মে ২১, ২০১৭ ১৫:১৬ Asia/Dhaka
  • আদর্শ জীবনযাপন: সম্পর্ক স্থাপনে শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা

পরিচয় পর্বে শব্দ ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলছিলাম আমরা। গত আসরেও সালামের মাধ্যমে সম্পর্কের সূত্রপাত করা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, মনে রাখতে হবে যে কেবলমাত্র সালাম দেওয়া বা সালামের জবাব দেওয়ার মাঝেই যোগাযোগের বিষয়টি বা সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি সীমিত রাখলে চলবে না।

দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুন্দর, শ্রদ্ধাপূর্ণ, আন্তরিক ভাব ও ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে কথাবার্তা বলতে হবে।

মুসলমানরা যদি শুধুমাত্র এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবে তার যথাযথ প্রয়োগ করে তাহলে ইসলামি সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের অবস্থাটা একটা অন্যরকম উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং পরিচয় ও সম্পর্ক স্থাপন পর্বে শব্দ প্রয়োগে সতর্ক হওয়া জরুরি।

কেবল শব্দই নয়, কথা বলার ভঙ্গিও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুন্দর ভাষাভঙ্গি এবং সহৃদয় কথাবার্তা যার সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকে প্রশান্ত, নির্ভরযোগ্য এবং আশ্বস্ত করে তুলবে। এই অনুভূতিটা একজন শ্রোতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়। পবিত্র কুরআন শব্দ, বাক্য ইত্যাদিকে পবিত্র এবং অপবিত্র-এই দুই ভাগে ভাগ করেছে। পবিত্র বা সদালাপকে তুলনা করা হয়েছে এমন একটি গাছের সঙ্গে যে গাছের শেকড় বেশ গভীরে প্রোথিত এবং যে গাছের শাখা প্রশাখা ব্যাপক বিস্তৃত ও ছায়াময়। সেই গাছের ফল থেকে সবাই উপকৃত হয়। আর অপবিত্র কথাকে বলা হয়েছে এমন এক বৃক্ষকে যে বৃক্ষ মাটি থেকে মূলোৎপাটিত হয়ে গেছে এবং যে বৃক্ষের কোনো ফল নেই।

পবিত্র আর অপবিত্র কথাকে কুরআনে যে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে সে প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা ইব্রাহিমের ২৪ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: তুমি কি দেখছো না আল্লাহ কালেমা তাইয়েবার উপমা দিয়েছেন কোন্‌ জিনিসের সাহায্যে? এর উপমা হচ্ছে এমন একটি ভালো জাতের গাছ, যার শেকড় মাটির গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে পৌঁছে গেছে। প্রতি মুহূর্তে নিজের পালনকর্তার অনুমতিক্রমে সে ফল দেয়। এরকম উপমা আল্লাহ মানুষের উদ্দেশ্যে এ জন্য দেন যাতে তারা এর সাহায্যে শিক্ষা লাভ করতে পারে। অন্যদিকে অসৎ বাক্যের উপমা হচ্ছে এমন একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার কোন স্থায়িত্ব নেই।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নোংরা শব্দ বা বাক্য ব্যবহার কিংবা অসংলগ্ন শব্দের ব্যবহার করাটা বক্তার অসুস্থ ও রুচিহীন ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। এ ধরনের শব্দ ব্যবহার ইচ্ছাকৃতভাবে কো হয়ে থাকতে পারে অথবা নাজানার কিংবা শব্দভাণ্ডারের অসমৃদ্ধির কারণে করা হয়ে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় শব্দ ও বাক্যের প্রয়োগে কথা বলার মাধ্যমে বক্তার সুরুচিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। এরকম সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তি সহজেই সমাজে তার মর্যাদা ও উচ্চ অবস্থান নিশ্চিত করে ফেলতে পারে। শব্দ ব্যবহার এবং ভাষাভঙ্গির সৌন্দর্যহীনতা বক্তাকে সাময়িকভাবে পরিচিত করে তুললেও তার সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা দৃঢ় বা স্থায়ী হয় না। অল্প সময়ের মধ্যেই তার ওপর শ্রোতারা অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এ ধরনের বক্তা সমাজে বিচ্ছিন্ন ও নি:সঙ্গ হয়ে পড়ে।

কুরুচিপূর্ণ শব্দ ও ভাষা প্রয়োগকারী বক্তার নি:সঙ্গ হয়ে ওঠা সম্পর্কে বলছিলাম। পবিত্র কুরআনের সূরা ত্ব-হা’র ৪৪ নম্বর আয়াতে সুন্দর ও নম্র ভাষায় কথা বলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহৃদয় ভাষা ও বাচনভঙ্গির সাহায্যে যে কথা বলা হয় তার প্রভাব অনেকটা হৃদয় নিংড়ানো সঙগীতের মতোই। এ কারণেই হযরত মূসা (আ)কে আল্লাহ যখন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে অহংকারী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ শাসক ফেরাউনকে তৌহিদের দাওয়াত দিতে যেতে আদেশ দিলেন,তখন মূসাকে বলেছিলেন যেন ভদ্র, নম্র ও মিষ্টি মধুর ভাষা ব্যবহার করে ফেরাউনের সঙ্গে আলাপকালে। কোনোভাবেই যেন কড়া বা উগ্র ভাষা ও শব্দ ব্যবহার না করে। বলা হয়েছে: তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।

মূসা (আ) আল্লাহর নির্দেশনা পেয়ে বিনয়ী কণ্ঠে সুন্দর ভাষাভঙ্গি ও শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ায় ফেরাউন উগ্র আচরণ না করে বরং যথাযথভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এমনকি মূসা (আ) এর খোদার ব্যাপারে প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।

কুরআনে কারিমের দৃষ্টিতে যথাযথ ও সুস্থ সম্পর্ক হলো সেটাই যা পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মূলত সম্পর্কটা খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। একটি অশোভন বাক্য এমন একটি অপরিহার্য সংকট তৈরি করে ফেলতে পারে যে হতে পারে সেই ক্ষতি আর কিছুতেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। সম্পর্কে একবার ফাটল সৃষ্টি হয়ে গেলে তা আর পুনর্নির্মাণ করাও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এদিক থেকে কুরআন মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং সঠিক ভাষাভঙ্গি ও আচরণের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর শব্দ ও কথাগুলোই যেন উপস্থাপন করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

“আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, তারা যেন মুখে এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম৷ আসলে শয়তান মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে৷ প্রকৃতপক্ষে শয়তান হচ্ছে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু”।

যোগাযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়বেন তাকে যথাযোগ্য সম্মান ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করা। অসম্মানজনক কোনো আচরণ শ্রোতার মনোজগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। আপনার কথা তখন আর তার কানের ভেতর দিয়ে মনের জগতে পৌঁছবে না, একটা অসম্মানের দেয়াল তৈরি হয়ে যাবে মাঝখানে। সুতরাং আপনার কোনো কথাই আর শ্রোতা গ্রহণ করবে না যদিও আপনার কথা যথার্থ হয়ে থাকে কিংবা সঠিক হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআন মুমিনদের উদ্দেশে বলেছে তারা যেন অশোভন কথাবার্তা কিংবা অসুন্দর শব্দ ব্যবহার করা থেকে সবসময় বিরত থাকে।

অসুন্দর শব্দ ব্যবহার করা থেকে সবসময় বিরত থাকার ব্যাপারে মুমিনদের প্রতি কুরআনের নির্দেশ সম্পর্কে বলছিলাম। সূরা আনআমের এক শ আট নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আর-হে ঈমানদারগণ!- কাফের এবং মুশরিকরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের পূজা করে,ডাকে এবং সম্মান করে,তোমরা তাদেরকে গালি দিয়ো না! কেননা, তারাও শিরক থেকে খানিকটা অগ্রসর হয়ে অজ্ঞতা কিংবা শত্রুতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে”।

সুন্দর কথা বলা এবং আস্তে আস্তে কথা বলাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি ও রীতি। যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর কথাবার্তার মাধ্যমে শুরু আলোচনা করা। এমনভাবে কথা বলতে হবে যেন শ্রোতা পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গে কথাগুলো শোনে এবং বুঝতে পারে যে বক্তা পরিপূর্ণ সহৃদয় ও সহানুভূতি সহকারে এবং আন্তরিকতার সাথেই কথা বলছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বৈশিষ্ট্যটি যেন মুসলমানরা অর্জন করে এবং চর্চা করে সে ব্যাপারে পবিত্র কুরআন তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সেইসঙ্গে যেসব লোক চীৎকার চেঁচামেচি করে উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলে তাদেরকে গাধার আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:  লোকমান তার নিজের ছেলেকে বললো: হে আমার আমার সন্তান! (পথচলার সময় মধ্যমপন্থী বা ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে, আস্তে আস্তে কথা বলবে কেননা বিশ্রিতম শব্দ হলো গাধার”। পবিত্র কুরআন সুরা আহজাবে বলেছে: “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক ও দৃঢ় কথা বলো”। দৃঢ় কথা বলতে বোঝানো হয়েছে বাতিল এবং অন্যায়ের জোয়ারের সামনে সুদৃঢ় বাঁধের মতো কথা বলা যাতে মিথ্যার আস্ফালন থেমে গিয়ে সত্যের জয় হয়।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড: সাইয়্যেদ মাহদি মিরশেফা মনে করেন কথা বলা ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হলো ভালো শ্রোতা হওয়া এবং বক্তার প্রতি মনোযোগী হওয়া। এটা নিজেই একটা শিল্প। তিনি বলেন: “প্রতিপক্ষের প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগী হওয়া এবং দৃষ্টি দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত মনের কথাগুলোকে সবচেয়ে সুন্দর ও শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করা। মোটকথা কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের উচিত সত্যবাদী হওয়া, সহজ সরল ও প্রাঞ্জল হওয়া এবং আন্তরিক থাকা। কথা জটিল করা একেবারেই বর্জন করতে হবে। কথা বলার সময় শ্রোতার চোখের দিকে তাকাতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে কথা শুনে শ্রোতা কি বিরক্ত হচ্ছে নাকি মজা পাচ্ছে। অনেক সময় কথা বলার মাঝে নীরব থাকারও প্রয়োজন পড়ে। নীরবতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। নীরবতার মধ্যে মনের অনেক বিষয় স্থানান্তরিত হয়”।

মৌখিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো পরিচ্ছন্ন ভাষার ব্যবহার। পবিত্র কুরআনের সূরা নিসা’র পাঁচ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে: “এবং তাদের সঙ্গে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ভাষায় কথা বলো”!

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/২১