সূরা আল-কাসাস; আয়াত ৫৯-৬৩ (পর্ব-১৫)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৫৯ থেকে ৬৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
مَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى حَتَّى يَبْعَثَ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُو عَلَيْهِمْ آَيَاتِنَا وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَى إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ (59)
“তোমার প্রতিপালক, জনপদসমূহের কেন্দ্রে তার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য রাসূল প্রেরণ না করে এগুলোকে ধ্বংস করেন না এবং তিনি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করেন- যখন এর অধিবাসীরা সীমালঙ্ঘন করে।” (২৮:৫৯)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, যারা নিজেদের তুচ্ছ স্বার্থে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে অস্বীকার করে তাদেরকে আল্লাহ বলেন: তোমরা নিজেদের চোখে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেখেছো। তারা পার্থিব জীবনের মোহে অন্ধ ছিল এবং জুলুম করেছিল বলে তাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি।
এরপর এ আয়াতে আল্লাহর একটি চিরাচরিত বিধানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ কোনো জাতির কাছে নিজের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য নবী-রাসূল না পাঠিয়ে ওই জাতিকে ধ্বংস করেন না। আল্লাহ তায়ালা তখনই কোনো জাতিকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন যখন ওই জাতির কাছে সত্যের বাণী পৌঁছানোর পর তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। যখন মানুষ নবীকে দেখার এবং ঐশী বাণী শোনার পর আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে তখন এই দুনিয়াতেই তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন না করে অর্থাৎ তাদের কাছে সত্যের বাণী না পাঠিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেন না।
২. নবী-রাসূলদের প্রত্যাখ্যান এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা অনেক বড় জুলুম। মহান আল্লাহ এ ধরনের অপরাধের শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন।
সূরা কাসাসের ৬০ ও ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا أُوتِيتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَى أَفَلَا تَعْقِلُونَ (60) أَفَمَنْ وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَنْ مَتَّعْنَاهُ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْضَرِينَ (61)
“তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও অলঙ্কার এবং যা আল্লাহর নিকট আছে তা উত্তম এবং স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” (২৮:৬০)
“যাকে আমি উত্তম পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, যা সে পাবে- সে কি ওই ব্যক্তির মতো যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগ-সম্পদ দিয়েছি যাকে পরে কিয়ামতের দিন উপস্থিত করা হবে অপরাধীরূপে?” (২৮:৬১)
এই দুই আয়াতও সেইসব মানুষের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছে যারা পার্থিব জীবনের স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জানায়। এখানে বলা হচ্ছে: আল্লাহর কাছে যা আছে তার সঙ্গে তোমাদের পার্থিব জীবনের ভোগ্যবস্তুকে কি তোমরা এক করে দেখছো? কেনো তোমরা আল্লাহর কাছে যা আছে তা পাওয়ার জন্য ক্ষণস্থায়ী জীবনের ভোগ্যবস্তুকে বিসর্জন দিতে পারো না? দুনিয়ার ভোগ-বিলাস কি তোমাদেরকে এতটা অন্ধ করে রেখেছে যে, তোমরা আধ্যাত্মিক জীবনের সৌন্দর্য এবং চিরস্থায়ী আবাসস্থলের কথা চিন্তা করার এবং তা পাওয়ার জন্য এই ভোগ-বিলাসকে উপেক্ষা করতে পারো না?
৬০ নম্বর আয়াতের শেষাংশে পরোক্ষভাবে পার্থিব জীবন নিয়ে পড়ে থাকার বিষয়টিকে নির্বুদ্ধিতা হিসেবে উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়েছে: “তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” এই প্রশ্নের মাধ্যমে একটি সহজ সরল তুলনা সবার চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, চিরস্থায়ী ভোগ্যবস্তু প্রত্যাখ্যান করে ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাস নিয়ে পড়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
পরের আয়াতে এ ধরনের স্থুলদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারা পার্থিব জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করছে। এ ধরনের মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম পুরস্কার গ্রহণ করবে। কিন্তু যারা পার্থিব জগতের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেছে কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ইহলৌকিক ও পারলৌকিক দু’টি জীবনের নেয়ামতই আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। তবে আমরা যেন ক্ষণস্থায়ী জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে পরকালের নেয়ামত হাতছাড়া না করি। কারণ, সেটা হবে আমাদের জন্য মহা ক্ষতি।
২. পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনকে পাওয়ার জন্য পার্থিব জীবনের অন্যায় জীবনোপকরণ ত্যাগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়লে পরকালে অপরাধী হিসেবে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে।
৩. মানুষকে সৎপথে আনার জন্য ধর্মের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন একটি কার্যকর পন্থা। এর ফলে মানুষের অন্তর জাগ্রত হয় এবং এর প্রভাব অনেক বেশি।
সূরা কাসাসের ৬২ ও ৬৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ (62) قَالَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ رَبَّنَا هَؤُلَاءِ الَّذِينَ أَغْوَيْنَا أَغْوَيْنَاهُمْ كَمَا غَوَيْنَا تَبَرَّأْنَا إِلَيْكَ مَا كَانُوا إِيَّانَا يَعْبُدُونَ (63)
“এবং সেইদিন ওদের আহ্বান করে বলা হবে-তোমরা যাদেরকে আমার শরিক করতে, তারা কোথায়?” (২৮:৬২)
“যাদের জন্য শাস্তি অবধারিত হয়েছে, তারা বলবে- হে আমার প্রতিপালক! এদেরই আমরা বিভ্রান্ত করেছিলাম; এদের বিভ্রান্ত করেছিলাম- যেমন আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। আপনার নিকট আমাদের নিবেদন এই যে, এদের জন্য আমরা দায়ী নই, (প্রকৃতপক্ষে) এরা কেবল আমাদেরই উপাসনা করত না (বরং নিজেদের কামনা-বাসনা দ্বারা পরিচালিত হতো)।” (২৮:৬৩)
কিয়ামতের দিন মুশরিকদের অবস্থা বর্ণনা করে এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: সেদিন তারা সঙ্গীহীন ও নিঃস্ব অবস্থায় আল্লাহর সামনে হাজির হলে তিনি তাদের বলবেন: তোমরা দুনিয়ার বিভিন্ন কাজে যাদেরকে আমার সঙ্গে শরিক করতে তারা আজ কোথায়? এ অবস্থায় মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের পূজা করতো তাদেরকে হাজির করা হবে এবং তারা বলবে: ওরা আজ দাবি করছে যে, আমরা ওদের মাবুদ ছিলাম এবং ওরা আমাদের উপাসনা করতো। কিন্তু বাস্তবতা তেমনটি নয়। ওরা নিজেদেরই কামনা-বাসনার পূজা করতো এবং এসব বাসনা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে আমাদের কাছে এসে আমাদেরই মতো বিপথগামী হয়েছে। কাজেই আমরা তাদের মাবুদ ছিলাম না এবং তাদের প্রতি আমাদের কোনো সহানুভূতি নেই।
কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর আদালতের এই দৃশ্যের সঙ্গে পৃথিবীর আদালতের মিল রয়েছে। দুনিয়ার আদালতে কয়েকজন অপরাধীকে একত্রে হাজির করা হলে তাদের প্রত্যেকে নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ করতে চায়। তারা দাবি করে, দলের অন্য সদস্যরা তাদেরকে বিপথগামী করেছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের দাবি করে আল্লাহর দরবারে পার পাওয়া যাবে না বরং পাপী ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি পেতেই হবে।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি বা বস্তু কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর সমকক্ষ হতে পারে না। যারা এ ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা করে তারা চরম ভুলের মধ্যে রয়েছে।
২. মহান আল্লাহর পরিবর্তে যারা অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে কিয়ামতের দিন তাদেরকে চরম শাস্তি পেতে হবে।
৩. বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা অন্য মানুষকেও ভ্রান্ত পথে নিয়ে যেতে চায়।
৪. কিয়ামতের দিন বিভ্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের উপাস্যরা পরস্পরকে দোষারোপ করবে। কিন্তু এই বিবাদ তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।#