সূরা আল-কাসাস; আয়াত ৫৬-৫৮ (পর্ব-১৪)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৫৫ থেকে ৫৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ (56)
“নিঃসন্দেহে তুমি যাকেই ইচ্ছা করবে তাকে সৎপথে আনতে পারবে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভালো জানেন কারা সৎপথের অনুসারী।” (২৭:৫৬)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, বিশ্বনবী (সা.)’র আহ্বান শুনে মক্কার বেশিরভাগ মুশরিক মূর্তিপূজা বাদ দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে আহলে কিতাবের অনুসারী কিছু খ্রিস্টান পবিত্র কুরআনের আয়াত শুনেই ইসলামের নবীর প্রতি ঈমান এনেছেন। তারা একথাও ঘোষণা করেছেন, ইনি হচ্ছেন আল্লাহর সেই নবী যার সুসংবাদ দিয়ে গেছেন হযরত ঈসা মাসিহ (আ.)।
সে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে আল্লাহর একটি চিরাচরিত বিধানের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: যুগে যুগে সব নবী-রাসূলের দায়িত্ব ছিল মানুষের কাছে আল্লাহতায়ালার বাণী পৌঁছে দেয়া এবং তাদেরকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। কিন্তু মানুষের পক্ষ থেকে এ বাণী গ্রহণ বা বর্জনের কারণে নবী-রাসূলদের জবাবদিহী করতে হবে না। যদি একজন মানুষও সত্যের বাণী গ্রহণ না করে তাহলে সেজন্যও নবী-রাসূলদের দায়ী করা হবে না।
মানুষকে ঈমানের পথে আনার জন্য জোরজবরদস্তি করতেও আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কারণ, জোর করে মুখে হয়তো ঈমান আনানো যাবে কিন্তু অন্তরে তারা মুশরিক থেকে যাবে। তবে মানুষের অন্তরের খবর একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। যার অন্তর সত্য গ্রহণের উপযুক্ত মহান আল্লাহ তাকে ঈমান আনার তৌফিক দান করেন। এ কারণে দেখা যায়, বিশ্বনবীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের অনেকে তাঁর প্রতি ঈমান আনেনি; আবার আহলে কিতাবের অনেক সদস্য তাদের ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ইসলামের নবীর প্রতি ঈমান এনেছেন। সূরা ইউনুসের ৪৩ নম্বর আয়াতেও মহান আল্লাহ বলেন: (হে নবী) আপনি কি সেই অন্ধদেরকে সৎপথ দেখাতে পারবেন যারা (অন্তরের চক্ষু দিয়ে) দেখতে পায় না?
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নবী-রাসূলদের দায়িত্ব আল্লাহর দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দেয়া; মানুষকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা নয়। মানুষের পক্ষ থেকে সে বাণী গ্রহণ বা বর্জনে নবী-রাসূলদের কোনো হাত নেই।
২. মহান আল্লাহ নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে যাকে উপযুক্ত মনে করেন তাকেই সৎপথ প্রদর্শন করেন।
সূরা কাসাসের ৫৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالُوا إِنْ نَتَّبِعِ الْهُدَى مَعَكَ نُتَخَطَّفْ مِنْ أَرْضِنَا أَوَلَمْ نُمَكِّنْ لَهُمْ حَرَمًا آَمِنًا يُجْبَى إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِزْقًا مِنْ لَدُنَّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ (57)
“(মক্কার মুশরিকরা বিশ্বনবীকে) বলে, আমরা যদি তোমার পথ ধরি, তবে নিজেদের দেশ হতে উৎখাত হবো। আমি কি ওদের জন্য এক নিরাপদ ‘হারাম’ (বা পবিত্র স্থান) প্রতিষ্ঠিত করিনি, যেখানে সর্বপ্রকার ফলমূল আমদানি হয় আমার দেওয়া জীবিকাস্বরূপ? কিন্তু ওদের অধিকাংশই তা জানে না।” (২৮:৫৭)
এই আয়াতে সেইসব মক্কাবাসীর কথা বলা হয়েছে যারা কুরআন এবং বিশ্বনবীর সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থহানি ঘটবে বলে সত্য গ্রহণ ও তা প্রকাশ করা থেকে বিরত ছিল। তাদের অজুহাত ছিল এই যে, মক্কার মুশরিক অধিপতিরা- যাদের হাতে সব ধন-সম্পদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে- তারা ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে আমাদেরকে বাস্তুহারায় পরিণত করবে। আমরা ওই অসহায় অবস্থায় পড়তে রাজি নই।
পবিত্র কুরআনে তাদের এই বক্তব্যের জের ধরে ঘোষণা করা হয়, আল্লাহর ক্ষমতা বেশি নাকি কুরাইশ অধিপতিদের বেশি? যে আল্লাহ তোমাদেরকে এত নেয়ামত দান করেছেন এবং মক্কা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন তার পক্ষে কি মুশরিকদের হাত থেকে তোমাদের বাঁচানো সম্ভব নয়?
শুরুর দিকে মুসলমানরা মুশরিকদের হাতে নির্যাতিত হলেও ধীরে ধীরে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক সময় মুসলমানরা মক্কা বিজয় করেন এবং এ শহরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পৃথিবীতে বহু মানুষ আছে যাদের কাছে সত্য সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ইন্দ্রিয়সুখ লাভের লক্ষ্যে তা গ্রহণ করে না।
২. যেকোনো বিষয়ের চেয়ে মানুষের নিরাপত্তার গুরুত্ব বেশি। সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার ছায়াতলেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। কারণ, নিরাপত্তা না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব নয়।
সূরা কাসাসের ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِنْ بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِيلًا وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ (58)
“কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা নিজেদের ভোগ-সম্পদে মদমত্ত ছিল! এগুলোই তো ওদের ঘরবাড়ি; ওদের পর এগুলোতে সামান্যই লোকজন বসবাস করেছে। চূড়ান্ত মালিকানা একমাত্র আমারই।” (২৮:৫৮)
এই আয়াতে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তোমরা নিজেদের আরাম-আয়েশ ও সম্পদ ধরে রাখার স্বার্থে ঈমান আনতে রাজি হওনি। কিন্তু তোমরা কি অতীতের জাতিগুলোর ইতিহাস ভুলে গেছো যারা ভোগবিলাসে মত্ত থাকার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে? যদি ধরেও নেই তোমরা ওই ধরনের ভোগবিলাসের উপকরণ সংগ্রহ করতে পারলে, তারপরও অতীত জাতিগুলোর মতো যে ধ্বংস হবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
মক্কা থেকে শাম বা বর্তমান সিরিয়ায় যাওয়ার পথে আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যেত। মক্কার মুশরিকরা শামে যাতায়াতের পথে এই ধ্বংসাবশেষ দেখার পরও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. অনেক সময় সম্পদ ও ভোগবিলাসের উপকরণ মানুষের জন্য সুখ বয়ে আনার পরিবর্তে তাদের ধ্বংসের কারণ হয়।
২. অতীত জাতিগুলোর ধ্বংসাবশেষ বর্তমান সময়ের মানুষের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। এ কারণে এ ধরনের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করা উচিত।
৩. এই পৃথিবীর জীবন অতি সংক্ষিপ্ত ও ধ্বংসশীল। কাজেই সম্পদশালী ব্যক্তিদের বাহ্যিক আরাম-আয়েশ দেখে ভুল বুঝলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, ওদেরকেও একদিন তাদের এই সম্পদ ফেলে চলে যেতে হবে।#