মে ২৩, ২০১৭ ১৩:৫৭ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৭৬ থেকে ৭৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৭৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآَتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ (76)

“নিশ্চয়ই ‘কারুন’ মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল, কিন্তু সে তাদের প্রতি জুলুম করেছিল। আমি তাকে এতটা ধন-ভাণ্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলো বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। (স্মরণ করুন তখনকার কথা) যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল- দম্ভ করো না, আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালোবাসেন না।” (২৮:৭৬)

এই সূরার প্রথম দিকের কিছু আয়াতে হযরত মূসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এই আয়াতে হযরত মূসার নাম আসলেও এখানে কারুনের পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। কারুন ছিল হযরত মূসার যুগের একজন সম্পদশালী লোক। ইতিহাসে এসেছে, প্রথমদিকে কারুন হযরত মূসা (আ.)’র প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাঁর অন্যতম সাহাবী ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নিজের ধন-সম্পদের অহংকারে গর্বিত হয়ে পড়ে। তার অবস্থা এতটা খারাপ হয়ে যায় যে, আল্লাহর নবীর বিরোধিতাকারীতে পরিণত হয়।

ফেরাউন ক্ষমতার জোরে জনগণের ওপর জুলুম ও নির্যাতন করে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। অন্যদিকে কারুনের বিদ্রোহের উৎস ছিল তার বিপুল ধন-সম্পদ। সে মানুষের সামনে এই সম্পদের বড়াই করত এবং সাধারণ মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত।

আয়াতের পরবর্তী অংশে কারুনের খোদাদ্রোহিতার জন্য অহংকার, উদাসিনতা ও বড়াইকে দায়ী করে বলা হচ্ছে: তার সম্পদ যতই বেড়ে যাচ্ছিল ততই সে আল্লাহ ও তার বান্দাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তার সারাক্ষণের ধ্যান-জ্ঞান ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যসহ এ ধরনের মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করে তার পাহাড় গড়ে তোলা। অথচ আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে- সম্পদ খরচ করতে হবে জনগণের কল্যাণে এবং সমাজের অর্থনৈতিক চাকা সচল করার কাজে অর্থ ব্যবহার করতে হবে। কিছু মানুষ রাষ্ট্রের সব সম্পদ কূক্ষিগত করে তা শুধুমাত্র নিজের কাজে ব্যয় করবে- এটা আল্লাহর আইনের বিরোধী।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সম্পদ থাকা এবং তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করায় দোষ নেই। কিন্তু এই সম্পদের অহংকারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করা এবং সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে যাওয়া অত্যন্ত গর্হিত ও অপছন্দনীয় কাজ।

২. মানুষ শুধু মদ খেলেই মাতাল হয় না। কখনো কখনো সংকীর্ণমনা মানুষের হাতে ধন-সম্পদ পড়লে সে এতটা মাতাল ও অহংকারী হয়ে পড়ে যে, সে অন্য সব কিছু ভুলে যায়। এ ধরনের মানুষ নিজের সম্পদ ও ক্ষমতার ওপর ভর করে অন্য মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে এবং এ ধরনের অন্যায় কাজ করে আনন্দ পায়।

সূরা কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَابْتَغِ فِيمَا آَتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآَخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ (77)

“এবং আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তার দ্বারা পরলোকের কল্যাণ অনুসন্ধান করো। ইহলোকে তোমার বৈধ সম্ভোগকে উপেক্ষা করো না। আল্লাহ তোমার প্রতি যেমন সদাশয় হয়েছেন তুমি তেমনি (মানুষের প্রতি) সদাশয় হও এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়ো না; কারণ নিঃসন্দেহে আল্লাহ অশান্তি সৃষ্টিকারীকে ভালোবাসেন না।” (২৮:৭৭)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত মূসার অনুসারী কিছু বিজ্ঞ ও বাস্তবদর্শী ব্যক্তি বিশাল সম্পদশালী কারুনের সামনে হীনমন্যতায় না ভুগে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাকে উপদেশ দিয়েছিল এই বলে যে, তুমি নিজের সম্পদের প্রতি এতটা অহংকারী হয়ে পড়ো না, কারণ তাহলে তুমি আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে। এ ছাড়া, সাধারণ মানুষকে অহংকারী সম্পদশালী ব্যক্তিদের পছন্দ করে না।

এই আয়াতেও ওইসব মুমিন ব্যক্তির দৃষ্টিতে চারটি উপদেশবাণী তুলে ধরা হয়েছে যার প্রধান উপদেশটি হচ্ছে- দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের শষ্যক্ষেত্র। এখানে যদি কোনো বীজ বপন না করো তাহলে আখেরাতে সে ফসল ঘরে তুলতে পারবে না। বিশাল সম্পদের ভাণ্ডারও বীজের সমতুল্য যা এমনভাবে রোপন করতে হবে যাতে কিয়ামতের দিন তার ফসল ঘরে তোলা যায়। কিন্তু এই সম্পদ নিজের গোলায় জমা করে রাখলে তা দিয়ে কোনো শস্যদানা বের হবে না।

দ্বিতীয় উপদেশবাণী হচ্ছে, আখেরাতের সম্পদ সঞ্চয় করার অর্থ এই নয় যে, দুনিয়ার জীবনকে ভুলে গিয়ে সব সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করতে হবে; বরং এই সম্পদ থেকে অবশ্যই নিজের ও পরিবারের সুখ-সাচ্ছন্দের জন্য খরচ করতে হবে। দুনিয়া ও আখেরাত দু’টি বিষয়কেই মাথায় রাখতে হবে এবং প্রতিটির মর্যাদা অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ  উপায়ে সম্পদ ব্যয় করতে হবে।

তৃতীয় উপদেশবাণী হচ্ছে,  তোমার কাছে যে সম্পদ আছে মনো করো না যে, এগুলো তোমার। বরং এই সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার প্রতি অনুগ্রহ। নিজেকে এই সম্পদের মালিক মনে না করে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে মনে করতে হবে তাহলে দেখবে এখান থেকে সাধারণ মানুষের জন্য খরচ করা সহজ হয়ে যাবে।

কারুনের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তিদের চতুর্থ উপদেশ হচ্ছে-আমাদের উপদেশ শুনে যদি তুমি নিজেকে সংশোধন না করো তাহলে এই সম্পদই তোমার ও সমাজের ধ্বংসের কারণ হবে। সমাজের কল্যাণে তোমার সম্পদ ব্যবহার না হয়ে সমাজ ধ্বংসের কাজে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে যার ফলে মানুষের মনে তোমার সম্পর্কে ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানেও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় দেখা যায় কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সিংহভাগ সম্পদ কূক্ষিগত হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ মানুষ ক্রীতদাসের মতো পরিশ্রম করছে এবং এই পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলছে সেই পুঁজিপতিরাই।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সব ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতার লক্ষ্য হওয়া উচিত পরকালে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।  কিন্তু দুনিয়ার জীবনের বৈধ কাজে সম্পদ খরচ করতে নিষেধ করা হয়নি।

২.  পরকালীন পরিণতির কথা সব সময় মাথায় রাখতে এবং পরকালীন শান্তির জন্য আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করতে হবে।

সূরা কাসাসের ৭৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِنْدِي أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِنْ قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا وَلَا يُسْأَلُ عَنْ ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ (78)

“সে (অর্থাৎ কারুন) বলল- নিঃসন্দেহে এই সম্পদ আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি। সে কি জানত না আল্লাহ তার পূর্বে বহু মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছেন, যারা তার অপেক্ষা শক্তিতে প্রবল ছিল, সম্পদে ছিল প্রাচুর্যশীল?  এবং (আজাব নাজিল করার সময়) অপরাধীদের ওদের অপরাধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে না।” (২৮:৭৮)

যারা কারুনকে উপদেশ দিতে এসেছিল তাদের উপদেশ প্রত্যাখ্যান করে সে বলল-আমি নিজের জ্ঞান ও চেষ্টার ফলে এই সম্পদ অর্জন করেছি। কাজেই এই সম্পদকে কি করবো সে সিদ্ধান্তও আমি একাই নেবো, তোমাদের সে সম্পর্কে কথা বলার কোনো অধিকার নেই। আমি জানি, আমি কোথায় খরচ করবো এবং কোথায় সঞ্চয় করবো। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে যোগ্য মনে করেই আমাকে এতসব ধন-সম্পদ দান করেছেন।

পবিত্র কুরআন এই অহংকারী ধনী ব্যক্তির যুক্তিহীন বক্তব্যের জবাবে বলছে- সে কি ইতিহাস পড়ে দেখেনি- তার আগেও তার চেয়ে সম্পদ ও ক্ষমতাধর যেসব মানুষ জুলুম করেছিল তাদেরকে আমি এই দুনিয়াতেই সম্পদসহ ধ্বংস করে দিয়েছি?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জ্ঞান ও প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে সম্পদ অর্জন করলেও আমরা যেন অহংকারী হয়ে না যাই; বরং এই সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে মনে করতে হবে।

২. সম্পদের অহংকারে দম্ভ করলে তার পরিণতি এই দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়।#