সূরা আল-কাসাস; আয়াত ৬৪-৬৯ (পর্ব-১৬)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৬৪ থেকে ৬৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৬৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقِيلَ ادْعُوا شُرَكَاءَكُمْ فَدَعَوْهُمْ فَلَمْ يَسْتَجِيبُوا لَهُمْ وَرَأَوُا الْعَذَابَ لَوْ أَنَّهُمْ كَانُوا يَهْتَدُونَ (64)
“এবং ওদের বলা হবে- তোমাদের দেবতাগুলোকে (অর্থাৎ যাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করতে, তাদেরকে) আহ্বান করো, ওরা তখন ওদের ডাকবে, কিন্তু ওরা এদের ডাকে সাড়া দেবে না; ওরা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। (এবং আকাঙ্ক্ষা করবে) হায়! এরা যদি সৎপথ অনুসরণ করতো!” (২৮:৬৪)
আগের পর্বে বলা হয়েছে, কাফের ও মুশরিকরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের উপাসনা করেছে কিয়ামতের দিন সেসব উপাস্য মুশরিকদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করবে এবং তাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাবে। এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা কিয়ামতের দিন যখন তাদের উপাস্যদের অক্ষমতা দেখতে পাবে তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করতে তাদেরকে ডাকো। তারা আজ এসে তোমাদেরকে আজাব থেকে মুক্তি দিক। কিন্তু সেদিন তারা ডাকচিৎকার করেও কোনো উত্তর বা সাহায্য কিছুই পাবে না। এ অবস্থায় তারা অনুতপ্ত হয়ে বলবে, আফসোস যদি আমরা সৎপথ অনুসরণ করতাম তাহলে আজ অসহায় অবস্থায় জাহান্নামে যেতে হতো না।
এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আমরা যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো আনুগত্য করি তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
২. কিয়ামতের দিন পথভ্রষ্ট ও পাপী ব্যক্তিরা শুধু আফসোস ও অনুতাপ করবে। কিন্তু সেদিন এই অনুতাপ কোনো কাজে আসবে না।
সূরা কাসাসের ৬৫, ৬৬ ও ৬৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ (65) فَعَمِيَتْ عَلَيْهِمُ الْأَنْبَاءُ يَوْمَئِذٍ فَهُمْ لَا يَتَسَاءَلُونَ (66) فَأَمَّا مَنْ تَابَ وَآَمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَى أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ (67)
“এবং সেইদিন আল্লাহ এদের ডেকে বলবে- তোমরা রাসূলকে কি জবাব দিয়েছিলে?”(২৮:৬৫)
“সেদিন তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলার থাকবে না এবং এরা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না।”(২৮:৬৬)
“তবে যে ব্যক্তি তওবা করে এবং ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আশা করা যায় সে সফলকাম হবে।” (২৮:৬৭)
কিয়ামতের দিন মুশরিকদের কাছে প্রশ্ন করা হবে: নবী-রাসূলদের পক্ষ থেকে আল্লাহর দাওয়াতের বাণী শুনে তোমরা কি করেছিলে? নবী-রাসূলগণ যখন তোমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত ও সৎকাজ করার আহ্বান জানিয়েছিল তখন আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের তোমরা কি জবাব দিয়েছিলে?
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের কোনো জবাব মুশরিকরা দিতে পারবে না। যদি তারা বলে আমরা নবী-রাসূলদের দাওয়াত গ্রহণ করে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলাম তাহলে এটি হবে ডাহা মিথ্যা এবং কেয়ামতের দিন মিথ্যা কথা বলে কেউ পার পাবে না। আর যদি তারা বলে যে, আমরা নবী-রাসূলদের প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে পাগল বলে অভিহিত করেছিলাম এবং তাদের বিরুদ্ধাচরণ ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম তাহলে নিজেদের মুখে অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা যে জবাবই দিক না কেন তাতেই তারা ফেঁসে যাবে।
আল্লাহর এ প্রশ্ন থেকে তারা বাঁচতে পারবে না এবং কোনো ধরনের অজুহাত আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাদের আরেকটি অসুবিধা হবে এই যে, তারা এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য পরস্পরের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে পারবে না। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: আজ কিয়ামতের দিনে যারা এত অসহায় ও অনন্যোপায় হয়ে পড়েছে দুনিয়ার জীবনে তারা এতটা অসহায় ছিল না। কিয়ামতের দিন সম্মানজনক অবস্থা সৃষ্টি করার সব সুযোগ তাদেরকে দুনিয়াতে দিয়েছিলাম। তারা জীবদ্দশায় যেকোনো মুহূর্তে তওবা করে রাসূলের প্রতি ঈমান আনতে এবং সৎকাজ করতে পারতো। এবং তা করলে আজ তাদেরকে জাহান্নামের কঠিন আজাবে পড়তে হতো না এবং উন্নত মস্তকে জান্নাতে যেতে পারত।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে কোনো বান্দা আল্লাহর প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য অন্য কারো সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ পাবে না।
২. ইসলামে কাফের, মুশরিকসহ বড় ধরনের অপরাধীর জন্যও তওবা করার পথ সব সময় খোলা থাকে। চরম অপরাধে মগ্ন থাকা অবস্থায়ও তওবা করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। তবে শর্ত হচ্ছে, পাপের পথে আর যাওয়া যাবে না এবং এটি করতে হবে মৃত্যুর আগে।
৩. গোহার কাজ ত্যাগ করে সৎকাজ করার মধ্যেই মানুষের সফলতা নিহীত রয়েছে।
সূরা কাসাসের ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ (68) وَرَبُّكَ يَعْلَمُ مَا تُكِنُّ صُدُورُهُمْ وَمَا يُعْلِنُونَ (69)
“এবং তোমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন, এতে ওদের কোনো হাত নেই। আল্লাহ পবিত্র মহান এবং ওরা যাকে শরিক করে তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।” (২৮:৬৮)
“এবং এদের অন্তর যা গোপন করে এবং এরা যা ব্যক্ত করে তোমার প্রতিপালক তা জানেন।” (২৮:৫৯)
যেসব মুশরিক সৃষ্টিজগত পরিচালনার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যদের শরীক করতো তাদের উদ্দেশ করে এখানে বলা হচ্ছে: কাকে কীভাবে সৃষ্টি করবেন সে সিদ্ধান্ত নেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। একইসঙ্গে কে নবী হবেন এবং সৃষ্টিজগত পরিচালনার জন্য কী ধরনের নিয়মকানুন প্রবর্তন করবেন তাও তিনি নির্ধারণ করেন। কেউ তাকে কাজ করতে বাধ্য করতে বা তার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষকে যেকোনো কাজ করার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে; তবে আল্লাহর ক্ষমতার সামনে সে অসহায়। আল্লাহ যদি মানুষকে কোনো কাজ করার বা কোনো কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন তাহলে তা তাকে পালন করতেই হবে। সূরা আহযাবের ৩৬ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে: যখন আল্লাহ ও তার রাসূল কোনো নির্দেশ দেন তখন তার বিপরীত করার অধিকার মুমিন নারী ও পুরুষের নেই।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. বিশ্বজগত সৃষ্টি ও পরিচালনা এবং নবী-রাসূলদের মনোনীত করার বিষয়টি একমাত্র মহান আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করেন।
২. যারা আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব রচিত আইন মেনে নেয়, তারা প্রকারান্তরে সৃষ্টিজগত পরিচালনায় মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে।#