সূরা আল-কাসাস; আয়াত ৪৭-৫০ (পর্ব-১২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৪৭ থেকে ৫০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৪৭ ও ৪৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَوْلَا أَنْ تُصِيبَهُمْ مُصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آَيَاتِكَ وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (47) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا لَوْلَا أُوتِيَ مِثْلَ مَا أُوتِيَ مُوسَى أَوَلَمْ يَكْفُرُوا بِمَا أُوتِيَ مُوسَى مِنْ قَبْلُ قَالُوا سِحْرَانِ تَظَاهَرَا وَقَالُوا إِنَّا بِكُلٍّ كَافِرُونَ (48)
“এবং রাসূল না পাঠালে ওদের কৃতকর্মের জন্য ওদের কোনো বিপদ হলে ওরা বলত- হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট কোনো রাসূল প্রেরণ করলে না কেন? করলে আমরা তোমার নিদর্শন মেনে চলতাম এবং বিশ্বাসী হতাম।” (২৮:৪৭)
“অতঃপর যখন আমার নিকট হতে ওদের নিকট সত্য এল, ওরা বলতে লাগল, মুসাকে (মুজিযারূপে) যা দেয়া হয়েছিল মুহাম্মদকে সেরূপ দেয়া হলো না কেন? কিন্তু পূর্বে মূসাকে যা দেয়া হয়েছিল তা কি ওরা অস্বীকার করেনি? ওরা বলেছিল: (তাওরাত ও কুরআন) দু’টি যাদুগ্রন্থ যারা পরস্পরের পৃষ্ঠপোষক এবং আরো বলেছিল: আমরা উভয়কে প্রত্যাখ্যান করি।” (২৮:৪৮)
এই দুই আয়াতে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় মহান আল্লাহর একটি অলঙ্ঘনীয় রীতির কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন যা দিয়ে সে ভালো ও মন্দ কাজের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে। সেইসঙ্গে নানা মত, পথ ও সংস্কৃতির মধ্যে কোনটি সঠিক তাও নির্ণয় করা তার পক্ষে সম্ভব। এরপরও আল্লাহ তা’লার রীতি হচ্ছে কোনো জাতির কাছে নবী বা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত ওই জাতির খারাপ কাজের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেন না। কারণ সেক্ষেত্রে পাপী ব্যক্তিরা এই অজুহাত তুলে ধরবে যে, যদি তুমি আমাদের কাছে নবী পাঠাতে তাহলে তার কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করে আমরা সঠিক পথের অনুসরণ করতে পারতাম। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে ঐশী শাস্তির মুখে পড়তে হতো না।
পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: অবশ্য অজুহাত দাঁড় করানো যাদের অভ্যাস তারা এরপরও দমে যাবে না। তারা বলবে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কেন হযরত মূসার মতো ঐশী মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনা দেখায় না? কেন তার হাতের লাঠি সাপে পরিণত হয় না কিংবা সাগরের পানি কেন তার কারণে দুই ভাগ হয়ে যায় না যাতে তার শত্রুরা পানিতে ডুবে মারা যায়?
পবিত্র কুরআন এই ধরনের অজুহাতপন্থিদের উত্তর দিয়েছে এভাবে: হযরত মূসার জীবদ্দশায় তার প্রদর্শিত অলৌকিক ঘটনাগুলো যারা দেখেছিল তাদের সবাই কি তার প্রতি ঈমান এনেছিল? যদি তাদের সবাই ঈমান না এনে থাকে তাহলে তোমরা কিভাবে এই নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, এখন যদি ইসলামের নবী একই কাজ করে তাহলে সবাই ঈমানদার হয়ে যাবে?
বাস্তবতা হচ্ছে, অজুহাতপন্থিরা সকল যুগে ঐশী মুজিযাকে যাদুমন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং আল্লাহকে মেনে নেয়নি। হযরত মূসার বিরোধীরাও তাকে যাদুকর বলেছে এবং বিশ্বনবী (সা.)’র বিরোধীরাও তাকে যাদুকর বলে অভিহিত করেছে। তাদের একদল লাঠির সাপে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে যাদু বলেছে এবং অন্যদল পবিত্র কুরআনের আয়াতকে যাদুর বাণী বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়ে মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেছেন যাতে মানুষ নিজেদের কৃতকর্মের ব্যাপারে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে না পারে।
২. আমাদের বেশিরভাগ সমস্যা ও দুঃখ-দুর্দশার জন্য আমাদের কৃতকর্ম দায়ী। আমাদের অনেক ভালো ও খারাপ কাজের পরিণতি আমরা এই দুনিয়াতেই দেখে যেতে পারি।
৩. যুগে যুগে নবী-রাসূলদের প্রতি কাফেররা যে অপবাদ সবচেয়ে বেশি আরোপ করেছে তা হলো তারা ছিলেন যাদুকর। কাফেররা বলত: তাওরাত ও কুরআন দু’টিই যাদুগ্রন্থ যারা পরস্পরকে সহযোগিতা করছে।
সূরা কাসাসের ৪৯ ও ৫০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ فَأْتُوا بِكِتَابٍ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ هُوَ أَهْدَى مِنْهُمَا أَتَّبِعْهُ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (49) فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنَ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (50)
“(হে রাসূল তুমি ওদের) বলো- তোমরা সত্যবাদী হলে আল্লাহর নিকট হতে এক কেতাব আনয়ন করো; যা পথনির্দেশের দিক দিয়ে এই দুই (কিতাব অর্থাৎ তাওরাত ও কুরআন) হতে উৎকৃষ্টতর হবে, (যদি পারো তাহলে) আমি সেই কিতাব অনুসরণ করবো।” (২৮:৪৯)
“(হে রাসূল) অতঃপর ওরা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবে ওরা কেবল নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। আল্লাহর পথ-নির্দেশ অমান্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে তার অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।” (২৮:৫০)
আগের আয়াতে নবী-রাসূলদের প্রতি কাফেরদের যাদুটোনার অপবাদ আরোপ সম্পর্কে আলোচনা করার পর এই দুই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: আপনি কাফেরদের বলুন, তোমরা যখন তাওরাত ও কুরআনকে যাদুগ্রন্থ বলছো তখন এমন একটি ঐশী গ্রন্থ এনে দেখাও যা এগুলোর চেয়েও উত্তমভাবে হেদায়েতের পথ দেখায়। যদি তা পারো তাহলে আমিও এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমি সেই গ্রন্থের অনুসরণ করবো। অন্য কথায় বিশ্বনবী বলছেন: আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলাই আমার মূল লক্ষ্য। যদি তাঁর কাছ থেকে তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হয়ে থাকে তাহলে আমি তা মেনে নিয়ে এর আনুগত্য করব।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ওরা যেমন আল্লাহ তা’লার কাছ থেকে কোনো কিতাব আনতে পারেনি তেমনি পবিত্র কুরআনের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ এই সৃষ্টিজগতে নেই। কাফেররা নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করতো এবং আসমানি গ্রন্থ ও নবী-রাসূলদের আহ্বান তাদের খেয়াল-খুশির বিপরীত বলে তা প্রত্যাখ্যান করতো। প্রকৃতপক্ষে খেয়াল-খুশির অনুসরণ মানুষকে সত্য গ্রহণে বিরত রাখে এবং তাকে পাপের পথে পরিচালিত করে। পাপকাজ করতে করতে তারা এতটা ধৃষ্ঠ হয়ে ওঠে যে, নবী-রাসূলদেরকে বিপথগামী বলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
এই দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১. মানুষকে সত্যের অনুসারী হতে হবে। এমনকি শত্রুরাও যদি সত্য ও যৌক্তিক বক্তব্য তুলে ধরে তাহলে তা গ্রহণ করতে হবে।
২. মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই হেদায়েত লাভ করা সম্ভব। অন্যদিকে মানুষের সীমিত জ্ঞান ও খাম-খেয়ালীর অনুসরণ মানুষকে বিপথগামী করে দেয়।#