْصَرُونَ (41) وَأَتْبَعْنَاهُمْ فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ هُمْ مِنَ الْمَقْبُوحِينَ (42)   

“এবং ওদের আমি নেতা করেছিলাম, ওরা লোকদের জাহান্নামের দিকে আহ্বান করত; কিয়ামতের দিন ওরা সাহায্যকারী পাবে না।” (২৮:৪১)              

“এই পৃথিবীতে আমি ওদের অভিশপ্ত করেছিলাম এবং কিয়মতের দিনও ওরা ঘৃণিত হবে।” (২৮:৪২)

ফেরাউনের পরিণতি বর্ণনা করার পর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন যখন গোনাহগারদের জাহান্নামের দিকে দিয়ে যাওয়া হবে তখন সবার অগ্রভাগে থাকবে ফেরাউন ও তার বাহিনীতারা দুনিয়াতে যেমন গোনাহগার ব্যক্তিদের অগ্রভাগে ছিল কিয়ামতের দিন জাহান্নামে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রগামী থাকবে। তারা নিজেদের যুগে এই পৃথিবীতে ছিল নির্যাতিত ও অধীনস্ত ব্যক্তিদের ঘৃণার পাত্র। এ ছাড়া, কিয়ামত পর্যন্ত যুগে যুগে মুমিন ব্যক্তিরা তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়ে যাবেন। পৃথিবীতে খারাপ ও কুৎসিত পথ বেছে নেয়ার কারণে কিয়ামতের দিন তারা কুৎসিত চেহারা নিয়ে উত্থিত হবে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হলো:

. আজ যারা নিজেদের সম্পদ অথবা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রয়েছে কিয়ামতের দিন তারা অন্য কাউকে তো দূরের কথা নিজেদেরকেই রক্ষা করতে পারবে না।

. অত্যাচারী ব্যক্তিদের অভিশাপ দেয়া এমন একটি কাজ যা করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।

. যারা পার্থিব জীবনে কাফেরদের অনুসরণ করে কিয়ামতের দিন কাফেরদের সঙ্গেই তাদের পুনরুত্থান হবে এবং কাফেরদের সঙ্গেই তাদেরকে জাহান্নামে পাঠানো হবে।

. দুনিয়াতে কুৎসিত কর্ম করলে কিয়ামতের দিন কুৎসিত চেহারা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।#