‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’: ইরানি দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ খাজা নাসিরুদ্দিন তুসি (পাঁচ)
গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা খাজা নাসিরউদ্দিন তুসির নানা বই সম্পর্কে আলোচনা করেছি।
হিজরি ৬৭২ সনে নাসির উদ্দিন তুসি তার একদল ছাত্রসহ বাগদাদ যান। তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল মোঙ্গলদের হাতে লুট হয়ে যাওয়া বইগুলোর অবশিষ্টাংশকে সংগ্রহ করা। তার ইচ্ছা ছিল এইসব বই মারাগ্বের বিজ্ঞান-গবেষণা ও মহাকাষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পাঠাগারের জন্য নিয়ে আসার। কিন্তু মৃত্যু তার এই ইচ্ছা বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়নি। সে বছরই তথা হিজরি ৬৭২ সনের জিলহজ মাসের ১৮ তারিখে বাগদাদের উপকণ্ঠে কাজেমাইন শহরে ইন্তেকাল করেন খাজা নাসির উদ্দিন তুসি। ইমাম কাজিম ও ইমাম জাওয়াদের সম্মিলিত মাজার কমপ্লেক্সের আঙ্গিনাতেই রয়েছে খাজা নাসিরের মাজার।
মোঙ্গল শাসনামলের ঘন অন্ধকারের অমানিশার মধ্যে নাসির উদ্দিন তুসি ছিলেন এক অত্যুজ্জ্বল তারকা। তিনি সে সময় মোঙ্গল সাম্রাজ্যের যে শহরেই গেছেন সে শহরেই প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও উন্নত নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন।
মধ্যযুগের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন শাসনামলে এমন এক মহান মনীষী ও বিজ্ঞানীর জন্ম ছিল মহা-বিস্ময়কর ঘটনা।
প্রখ্যাত খ্রিস্টান লেখক জর্জি জিইদান নাসির উদ্দিন তুসি সম্পর্কে লিখেছেন: ‘বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞা এই ইরানি মনীষীর মাধ্যমে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ছিলেন ঘন আঁধার রাতের বুকে যেন এক দেদীপ্যমান আলোক-শিখা।’
খাজা নাসির উদ্দিন তুসিকে কেবল বই ও কলমের তৎপরতার গণ্ডিতে আবদ্ধ মনীষী বলা যায় না। তিনি জীবনকে কেবলই কিছু পরিভাষা বা শব্দার্থের মধ্যে সীমিত করেননি। যেখানে নৈতিকতা ও মানবতার প্রশ্ন আসত সেখানে তিনি খোদায়ী তথা ইসলামী মূল্যবোধকে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দিতেন। আত্মকেন্দ্রীকতা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন নাসির উদ্দিন তুসি। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কেবল জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই যথেষ্ট নয়, একইসঙ্গে মহান আল্লাহর ওপর গভীর বিশ্বাস, খোদাভীতি ও সৎকর্মও জরুরি। নাসির উদ্দিন তুসি এইসব দিকেও সমৃদ্ধ ছিলেন বলেই বহু শতক পর আজও তার বক্তব্য, আচরণ ও প্রজ্ঞা জ্ঞানী আর গুণীদের আসরের অলঙ্কার হয়ে আছে।
খাজা নাসির উদ্দিন তুসি সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে স্বার্থান্বেষী নানা মহল নানা ধরনের অপবাদ ও অসত্য তথ্য প্রচার করেছে। খাজা নাসির এক পর্যায়ে মোঙ্গল সরকারের মন্ত্রী হওয়ায় এবং তিনি শিয়া মুসলমান ছিলেন বলে তথা বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের নেতৃত্বের ধারার অনুসারী ছিলেন বলে আহলে বাইত বিদ্বেষী কোনো কোনো চিন্তাবিদ ও স্বার্থান্বেষী মহল এই মহান মনীষীর বিরুদ্ধে সেইসব ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচারের সুযোগ পেয়েছে। অনেক সরলমনা মুসলমান এইসব অভিযোগ বিশ্বাসও করেন। যেমন, খাজা নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো তিনিই আব্বাসিয় খিলাফত ধ্বংস করেছেন মোঙ্গলদেরকে উস্কানি দিয়ে এবং বাগদাদের শেষ আব্বাসিয় সম্রাট মুতাসিম বিল্লাহ ও বহু আলেমকে হত্যা করার উস্কানি দিয়েছিলেন খাজা নাসির! ফলে বাগদাদের পতনের জন্য খাজাই দায়ি!
কিন্তু বাস্তবতা হল বাগদাদে মোঙ্গল হামলার বহু দশক আগেই ইরান ও খোরাসান ছাড়াও ইরাক, সিরিয়া ও মধ্য-এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চল আব্বাসিয় খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। বাগদাদের খলিফারা আরাম-আয়েশ এবং ভোগ-বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় এই রাজাদের সশস্ত্র বাহিনী নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকার-কাঠামোর ওপর থেকে শুরু করে সাধারণ সেনা পর্যায়েও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে প্রাচীন ইরান ও খাওয়ারিজম অঞ্চল স্বাধীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের সর্বগ্রাসী হামলার মুখে পদানত হয় খাওয়ারিজম। সে সময় ইরান ছিল খাওয়ারিজমের অংশ। বেশ কয়েক দশক ধরে মোঙ্গলরা ইরান ও খাওয়ারিজমের নানা অঞ্চল শাসন করার পর তাদের নজর পড়ে বাগদাদের দিকে। বাগদাদের বিলাসি খলিফাদেরকে স্থানীয় দরবারের কোনো কোনো দূরদর্শী ব্যক্তি মোঙ্গল হামলার বহু আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল যে সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের নানা বিষয়ে সংস্কার আনা না হলে গোটা রাষ্ট্রের পতন অত্যাসন্ন এবং বিজাতীয়রা খুব সহজেই বাগদাদ দখল করবে।
আব্বাসিয় খেলাফতের শেষের দিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বেশির ভাগ অর্থই খলিফারা ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের কাজে ব্যবহার করতেন। সেনাদের বেতন দেয়ার মত মানসিকতাও তাদের ছিল না! ফলে সেনারা প্রজাদের ক্ষেত-খামার থেকে খাদ্য-শস্য সংগ্রহ করতো বল-প্রয়োগের মাধ্যমে। এই জুলুমের ফলে জনগনও খলিফাদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল।
মোঙ্গলরা খাওয়ারিজম দখল করেছিল তাদের বাণিজ্য কাফেলার সম্পদ লুটের প্রতিশোধ নিতে। এ ছাড়াও তাদের পেছনে খ্রিস্টান শক্তিগুলোর উস্কানিও ছিল। তাদের উস্কানিতে মোঙ্গলরা যখন ধীরে ধীরে পুরো ইরান দখল করতে থাকে তখনও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ নেয়নি আব্বাসিয়রা। মোঙ্গলরা গোটা ইরান দখল করলে এর জ্ঞানী-গুণিরাও হয়ে পড়েন পরাধীন। তাদের মধ্য থেকে খাজা নাসিরসহ শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে বহু মনীষীই মঙ্গোল দরবারের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হন। খাজা তার দূরদর্শিতার কারণে বুঝতে পেরেছিলেন যে, মোঙ্গলরা বাগদাদও দখল করবে খলিফাদের অযোগ্যতা ও দুর্বলতার কারণে। তাই বাগদাদে মোঙ্গল অভিযানের বিরোধিতা করা ও না করার মধ্যে মুসলমানদের কোনো কল্যাণ নেই বলে তিনি ভেবেছিলেন।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় দেখা গেছে বাগদাদের শেষ খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ মোঙ্গলদের গতিবিধির কোনো খোঁজ-খবরও রাখতেন না। দরবারের কোনো কোনো ব্যক্তির হুঁশিয়ারিকেও তিনি উপেক্ষা করেছিলেন! তিনি প্রায় সব সময়ই নতর্কীদের আসরে মদ পান করে মাতাল হয়ে থাকতেন। যখন মোঙ্গল সেনারা রাজ-প্রাসাদের কাছে চলে আসে তখনও তিনি নতর্কীদের নাচ দেখছিলেন! এ অবস্থায় একজন মোঙ্গল সেনার ছোঁড়া তির যখন নৃত্যরত একজন নর্তকীকে ধরাশায়ী করে তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে তার রাজ্যে হামলা হয়েছে!
এ সময় পালানোর পথও তার জন্য খোলা ছিল না। তাই বাগদাদে মোঙ্গল হামলার জন্য নাসির উদ্দিন তুসিকে দায়ি মনে করা পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও অবাস্তব অভিযোগ মাত্র! আব্বাসিয় খেলাফতের সেনারা মোঙ্গল সেনাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলেনি। ফলে মোঙ্গলদের হাতে বাগদাদের পতন ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এমনকি দুর্বল হয়ে পড়া আব্বাসিয় খেলাফতের জনগণও অযোগ্য, বিলাসী ও জালিম খলিফাদের শাসনের হাত থেকে মুক্তি কামনা করছিল। ফলে জনগণও মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। আর ইরাক ও ইরানসহ সব খানেই শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষ সব মুসলমানই মোঙ্গলদের গণহত্যার শিকার হয়েছিল। তাই এসব হামলা যে শিয়াদের উস্কানিতে হয়নি তা স্পষ্ট।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৪