সূরা আর-রুম; আয়াত ৩০-৩৪ (পর্ব-৭)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৩০ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (30)
"তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে এই ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করো। এটা আল্লাহর প্রকৃতি; যার ভিত্তিতে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন নেই, এটাই সরল ধর্ম, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।" (৩০:৩০)
গত কয়েকটি পর্বে আমরা মহান আল্লাহর অস্তিত্ব এবং আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের এই আয়াতে বলা হচ্ছে: প্রকৃতির রূপ দেখার পাশাপাশি মানুষ যদি নিজের অন্তরের কাছে প্রশ্ন করে তাহলেও সে আল্লাহকে চিনতে পারবে। কারণ, মানুষের বিবেক সব সময় একজন শক্তিশালী সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব উপলব্ধি করে এবং তার জানান দেয়।
মহান আল্লাহ এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)-সহ সব ঈমানদার ব্যক্তিকে শুধু মুখের কথায় নয় সেইসঙ্গে অন্তর দিয়েও দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে তিনি যেকোনো ধরনের পথভ্রষ্টতা ও ভ্রান্তি পরিহার করতে বলেছেন। নিঃসন্দেহে প্রতিটি ঐশী ধর্ম আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে নাজিল হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইসলামের আগের সবগুলো ধর্ম প্রকৃত সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: একমাত্র যে ধর্ম সঠিক পথে আছে এবং সব ধরনের বিচ্যুতি থেকে রক্ষা পেয়েছে তা হলো ইসলাম। এই ধর্ম মানব সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর প্রকৃতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের প্রকৃতি যেমন সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না এবং সকল যুগের সকল মানুষ এক আদমের সন্তান হিসেবে একই প্রকৃতির অধিকারী, তেমনি এই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহ যে ধর্ম নাজিল করেছেন তাও অপরিবর্তনীয় ও স্থায়ী। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ যে ধর্ম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তার পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পেয়েছে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই এই সত্য উপলব্ধি করে না। তারা ইসলামকে বাদ দিয়ে মানবরচিত এমন সব মতাদর্শ অনুসরণ করে যেগুলো অপূর্ণাঙ্গ ও ভুলে ভরা। অথবা তারা এমন সব ধর্মের অনুসরণ করে যেগুলো সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাবে না।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো:
১. মহান আল্লাহ মানুষকে এমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যা সব সময় সত্যকে অনুসন্ধান এবং মিথ্যাকে ঘৃণা করে।
২. অনুশীলনের মাধ্যমে এই প্রকৃতিকে শানিত করে তুলতে হবে। তা না হলে আমাদেরকে উদাসীনতায় পেয়ে বসবে। মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রত্যেকের অন্তরে ধর্মের অস্তিত্ব আছে। তবে আল্লাহর রাসূলের দেখানো পথে জীবন পরিচালনার মাধ্যমে এই শিক্ষাকে শানিত করতে হবে যাতে তা আমাদের অন্তরে স্থায়ী আসন গড়তে পারে।
এই সূরার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (31) مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ (32)
"(তোমরাও) বিশুদ্ধচিত্তে তাঁরই অভিমুখী হও;তাঁকে ভয় করো,নামাজ কায়েম করো এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।" (৩০:৩১)
"(মুশরিক তারাই) যারা দ্বীন সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। (এদের) প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে সন্তুষ্ট।" (৩০:৩২)
আগের আয়াতে আমরা বলেছি, ধর্ম মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও অনুশীলন না থাকলে যেকোনো সময় মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ কারণে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যখনই মনে করবে ভ্রান্ত পথে চলে গেছো তখনই আল্লাহর রাস্তায় ফিরে এসো। এই পথ হচ্ছে তোমাদের একত্ববাদী প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পথ। এরপর ধর্ম রক্ষার জন্য কয়েকটি নির্দেশনা জারি করে বলা হচ্ছে: প্রথমত তাকওয়া অবলম্বন করতে হবে এবং গোনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, নামাজ আদায় ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই দুই নিদের্শ মেনে চলতে পারলে মানুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও আমলের দিক দিয়ে শিরককারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না।
পরের আয়াতে শিরকের একটি পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: শিরকের কারণে সমাজ বহুধাবিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রত্যেক দল নিজেদের মিথ্যা উপাস্যকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। তারা যার যার উপাস্যের কাছে নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। অথচ বিশ্বের সব মানুষ যদি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করত তাহলে সমাজে কোনো বিভক্তি থাকত না এবং বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হতো।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মানুষের ভেতরে থাকা ধর্মীয় অনুভূতি তখনই প্রস্ফুটিত হয় যখন সে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করে।
২. মানব সমাজে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। অন্যদিকে শিরক হচ্ছে সমাজে বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রধান কারণ।
সূরা রুমের ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَإِذَا مَسَّ النَّاسَ ضُرٌّ دَعَوْا رَبَّهُمْ مُنِيبِينَ إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا أَذَاقَهُمْ مِنْهُ رَحْمَةً إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ بِرَبِّهِمْ يُشْرِكُونَ (33) لِيَكْفُرُوا بِمَا آَتَيْنَاهُمْ فَتَمَتَّعُوا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ (34)
"মানুষকে যখন দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন ওরা বিশুদ্ধচিত্তে তাদের প্রতিপালককে ডাকে;অতঃপর তিনি যখন ওদের প্রতি অনুগ্রহ করেন তখন ওদের একদল ওদের প্রতিপালকের সঙ্গে শরীক করে।" (৩০:৩৩)
"ওদের আমি যা দিয়েছি- তা অস্বীকার করার জন্য। সুতরাং উপভোগ করো, শীঘ্রই জানতে পারবে।" (৩০:৩৪)
এই আয়াতে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলা হচ্ছে: যখন মানুষ এমন কোনো সমস্যা ও বিপদ পড়ে যে অন্য কারো পক্ষে তার সাহায্যে এগিয়ে আসা সম্ভব নয় তখন সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। আল্লাহ তায়ালাকে তার সমস্যার সমাধান করে দিতে বলে। এর আগে সুখের সময়ে নিজের ধর্মীয় অনুভূতিকে অস্বীকার করে যে আল্লাহকে সে ভুলে ছিল বিপদের সময় সেই আল্লাহর কথা তার মনে পড়ে যায়। এ কারণে তখন সে এর আগে আল্লাহকে ভুলে থাকার জন্য তওবা ও অনুশোচনা করে এবং তাঁর কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু আল্লাহ তার অনুনয়-বিনয় গ্রহণ করে তাকে বিপদ থেকে মুক্ত করে দেয়ার পর সে আবার আল্লাহকে ভুলে যায়। বিপদ থেকে আল্লাহ মুক্ত করে দিলেও সে নিজে এর কৃতিত্ব দাবি করে এবং অন্য অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়ে আল্লাহর সাহায্যের বিষয়টিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে। একজন মানুষের জীবনে যদি এ ধরনের অকৃতজ্ঞতার ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে তাহলে এক সময় সে আল্লাহর নেয়ামতের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক সময় এ ধরনের মানুষ পার্থিব ধনসম্পদ ভোগ করলেও এদের চূড়ান্ত পরিণতি ভালো হয় না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. কিছু মানুষ বিপদে পড়লেই কেবল আল্লাহকে স্মরণ করে। তাদের আচরণ দেখলে মনে হয় আল্লাহ কেবল বিপদ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যই বসে আছেন এবং তারা যদি বিপদে না পড়ত তাহলে আল্লাহকে তাদের প্রয়োজনই হতো না।
২. বিপদ ও সংকটের সময় আল্লাহর প্রতি মানুষের উদাসিনতা কেটে যায় এবং সে তার প্রকৃতির দিকে ফিরে আসে।
৩. পার্থিব জীবনে সম্পদের প্রাচুর্য মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে ভুলিয়ে রাখে এবং তাকে অকৃতজ্ঞতা ও কুফরের দিকে টেনে নিয়ে যায়।#