আদর্শ জীবনযাপন: কিছুটা সময় প্রযুক্তির ভুবন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন
প্রযুক্তি মানুষের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ বয়ে এনেছে কোনো সন্দেহ নেই। আধুনিক মানুষ এখন প্রযুক্তি ছাড়া চলতে পারে না বলে অত্যুক্তি হবে না। সেইসঙ্গে একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রযুক্তির কারণে মানুষের জীবন মেশিনের মতো হয়ে গেছে, যান্ত্রিক হয়ে গেছে সব কিছু। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে বহুরকমের সুবিধার পাশাপাশি এর প্রতি মানুষের সংশ্লিষ্টতা, আকর্ষণ ভয়াবহ রকমের বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভয়াবহ বলার কারণ হলো এই সুবিধাটা সবসময় যে কল্যাণ বয়ে আনছে তা কিন্তু নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপদও ডেকে আনছে। মোবাইল কিংবা কম্পিউটার প্রযুক্তির কথাই ধরা যাক। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে বিস্ময়কর এই প্রযুক্তি দুটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গি হয়ে পড়েছে।
এই দুটি মাধ্যম আমাদের সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখছে, আমাদের আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বটাকে হাতের মুঠোয় এনে দিচ্ছে। এতোসব ইতিবাচক দিক থাকার পরও এগুলো কিন্তু আমাদের জন্য বিপদও নিয়ে আসছে। মোবাইল এবং কম্পিউটার মানসিক অস্থিরতা, বিভিন্ন রকমের মনোরোগ, শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি আত্মিক জগতেরও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধ প্রয়োগে এইসব রোগের চিকিৎসা হয়ে উঠছে না। সুতরাং ওষুধ সেবনের পরও মানুষ এখন মানসিক প্রশান্তির জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। মানুষের মাঝে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিচিত্র মানসিক চাপ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এখন মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকাটাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করে। কিন্তু মানসিক চাপ থেকে কি খুব সহজেই মুক্ত থাকা যায়!
মানসিক চাপ এবং তা থেকে মুক্ত থাকার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলছিলাম। কুরআনে কারিমে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি অর্জনের ব্যাপারে চমৎকার দিক নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে: আল্লাহর প্রতি ইমান এবং এবং তাঁকে স্মরণ করা অর্থাৎ আল্লাহর জিকির করা মানসিক চাপ থেকে মুক্তির অন্যতম একটা উপায়। এ সম্পর্কে অবশ্য আমরা ইতোপূর্বে খানিকটা আলোকপাত করেছি। এর পাশাপাশি আরও বলা হয়েছে প্রকৃতি রাজ্যে ভ্রমণ করার মাধ্যমে এবং প্রকৃতি থেকে প্রাণময় নির্যাস নিয়ে নিজের ভেতরে সুখ ও আনন্দানুভূতি জাগিয়ে তুলে মনটাকে সতেজ ও তরতাজা করে তোলা জরুরি। প্রকৃতি রাজ্যে ভ্রমণ এবং তার থেকে তরতাজা অনুভূতি নেয়ার বিষয়টি জীবন যাপনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।
কিছুটা সময় প্রযুক্তির ভুবন থেকে নিজেকে একটু মুক্ত রাখুন। চলে যান প্রকৃতির কোলে। প্রকৃতি আপনাকে সন্তানের মতো মায়ায় জড়িয়ে নেবে। পার্ক, সমুদ্র সৈকত, বন বনানি, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে পারেন। সেখানে গিয়ে হাঁটুন, খেলাধুলা করুন, বুক ভরে নি:শ্বাস নিন। দেখবেন আপনার ভেতরে যেসব টেনশান, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল সেসবের ফলে সৃষ্ট উত্তেজনা ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে যাচ্ছে। আপনিও চেষ্টা করুন সেসব ভুলে যেতে। প্রকৃতি আপনাকে সকল প্রকার মানসিক চাপ পরিহার করে অনাবিল প্রশান্তিতে মন ভরিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতা করবে।
আমরা মানসিক অস্থিরতা ও অশান্তি দূর করার ক্ষেত্রে প্রকৃতির অবদান নিয়ে কথা বলছিলাম। পবিত্র কুরআনের সূরা হাজের ছেচল্লিশ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা এমন হৃদয়ের অধিকারী হতো যে হৃদয় চিন্তা করতে জানে, ভাবতে জানে, উপলব্ধি করতে জানে...”
তার মানে প্রকৃতি একটি মানুষের অন্তরকে জ্ঞান প্রজ্ঞা, আনন্দ ও সুখানুভূতির অফুরান শক্তি দিয়ে প্রাণবন্ত ও সতেজ করে তোলে। প্রকৃতি এই শক্তিটুকু মানুষের ভেতরে ইঞ্জেকশানের মতো প্রবেশ করিয়ে দেয়। যদিও আমরা আপাতদৃষ্টিতে তা দেখতে পাই না,তবে অনুভব করতে পারি অনেক সময়। প্রকৃতি তাই আমাদের সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য দূর দূরান্তে, বনাঞ্চলে, সমুদ্র সৈকতে কিংবা পর্বতে যাওয়ার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ভাবছেন অথবা মনে করছেন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, তারা ভুল ভাবছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আপনার ঘরের পাশের পার্কটিই যথেষ্ট। বাড়ির আঙিনার ফুল গাছে ফুটে থাকা ফুলের দিকে তাকান,দেখুন নিঁখুতভাবে। দেখবেন আপনার মনের ভেতর একটা ইতিবাচক অনুভূতি কাজ করছে। ফলটাকে ছুঁতে ইচ্ছে করছে, ঘ্রাণ নিতে মন চাচ্ছে, ঘরে নিয়ে টবে সাজিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছে। এটা প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার ফল। সুতরাং প্রকৃতিকে নিত্য সঙ্গ দিয়ে নিজেকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বিরাট পরিকল্পনার প্রয়োজন পড়ে না।
মার্কিন বিশিষ্ট কজন ব্যবহার বিজ্ঞানীর গবেষণায় দেখা গেছে ফুল কেনা, ফুলের দিকে তাকানো, ফুলের চাষ করা মানে গাছ লাগানো,পরিচর্যা করা, ইতিবাচক চিন্তা চেতনা ও অনুভূতি বৃদ্ধি করে। মনকে প্রফুল্ল করে তোলে, দুশ্চিন্তা ও বিষাদগ্রস্ততা থেকে মুক্তি দেয়। পরিবার পরিজন নিয়ে বন্ধু বান্ধব স্বজনদের নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে সুন্দর সুন্দর ফুলের দিকে দৃষ্টি মেলে ধরলে, সবুজ বৃক্ষের দিকে তাকালে এমনিতেই মন মানসিকতা, চিন্তা চেতনার ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই ইতিবাচকতার প্রভাব পড়ে ব্যক্তির আচরণের ওপরও। বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী ফ্রুম কিন বলেছেন, প্রকৃতি সুশোভিত দৃশ্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রকৃতির সাথে যাদের নিবীড় সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে শহরের অধিবাসীদের তুলনায় তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা অনেক ভালো। বিশেষ করে শারীরিক অসুস্থতা অনেক কম।
শুধু তাই নয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে মানুষের আচার ব্যবহারেও অদ্ভুতরকম পরিবর্তন আসে। পরিবর্তনটার পুরোটাই ইতিবাচক। বদ মেজাজ, উগ্রতা ইত্যাদির মাঝে এক ধরনের ভারসমতা আসে। যার প্রভাব পড়ে চিন্তারাজ্যেও। ওই যে বলছিলাম শারীরিক অসুস্থতাও কমে যায়, সেটাও প্রকৃতির ইতিবাচক একটি অবদান। যেমন: উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাকের মতো অপ্রত্যাশিত অবস্থা কমে যায়। তার মানে প্রকৃতি আমাদের ভেতরে মানসিক চাপসহ বিচিত্র দুরবস্থা প্রতিরোধের শক্তি জাগায় এবং দেহের স্বাভাবিক প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধি করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে এমনকি প্রকৃতির কোনো দৃষ্টিনন্দন ছবির দিকে তাকালেও মানসিক চাপ কমে যায় এবং শরীরের বায়ো-কেমিক্যাল এবং ইলেক্ট্রিক শক্তির ভারসাম্য নিশ্চিত হয়।
কয়েক শতাব্দি আগে প্রকৃতির আনন্দদায়ক প্রভাবও যে পড়ে মানুষের অন্তরে-সে ধরনের কথা ধর্মীয় শিক্ষায়ও লক্ষ্য করা গেছে। ইমাম সাদেক (আ) বলেছেন: রঙ বেরঙের ফুলের দিকে তাকাও! সবুজ গাছ গাছালি আর সুন্দর সুন্দর কুঁড়ির দিকে তাকাও! দ্যাখো কী রকম এক প্রশান্তির আমেজ বয়ে যায় মনের গহীনে। ওই প্রশান্তিকে অন্য কিছুর সাথে তুলনা করা যাবে না। ইমাম আলি (আ) ও বলেছেন: বছরে কমপক্ষে একটিবার হলেও নার্গিস ফুলের ঘ্রাণ নেবে। কেননা মানুষের মনের ভেতর এমন একটি বিরূপ অবস্থা আছে যা নার্গিস ফুলই পারে দূর করে দিতে। পবিত্র কুরআনে প্রকৃতির বহুবিধ শিক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করে মানব জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে: তারা যেন জমিনে ভ্রমণ করে, প্রকৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, আল্লাহর নিয়ামত ও দয়ার প্রতি সুদৃষ্টি দেয় এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সেগুলোকে কাজে লাগায়।
কুরআনে কারিমে বলা হয়েছে: “অতএব আল্লাহর অনুগ্রহের দিকে তাকাও! মৃত পতিত ভূমিকে তিনি কীভাবে জীবিত করেন”। কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃতি যেমন উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে তেমনি মানুষের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও তার ব্যাপক ভূমিকা ও প্রভাব রয়েছে। ইসলামে পবিত্র ও প্রবহমান পানির প্রতি এবং তার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রতি অনুপ্রাণিত করার কথা বলা হয়েছে। এর কারণ হলো মানুষের মন ও আত্মার ওপর তার ইতিবাচক ও আনন্দদায়ক প্রভাব। কুরআনে কারিমের বেশ কিছু আয়াতে উদ্ভিদরাজিকে আনন্দ ও প্রশান্তিদায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ভিদরাজিন আনন্দ ও প্রশান্তিদায়ক ভূমিকার কথা বলছিলাম আমরা। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“ভূপৃষ্ঠকে আমি বিছিয়ে দিয়েছি, তাতে সুদৃঢ় ও বিশাল পাহাড় স্থাপন করেছি এবং তার মধ্যে সব রকম সুদৃশ্য উদ্ভিদরাজি উৎপন্ন করেছি। এসব জিনিসের সবগুলোই দৃষ্টি উন্মুক্তকারী এবং শিক্ষাদানকারী ঐ সব বান্দার জন্য যারা সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করে”।
সূরা নামলের ৬০ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছে: ( আচ্ছা! তোমরা যেসব মূর্তির পূজা করো সেসব উত্তম ) নাকি যিনি আকাশ সমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জন্য আকশ থেকে পানি বর্ষণ করছেন তারপর তার সাহায্যে সদৃশ্য বাগান উৎপাদন করেছেন যার গাছপালাও উৎপন্ন করা তোমাদের আয়াত্বধীন ছিল না?
গবেষণায় দেখা গেছে সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশে কাজ করলে আত্মবিশ্বাস, প্রশান্তির পাশাপাশি সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পায়। সুতরাং প্রযুক্তি শাসিত যান্ত্রিক জীবনের যত বেশি অগ্রগতি হবে তত বেশি প্রকৃতির প্রয়োজন পড়বে। কারণ বিচিত্র দূষণের মধ্যেও মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এই প্রকৃতি সরবরাহ করে। তাই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা পোষণ করাই আমাদের উচিত।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৩