মে ১৭, ২০১৭ ১৬:০৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৪৩ থেকে ৪৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَلَقَدْ آَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَى بَصَائِرَ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (43)  

“এবং আমি পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর মূসাকে (আসমানি) কিতাব (তাওরাত) দিয়েছিলাম- এ মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা, পথ-নির্দেশ ও দয়াস্বরূপ, যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৩)

আগের আয়াতগুলোতে দাম্ভিক সম্রাট ফেরাউন ও তার বাহিনীর নীল দরিয়ায় ডুবে প্রাণ হারানোর কথা উল্লেখ করার পর আজকের এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলছেন: ফেরাউনের হাত থেকে বনি-ইসরাইল জাতিকে রক্ষা করার পর আমি তাদেরকে হেদায়েত করার পাশাপাশি তাদের চিন্তাশক্তি ও অন্তদৃষ্টি খুলে দেয়ার জন্য মূসার ওপর তাওরাত নাজিল করি। এই আসমানি গ্রন্থ ছিল বনি-ইসরাইল জাতির প্রতি আমার বিশেষ অনুগ্রহ।  অবশ্য যদি তারা তাওরাতকে প্রত্যাখ্যান ও সত্যের বিপরীতে অবস্থান নেয় তাহলে অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর মতো তারাও ধ্বংস হয়ে যাবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পৃথিবীতে নবী-রাসূলদের আগমন ও আসমানি কিতাব নাজিল ছিল মানবজাতির প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। মানুষ যাতে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে পরকালীন মুক্তি লাভ করতে পারে সেজন্য দয়ালু আল্লাহ এ ব্যবস্থা করেছেন।

২. ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় আল্লাহ তায়ালার নিয়ম-কানুন ছিল অপরিবর্তনীয়। যেসব জাতি সত্যের পথ থেকে সরে গেছে সেসব জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।

সূরা কাসাসের ৪৪ ও ৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ (44) وَلَكِنَّا أَنْشَأْنَا قُرُونًا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آَيَاتِنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ (45)

“যখন আমি মূসাকে (রেসালাতের) বিধান দিয়েছিলাম, তখন তুমি (তুর) পর্বতের পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং (এ ঘটনার) প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না।” (২৮:৪৪)

“বস্তুত মূসার পর আমি (বিভিন্ন যুগে) অনেক মানবগোষ্ঠীর আবির্ভব ঘটিয়েছিলাম, অতঃপর ওদের বহু যুগ অতিবাহিত হয়ে গেছে (এবং বহু জাতির ইতিহাসও ধ্বংস হয়ে গেছে)। তুমি তো মাদায়েনবাসীর মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না (এবং ওদের ঘটনাও তোমার জানা ছিল না) যাতে ওদের (অর্থাৎ মক্কাবাসীর) নিকট (মাদায়েনবাসী সম্পর্কে) আমার আয়াত আবৃত্তি করতে পারো। আমিই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী (এবং আমিই তোমাকে রাসূল করেছি এবং মাদায়েনবাসীর ঘটনা ওহির মাধ্যমে তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি)।" (২৮:৪৫)

এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে- পবিত্র কুরআনে অতীত জাতি ও নবী-রাসুলদের সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে শেষ নবীর সত্যতার অন্যতম প্রমাণ। কারণ, বিশ্বনবী (সা.) অতীতের কোনো জাতির মানুষের মধ্যে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও সেসব জাতির ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত মূসা (আ.) এর মৃত্যুর কয়েক শতাব্দি পর শেষ নবীর আগমন ঘটলেও পূর্ববর্তী ওই নবীর নবুওয়াতপ্রাপ্তির ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কুরআনে দেয়া হয়েছে। এই মহাগ্রন্থে মাদায়েন শহরের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, হযরত মূসা মিশর থেকে পালিয়ে মাদায়েনে চলে যান এবং সেখানে আল্লাহর আরেক নবী হযরত শোয়াইবের সঙ্গে পরিচিত হন ও তার মেয়েকে বিয়ে করেন। সেইসঙ্গে মাদায়েনে হযরত মূসার ১০ বছর উপস্থিতি এবং এরপর মিশরে তার ফিরে আসার কাহিনীও কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। একইভাবে হাজার হাজার বছর আগের জাতিগুলোর কাহিনী মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে বিশ্বনবীকে জানানোর পাশাপাশি তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআনে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর যেসব বর্ণনা এসেছে সে সম্পর্কে রাসূলের যুগে মক্কার মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না।

২. পবিত্র কুরআন যে সর্ববৃহৎ মুজিযা তার একটি প্রমাণ হলো এতে বর্ণিত অতীত জাতিগুলোর ইতিহাস। পবিত্র কুরআনের বিশাল অংশ জুড়ে এ ধরনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

সূরা কাসাসের ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَكِنْ رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (46)   

“এবং যখন আমি মূসাকে আহ্বান করেছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতের পাশে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুত এই সংবাদ তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে দয়াস্বরূপ, যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারো, যাদের নিকট তোমার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি। যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৪৬)

এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে মহান আল্লাহ বলছেন: আমি আপনার প্রতি যা কিছু অবতীর্ণ করেছি তা আমার পক্ষ থেকে এক ধরনের দয়া যাতে বনি-ইসরাইল জাতির ইতিহাস জানিয়ে মানুষকে সতর্ক করতে পারেন এবং তারা যাতে তাদের অন্যায় কাজের পরিণতি সম্পর্কে ভয় পায়।

মক্কার কাফিরদের কাছে এর আগে এমন কোনো নবী আসেননি যার কাছ থেকে তারা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ঘটনা জানতে পারে। এমনকি মহানবী (সা.)’র আগমনের দুই/তিনশ’ বছর আগেও কোনো নবী মক্কায় আসেননি। অবশ্য হযরত হুদ, হযরত সালেহ ও হযরত শোয়াইব আলাইহিমুস সালামের মতো নবীরা আরব বদ্বীপ ও এর আশপাশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর কয়েকশ’ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় সেসব নবীর জাতিগুলোর কোনো নিদর্শন আর অবশিষ্ট ছিল না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলদের আবির্ভাব এবং তাদের ওপর আসমানি কিতাব নাযিলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষকে সতর্ক করা যাতে তারা উদাসিনতায় ভুগে আখেরাতকে ভুলে না যায়।

২. মানুষের বিবেক ও বিচারবুদ্ধি তাকে অনেক সময় খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার সঙ্কেত দেয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নানা কারণে মানুষ সেই অভ্যন্তরীণ সঙ্কেতে কান দেয় না। এ কারণে নবী-রাসূলরা বাইরে থেকে মানুষকে সতর্ক করেন যাতে তারা সঠিক পথে ফিরে আসে।#