জুন ১০, ২০১৭ ১৪:৪০ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ২০ থেকে ২২ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ إِذَا أَنْتُمْ بَشَرٌ تَنْتَشِرُونَ (20)

"তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন (হচ্ছে); তিনি তোমাদের (প্রাণহীন) মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তোমরা মানুষ(রূপে) (পৃথিবীর) সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ।" (৩০:২০)

আগের পর্বে জীবিত প্রাণীকে মৃতে এবং মৃতকে জীবিত করা সংক্রান্ত আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই আয়াতসহ পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে বিশ্বজগত বিশেষ করে আসমানসমূহ সৃষ্টি সংক্রান্ত মহান আল্লাহর ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব মানুষকে প্রাণহীন মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এসেছে আদিপিতা হযরত আদম (আ.)কে মহান আল্লাহ সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন। এ ছাড়া, বর্তমানে আমরা মানুষ হিসেবে যেসব খাদ্য খাই তার সবগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎস মাটি। কাজেই মানুষের অস্তিত্ব সৃষ্টি ও রক্ষা হচ্ছে মাটি থেকেই।

মানুষ যদি তার সৃষ্টি ও জীবন পরিচালনার দিকে দৃষ্টি দেয় তাহলে সে দেখতে পাবে, মহান আল্লাহ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মাটি থেকে গোটা শরীর, বিশেষ করে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম কোষগুলো তৈরি করেছেন। আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবী যতখানি এগিয়ে গেছে তার সবই মাটি থেকে তৈরি এই মস্তিষ্কের মাধ্যমে হয়েছে। যে মাটির কোনো অনুভূতিশক্তি নেই তা অলৌকিকভাবে সূক্ষ্ম কোষে পরিণত হয় এবং এর মাধ্যমে মানুষ অনুভূতি ও বোধশক্তি অর্জন করে। এর চেয়ে বড় মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা আর কি হতে পারে?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মহান আল্লাহকে চিনতে হলে আগে নিজেকে চিনতে হবে। মানুষ সৃষ্টি হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার অন্যতম বড় অলৌকিক নিদর্শন।

২. পৃথিবীতে আমরা সব মানুষ মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছি এবং এই মাটির কাছেই ফিরে যাব। কাজেই পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করা উচিত নয়।

সূরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (21)

"এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আর এক নিদর্শন (হচ্ছে): তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি সৃষ্টি করেছেন; নিশ্চয় চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে নিদর্শন আছে।" (৩০:২১)

মানুষ সৃষ্টির রহস্যের কথা বর্ণনা করার পর এই আয়াতে দাম্পত্য জীবন সংক্রান্ত অলৌকিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলছেন: পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের জন্য আমি সঙ্গী বা সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছি যাতে জীবন চলার পথে তোমরা একাকীত্বে না ভোগো এবং তাদের কাছে শান্তি ও সুখ পাও। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই মধুময় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া পারস্পরিক ভালোবাসা ও আকর্ষণের কারণে। এই ভালোবাসার কারণে তারা সারাজীবন পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল থাকে। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি এই মধুর সম্পর্কের ফলস্বরূপ ধরার বুকে মানবপ্রজন্ম টিকে রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। এ ছাড়া, ছোট ছোট দাম্পত্য জীবনের সমষ্টিতে সমাজ গড়ে ওঠে এবং সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ সুখে-শান্তিকে জীবন কাটায়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. নারী ও পুরুষ সৃষ্টির উৎস একই। এ কারণে ইসলামে নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা দেয়ো হয়েছে। অথচ কোনো কোনো ধর্ম ও মতবাদে নারীকে পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. ইসলামে এমনভাবে পরিবার গঠন করতে বলা হয়েছে যেখানে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে; মতবিরোধ, উত্তেজনা ও ঝগড়া ঝাটি থাকে না।

৩. ভালোবাসা হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রীর প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত উপহার। এটি না থাকলে পৃথিবীতে কোনো দাম্পত্য জীবন টিকে থাকত না।

সূরা রুমের ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمِنْ آَيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِلْعَالِمِينَ (22)  

"এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন (হচ্ছে): আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণসমূহের মধ্যকার তারতম্য। এতে জ্ঞানীগণের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে।" (৩০:২২)

আল্লাহ যে মানুষকে আসমান ও জমিনের মাঝখানে বসবাসের জন্য উত্তম আবাসস্থল সৃষ্টি করে দিয়েছেন এই আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যাতে মানুষ নিজের পাশাপাশি চারপাশের পৃথিবীর দিকেও দৃষ্টি দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি এবং অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ও টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও মহাকাশের খুব অল্প জ্ঞানই এখন পর্যন্ত মানুষ অর্জন করেছে। মহাকাশের যে সীমা-পরিসীমা নেই তা স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানীরা। ভূপৃষ্ঠেও এরকম অনেক বিস্ময়কর বিষয় রয়েছে যা এখনো মানুষের অধরা। ভূপৃষ্ঠের গভীরে রয়েছে অসংখ্য খনিজ সম্পদ যার খুব কমই উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে। মাটির নীচে আল্লাহ কি অলৌকিক ক্ষমতাবলে তেল ও গ্যাসসহ মূল্যবান সম্পদ রেখে দিয়েছেন। এ ছাড়া, সমুদ্রের গভীর তলদেশে রয়েছে মাছসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী যা মানুষ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

আয়াতের পরের অংশে মানুষের দু’টি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মানুষের গায়ের রং ও ভাষার তারতম্যের কারণে পৃথিবীতে হাজার হাজার জাতি ও গোত্র এবং আঞ্চলিকতার জন্ম হয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষের গায়ের রং যদি একই রকম হতো এবং একই ভাষা ও গলার স্বরে কথা বলতো তাহলে তাদেরকে পরস্পর থেকে আলাদা করা সম্ভব হতো না। কোনো সন্তান তার পিতা-মাতাকে চিনতে পারতো না কারণ সে পিতা-মাতার বয়সি সব মানুষকে একই আকৃতিতে দেখতে পেত। স্বামী-স্ত্রীও পরস্পরকে চেনার ক্ষেত্রে ঝামেলায় পড়ত।

এ কারণে মহান আল্লাহ পরস্পরকে চেনার জন্য মানুষের বর্ণ, চেহারা ও ভাষায় পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছেন। এ ছাড়া, এই পার্থক্য ও তারতম্য না থাকলে মানুষের জীবন বৈচিত্রহীন ও একঘেয়ে হয়ে পড়ত।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ফলে মানুষের জীবনযাপন সহজ হয়ে আসার পাশাপাশি আল্লাহর নিদর্শনাবলী উপলব্ধি করা সহজ হয়েছে।

২. বর্ণ, গোত্র ও ভাষার পার্থক্য মহান আল্লাহর বিশাল ক্ষমতার অন্যতম নিদর্শন। কিন্তু মূর্খ ব্যক্তিরা এই তারতম্যকে ব্যবহার করে নিজেদেরকে বড় ভাবে ও অন্যদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।

৩. প্রতিটি ভাষা ও বর্ণের মানুষকে আল্লাহ সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই ভিন্ন বর্ণ ও ভাষার মানুষকে ছোট করার অধিকার কারো নেই।#