মে ১৮, ২০১৭ ১৩:৩৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৫১ থেকে ৫৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫১ ও ৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَلَقَدْ وَصَّلْنَا لَهُمُ الْقَوْلَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (51) الَّذِينَ آَتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِهِ هُمْ بِهِ يُؤْمِنُونَ (52)

“আমি তো ওদের নিকট বার বার আমার (কুরআনের) বাণী পৌঁছে দিয়েছি,যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।” (২৮:৫১)

“এর পূর্বে আমি যাদের কিতাব দিয়েছিলাম,তারা এর প্রতি ঈমান এনেছিল।” (২৮:৫২)

এই দুই আয়াতের প্রথমে আল্লাহর বাণীর প্রতি মক্কার মুশকিরদের অনীহা ও একগুঁয়েমি মনোভাবের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: আমি ধীরে ধীরে নিয়মিত কুরআনের আয়াত নাজিল করেছি যাতে এসব আয়াত মুশরিকদের অন্তরে দাগ কাটে এবং তাদেরকে প্রভাবিত করে। কিন্তু তারপরও ওরা উপদেশ গ্রহণ করেনি এবং ঈমান আনেনি। অথচ আহলে কিতাবদের একাংশ যারা পূর্ববর্তী নবী ও তাঁর প্রতি নাজিল হওয়া কিতাবে বিশ্বাস করত তারা সর্বশেষ নবীর সত্যের আহ্বান শুনেই তাঁর প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

উদাহরণস্বরূপ হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, হাব্‌শ বা বর্তমান ইথিওপিয়ার তৎকালীন বাদশার নির্দেশে দেশটির কয়েকজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক ইসলাম সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য মক্কা সফরে আসেন। তারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)র অমীয় বাণী শুনেই তাঁর প্রতি ঈমান আনেন। পরবর্তীতে তারা ইসলাম ধর্ম প্রচারকে পরিণত হন।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

. দাওয়াতি কাজ করতে হবে পর্যায়ক্রমে এবং তা হতে হবে সুন্দরভাবে উপস্থাপন ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে। জোর করে চাপিয়ে দিতে গেলে ফল উল্টো হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

. সব নবী-রাসূল এক আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছেন এবং তাদের দাওয়াতের বাণীও ছিল অভিন্ন।

. সত্যিকারের আহলে কিতাব হলেন তারা যারা ইসলামের নবীর আবির্ভাবের পর পূর্বপুরুষদের ধর্মে অটল না থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

সূরা কাসাসের ৫৩ ও ৫৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ قَالُوا آَمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ (53) أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (54)

“যখন ওদের নিকট (কুরআনের আয়াত) আবৃত্তি করা হয় তখন ওরা বলে-আমরা এর প্রতি ঈমান আনলাম। এই (বক্তব্য) আমাদের সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে অকাট্য বাণী। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পণকারী ছিলাম।” (২৮:৫৩)

“ওদের দু’বার পুরস্কৃত করা হবে, কারণ ওরা (সত্যের পথে অটল ও) ধৈর্যশীল এবং ওরা ভালোর দ্বারা মন্দের মোকাবিলা করে ও আমি ওদের যে জীবিকা দিয়েছি, তা হতে দান করে।” (২৮:৫৪)

আগের দুই আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি ঈমান এনেছেন তারা আত্মসমর্পনকারী অন্তরের অধিকারী এবং সত্যের প্রতি অনুগত। তাদের সামনে যখন রাসূলুল্লাহ কুরআনের আয়াত পাঠ করেন তখন তারা বলেন, এসব আয়াত যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এর আগে আমাদের পূর্ববর্তী নবীর বাণীর প্রতিও ঈমান এনেছিলাম। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে, ঠিক এ কারণে তারা দু’বার পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে। একবার পূর্ববর্তী নবী ও তার কিতাবের প্রতি ঈমান আনার কারণে এবং আরেকবার ইসলামের নবী ও তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবে বিশ্বাস করার জন্য। এরপর মহান আল্লাহ পবিত্র অন্তরের অধিকারী এই ঈমানদারদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন: তারা মন্দের প্রত্যুত্তর দেন ভালো কথা ও কাজের মাধ্যমে। খারাপ কথার জবাব দেন উত্তম বক্তব্যের মাধ্যমে, অন্যায় আচরণের জবাব দেন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে এবং রুঢ় ব্যবহারের প্রত্তুত্তরে দয়ালু ও সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ করেন। তারা সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণির খোঁজখবর রাখেন এবং তাদেরকে সাধ্যমতো দান-খয়রাত করেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

১. সত্যপ্রেমিকরা সত্যের অনুসন্ধান করেন। কোন দেশের, কোন বর্ণের মানুষ কোন ভাষায় সত্যের দাওয়াত দিচ্ছেন সেটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; বরং দাওয়াতটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই যার পক্ষ থেকেই এই দাওয়াত আসুক না কেন তা কবুল করতে হবে।

২. সত্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা আসবে। মুমিনকে এক্ষেত্রে চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে।

৩. অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখাতে হবে। আর যারা আমাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করছে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা আরো উত্তম।

সূরা কাসাসের ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ (55)

“ওরা যখন অসার-বাক্য শ্রবন করে তখন ওরা তা পরিহার করে চলে,এবং (কটু কথার বক্তাদের) বলে- আমাদের কাজের জন্য আমরা দায়ী এবং তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী,তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।” (২৮:৫৫)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে খারাপ ভাষায় আক্রমণকারীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়ে বলা হচ্ছে: প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি খারাপ কথা ও আচরণের জবাব একই পদ্ধতিতে দেন না। তারা কখনো অসার-বাক্যের প্রত্তুত্তরে মুখ থেকে খারাপ বাক্য উচ্চারণ করেন না। বরং আক্রমণকারী ব্যক্তির সঙ্গে সদাচারণ করেন এবং সহানুভুতির সঙ্গে বলেন:  যদি তোমার দৃষ্টিতে আমার কথা ও আচরণ ভুল হয়ে থাকে তাহলে তার পরিণতি তো আমাদেরকেই ভোগ করতে হবে, তোমাদেরকে নয়। তোমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কাজেই তোমরা তোমাদের পথ দেখো এবং আমরা আমাদের পথে চলি। আমরা অজ্ঞতাপূর্ণ কাজে লিপ্ত হবো না। তোমরা আমাদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করতে পারো কিন্তু তার জবাবে আমরা তোমাদের সঙ্গে একই আচরণ করব না।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অনর্থক, অসার ও অপছন্দনীয় বাক্যালাপ পরিহার হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমানের পূর্বশর্ত। আমরা স্বাভাবিক অবস্থায় তো এ ধরনের কথা মুখে উচ্চারণ করবোই না সেইসঙ্গে কারো পক্ষ থেকে অপমানকর আচরণের জবাবেও কটুকথা বলব না। কারণ, প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি সব সময় অসার বাক্য পরিহার করে চলে।

২. কথাবার্তা বলা এবং মানুষের সঙ্গে ওঠাবসার ক্ষেত্রে কটুকথা পরিহার করে চলার বিষয়টিকে সব ঐশী ধর্মে পছন্দনীয় কাজ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

৩. আমরা যখন বুঝতে পারবো কাউকে খারাপ কথা ও কাজ থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না তখন তার সঙ্গে এমন আচরণ করতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে তার কথা ও কাজকে আমরা সমর্থন করছি না।#