মে ২৩, ২০১৭ ১৫:৪৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৭৯ থেকে ৮২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৭৯ ও ৮০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

   فَخَرَجَ عَلَى قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ (79) وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِمَنْ آَمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ (80)

“(একদিন) কারুন তার সব অলঙ্কার নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের সামনে হাজির হয়েছিল। যারা পার্থব জীবন কামনা করত তার বলল- আহা কারুনকে যা দেয়া হয়েছে, আমাদের যদি তা দেয়া হতো, প্রকৃতই তিনি মহাভাগ্যবান।” (২৮:৭৯)

“(কিন্তু) যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছিল তারা বলল- ধিক তোমাদের! যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই শ্রেষ্ঠ এবং ধৈর্যশীল ব্যতীত তা কেউ পাবে না।” (২৮:৮০)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, কারুন ছিল হযরত মূসা (আ.)’র একজন অনুসারী। কিন্তু ধীরে ধীরে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার পর সে অহংকারী হয়ে যায়, আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করে এবং বেঈমানে পরিণত হয়। আজকের এ আয়াতে কারুনের একটি জঘন্য কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা আজকের সমাজেও ভুরি ভুরি করতে দেখা যায়। আজও মানুষ বিভিন্ন উপায়ে নিজের সম্পদকে সবার সামনে জাহির করার পাশাপাশি অন্য লোকদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। কেউ বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে নিজের সম্পদ জাহির করে। কেউবা দামী গাড়ি কিনে রাস্তায় বের হয়ে মানুষকে দেখানোর চেষ্টা করে। আবার অনেকে নানা উপলক্ষে ব্যয়বহুল পার্টির আয়োজন করে নিজের সম্পদ জাহির করে। এ ধরনের পার্টিতে বেশিরভাগ সময় সম্পদ ও খাদ্যের অপচয় হয়।

আত্মম্ভরী ও স্বার্থপর সম্পদশালী লোকেরা সাধারণত এ ধরনের কাজ বেশি করে থাকে। এগুলো দেখে সাধারণ মানুষ কখনো কখনো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এবং দরিদ্র হওয়ার কারণে নিজেদের ভর্ৎসনা করে। তারা ভাবে, আল্লাহ যাদেরকে এত বেশি সম্পদ দান করেছেন তারা কতই না সৌভাগ্যবান! কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা প্রকৃত অর্থেই উপলব্ধি করেন যে, শুধুমাত্র ধন-সম্পদ কারো জন্য সুখ বয়ে আনে না এবং ধনী ব্যক্তিরা প্রকৃত সৌভাগ্যবান নয়। বহু সম্পদশালী ব্যক্তি তীব্র মনোকষ্টে রয়েছেন অথবা পারিবারিক সংকটে আছেন। সম্পদ তাদের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনার পরিবর্তে দুর্ভাগ্য ও কষ্ট বয়ে এনেছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শুধুমাত্র ধন-সম্পদ থাকা খারাপ কিছু নয়। কিন্তু  অনর্থক সে সম্পদ মানুষের সামনে জাহির করা, আত্মম্ভরী হওয়া এবং সাধারণ মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

২. যদি সমাজের শাসক শ্রেণি বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং কারুনের মতো মানসিকতার অধিকারী হয় তাহলে সমাজে তার কুপ্রভাব পড়ে এবং সব মানুষ সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। পরিণতিতে গোটা সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়ে।

৩. নির্বোধ লোকেরাই দুনিয়াপূজারি হয় এবং ধন-সম্পদ আহরণের লালসা পোষণ করে। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা এ ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় না।

৪. ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য মহান আল্লাহ যে জান্নাতের ব্যবস্থা রেখেছেন তার তুলনায় পৃথিবীর সমস্ত সম্পদও মূল্যহীন। এ কারণে জ্ঞানী ব্যক্তিরা মানুষকে পার্থিব সম্পদের মোহে না ছুটে পারলৌকিক সুখের সন্ধান করার আহ্বান জানান।

সূরা কাসাসের ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِنْ فِئَةٍ يَنْصُرُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِينَ (81) وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَوْلَا أَنْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ (82)

“অতঃপর আমি কারুন ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোনো দল ছিল না যে, আল্লাহর শাস্তির বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে পারে এবং সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে সক্ষম ছিল না।” (২৮:৮১)

“আগের দিন যারা তার মতো (অর্থাৎ কারুনের মতো) হওয়ার বাসনা করেছিল, তারা (আজ) সকালে বলতে লাগল- হায়! আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার ইচ্ছা জীবিকা বর্ধিত করেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা হ্রাস করেন। যদি আল্লাহ আমাদের প্রতি সদয় না হতেন, তাহলে তিনি আমাদেরও ভূগর্ভস্থ করতেন। দেখো, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা সফলকাম হয় না।” (২৮:৮২)

সম্পদ প্রদর্শন করে মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা এবং আখেরাতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আল্লাহর রাসূলের অবাধ্য হওয়ার কারণে কারুন এতটা নীচে নেমে গিয়েছিল যে, মহান আল্লাহ এক রাতে ভয়াবহ ভূমিকম্প দিয়ে প্রাসাদ, বাগানবাড়ি ও সমস্ত সম্পদসহ কারুনকে মাটির নীচে বিলীন করে দেন। এমনভাবে কারুন তার ঐশ্বর্যসহ এমনভাবে ধ্বংস হয়ে যায় যে, পরদিন সকালে পাড়া-প্রতিবেশীরা কারুনের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পায় না।

আল্লাহ তায়ালা অবশ্য পবিত্র কুরআনে অতীতের অনেক জাতিকে ভূমিকম্প দিয়ে ধ্বংস করে দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এখানে গোটা জাতি নয় বরং শুধুমাত্র কারুন ও তার প্রাসাদ ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। এতে তার আশপাশের মানুষের কোনো ক্ষতি হয়নি। এটি ছিল মহান আল্লাহর অন্যতম মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শন। সাধারণ মানুষ আল্লাহর এ মুজিযা দেখে উদাসিনতার ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, তারা অনর্থক কারুনের মতো সম্পদশালী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিল। কারণ, প্রত্যেকের রিজিক মহান আল্লাহর হাতে। তিনি নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে যাকে ইচ্ছা সম্পদ দান করেন এবং যাকে যতটা সম্পদ দান করেন কিয়ামতের দিন তার কাছ থেকে তত বেশি হিসাব নেবেন।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরোধিতা করা এবং দম্ভ মানুষের জন্য অসম্মান ও ধ্বংস ডেকে আনে।

২. পাহাড় পরিমাণ সম্পদও মানুষকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে না।

৩. যেকোনো কিছু দেখার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। যারা কারুনের জাঁকজমক দেখে তার মতো সম্পদশালী হওয়ার বাসনা পোষণ করেছিল তাকে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে তারাই বলল- ভালো হয়েছে যে, আমরা কারুনের মতো ধনী হইনি।

৪. অন্যের সম্পদ দেখে তার মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা না করে আমাদের উচিত আল্লাহ আমাদেরকে যতটুকু দিয়েছেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। মনে রাখতে হবে, হয়তো এই দুনিয়াতে মনের সব বাসনা পূর্ণ হওয়া আমাদের জন্য কল্যাণকর নয় বলেই আল্লাহ সেগুলো পূরণ করেননি। #