জুন ২০, ২০১৭ ০৯:৪১ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি,খাজা নাসির উদ্দিন তুসি নিশাপুরে যখন পড়াশুনা শেষ করছিলেন তখন মোঙ্গল হামলার শিকার হয় এই শহর।

মোঙ্গলরা নিশাপুর ছাড়াও ইরানের শহরগুলোকে একের পর এক গুড়িয়ে দেয়। কেবল ইসমাইলি দূর্গগুলোই এই সর্বগ্রাসী মঙ্গল হামলাগুলোর সামনে রুখে দাঁড়িয়েছিল।

খাজা নাসির উদ্দিন মঙ্গল হামলার সময় নানা বিজ্ঞানে পারদর্শী একজন পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। এ সময় তিনি নিশাপুর ছেড়ে চলে যান ইসমাইলি দূর্গে। সেখানে তিনি কয়েকটি বই লিখেছিলেন। মোঙ্গল কমান্ডার হালাকু খান ইরান অভিযান শেষ  ও ইসমাইলিদেরকে বিতাড়িত করার পর খাজা নাসির উদ্দিনকে তার দরবারের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।

ইসমাইলিদেরকে দমনের পর হালাকু খান বাগদাদে হামলা চালিয়ে আব্বাসিয় রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়। খান এ বিষয়ে খাজা নাসির উদ্দিনের পরামর্শ চায়। খাজা এ বিষয়ে আগেই ভেবেছিলেন। তিনি তার দূরদর্শিতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে আব্বাসিয় শাসকরা ভবিষ্যতে নানা সংকটের শিকার হবেন এবং ইরাক খুব সহজেই মঙ্গলদের করায়ত্ত হবে। হালাকু খাজাকে বিশ্বাস করতেন এবং বাগদাদ অবরোধের পদক্ষেপ নেন। অবশেষে ৬৫৬ হিজরিতে আব্বাসিয় খলিফা ও তার তিন পুত্র এবং অন্যান্য বড় কর্মকর্তাদের বাগদাদ থেকে বিতাড়িত করে মঙ্গলরা। এভাবে বাগদাদ মোঙ্গলদের হস্তগত হয়। হালাকু খান খলিফাকে হত্যার নির্দেশ দেন।

মোঙ্গলদের বাগদাদ বিজয় সম্পন্ন হলে তুসিকে উত্তরপূর্ব ইরানের মারাকেহ শহরে একটি মানমন্দির বা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন খাজা নিজেই এই বিজ্ঞান মানমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ধরনের মানমন্দির নির্মাণের নানা কল্যাণ ও সুবিধা সম্পর্কে হালাকু খানকে অবহিত করেছিলেন খাজা নাসির উদ্দিন। প্রকল্পটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও হালাকু খাজার পরামর্শ গ্রহণ করে।

অবশ্য অন্য একদল ঐতিহাসিক মনে করেন এই মানমন্দিরটি নির্মাণের পরিকল্পনাকারী ছিলেন মোঙ্গল শাসক মানাকু কাআন। এই মানাকু কাআনই হালাকুকে ইরান আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারা আরও মনে করেন হালাকু ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক এবং হালাকু নিজে ইউক্লিডিয় জ্যামিতিতে কিছুটা দক্ষ ছিলেন। মানাকু খাজার ব্যাপক জ্ঞানের কথা জানতে পেরে তাকে মঙ্গোলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ পাঠান হালাকুর কাছে যাতে সেখানে একটি মানমন্দির নির্মাণ করা যায়।

কিন্তু মঙ্গোল শাসক সে সময় দক্ষিণ চীনে অভিযান চালানোর কথা ভাবছিলেন। আর হালাকু খাজার গভীর জ্ঞানের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিল বলে মোঙ্গল রাজা ইরানেই ওই মানমন্দির নির্মাণ করা বেশি যৌক্তিক হবে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন।

মারাকেহ শহরের একটি পাহাড়ের ওপর ওই মানমন্দির নির্মাণের জায়গা ঠিক করা হয়। খাজা নাসির উদ্দিনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী এই মানমন্দির নির্মাণের জন্য সে যুগের বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার বা স্থাপত্যবিদ আবুল সা’দাত আহমাদ ইবনে ওসমান মারাকিহকে নিয়োগ দেয়া হয়। এই মানমন্দিরের উন্নয়নের কাজও সরকারি অর্থে পরিচালিত হত। মানমন্দিরের নির্মাণ কাজ তদারকের জন্য খাজা তিন বার সফর করেছিলেন। এইসব সফরে তিনি ওই মানমন্দিরের জন্য কয়েকটি বই ও পর্যবেক্ষণের যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জন্য জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যবহৃত কয়েকটি সারনিও রচনা করেন। 

খাজা নাসির উদ্দিনের তৈরি-করা জ্যোতির্বিদ্যার সারণিগুলো ছিল মানের দিক থেকে অনন্য। মারাকেহ’র মানমন্দিরে কাজ করেছেন বিপুল সংখ্যক গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ। এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সুবিধার একটি বড় দিক ছিল এটা যে এখানে একটি বড় লাইব্রেরি ছিল যাতে চার লাখেরও বেশি বই ছিল। এই বইগুলোতে ছিল শিক্ষামূলক নানা বিষয়। খাজা নাসির উদ্দিন তার এই বিজ্ঞান-গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ব্যবহার করতে বিশ্বের নানা দেশের জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিত, বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

খাজা নাসির উদ্দিনের এই প্রতিষ্ঠানে মূলত তাত্ত্বিক বিজ্ঞান ও গণিতের ওপর জোর দেয়া হত যা জ্যোতির্বিদ্যার মূল ভিত্তি। এখানে দর্শনের ছাত্রদেরকে দৈনিক তিন দিরহাম, চিকিৎসা শাস্ত্রের ছাত্রদের দুই দিরহাম এবং ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের দেয়া হত এক দিরহাম। আর হাদিসের ছাত্রদের দেয়া হত দৈনিক আধা দিরহাম। খাজার উদ্যোগে চালু হওয়া এই বৃত্তি ১৩ বছর পর্যন্ত চালু ছিল।

খাজা নাসির উদ্দিনের বিজ্ঞান-কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার আগেই মারা যায় হালাকু খান। ফলে রাজ-সিংহাসনে বসেন যুবরাজ। প্রথম দিকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চেয়েছিল এই যুবরাজ। কিন্তু খাজার চেষ্টা ও পরামর্শে যুবরাজ ক্ষমতা গ্রহণ করে। আর এর পাশাপাশি মানমন্দির নির্মাণের কাজ চালিয়ে যান খাজা ও তার সহকর্মীরা।

খাজা নাসির উদ্দিন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এই গবেষণা-কেন্দ্রের তৎপরতাকে সম্ভাব্য যে কোনো বাধা ও বিপত্তি থেকে রক্ষার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে যান।

খাজা নাসির উদ্দিন তার সমস্ত প্রবন্ধ বা পুস্তিকা লিখেছিলেন আরবি ভাষায়। জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতার দিক থেকে এই মহান মনীষীর জ্ঞানকে ইরানের মনীষী ইবনে সিনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ দু’জনের মধ্যে ইবনে সিনা চিকিৎসা শাস্ত্রে বেশি পারদর্শী ছিলেন। অন্যদিকে খাজার দক্ষতা বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল গণিতে। গণিতের নানা বিষয়ে বেশ কয়েকটি মূল্যবান বই লিখেছিলেন খাজা নাসির উদ্দিন।

জার্মান প্রাচ্যবিদ কার্ল ব্রোকেলম্যান মনে করেন খাজা বড় ধরনের অবদান রেখেছেন গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায়। কার্ল ব্রোকেলম্যান তার বইয়ে এটাও উল্লেখ করেছেন যে খাজা নাসির উদ্দিন বিজ্ঞান সম্পর্কিত অনেক বই অনুবাদ করেছিলেন এবং তিনিই প্রথমবারের মত ত্রিকোনোমিতিকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দেন।  জ্যোতির্বিদ্যার ওপরও কয়েকটি মূল্যবান রচনা রেখে গেছেন ইরানের এই মনীষী। গণিত বিষয়ে খাজার বইগুলো মুসলিম পণ্ডিত বা আলেমদের শিক্ষা-কারিকুলামে স্থান পেয়েছিল। খাজা নাসির উদ্দিনের কোনো কোনো মূল্যবান বই অনুদিত হয়েছিল কয়েকটি বিদেশী ভাষায়। ফলে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা উপকৃত হয়েছিলেন এইসব বই থেকে।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২০