আগস্ট ০৩, ২০১৭ ১৭:৩৩ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের বগুড়ার সাবেক ইউএনও তারিক সালমনের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আর সেজন্যই দেশজুড়ে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের মনোবল সম্পূর্ণরুপে ভেঙে দিতে পারে। এটা কোনোভাবেই ঠিক না। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মোফাজ্জল করিম।

তিনি বলেন, তারেক সালমনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন তা সবার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। অভিযোগকারী আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা অতি উৎসাহী হয়ে কাজটি করেছেন।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব মোফাজ্জল করিম, বরগুনা সদর উপজেলার ইউএনও’র বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং তার জামিন নামঞ্জুর হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে। এই তোলপাড়ের যৌক্তিকতা কতটা ছিল?

মোফাজ্জল করিম: দেখুন, ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত এবং খুবই দুঃখজনক। এটা হওয়া কোনোভাবেই উচিত ছিল না। ঘটনাটি ঘটেছে আদালতে। একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কোনো তদন্ত ছাড়া চট করে চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট  কোর্টে হাজির করা হয়েছে। আর যার আদালতে হাজির করা হয়েছিল তিন খুবই সিনিয়র একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা। কোনো বিষয় তলিয়ে না দেখে হুট করে একটা আদেশ দেবেন এমনটি তাঁর কাছ থেকে আশা করা যায় না।

সিনিয়র মহানগর মুখ্য হাকিম বরগুনার ওই নির্বাহী কর্মকর্তাকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। বরগুনার ওই নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটল তাতে সাধারণ মানুষের মনে কী প্রশ্ন উঠতে পারে? এমন প্রশ্ন উঠতে পারে যে একজন ইউএনও’র প্রতি বিচার বিভাগীয় একজন কর্মকর্তা যদি এমন আচরণ করতে পারেন তাহলে সাধারণ মানুষের  ক্ষেত্রে কী হবে!

বিচার বিভাগীয় একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে মানুষ বিচক্ষণ, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা আশা করে। সেখানে ইউএনও’র প্রতি ওই আচরণে সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। আর সেজন্যই দেশজুড়ে বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনের মনোবল সম্পূর্ণরুপে ভেঙে দিতে পারে। এটা কোনোভাবেই ঠিক না।

বরগুনার ইউএনও’র ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে আমি মিডিয়ায় দেখেছি। আর সঙ্গতভাবেই তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ তিনি আশা করতে পারেন না যে তাঁর দলের একজন নেতা না জেনে, না শুনে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন একটা অভিযোগ আনতে পারেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে আদালত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

রেডিও তেহরান: ইউএনও’র বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় বরগুনা ও বরিশাল জেলার ডিসিকে অপসারণ করা হয়েছে। কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে? অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন- ডিসিদের অপরাধ কী? আপনি কী বলবেন?

মোফাজ্জল করিম: দেখুন, আমি নিজে একসময় তিনটি বড় বড় জেলার ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ডিসির সরাসরি অধীনস্ত কর্মকর্তা হচ্ছেন ইউএনও।

তো ইউএনও’র কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত থাকা, তাঁর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাঁকে পরামর্শ দেয়ার দায়িত্ব জেলা প্রশাসক বা ডিসির। কিন্তু বরগুনার ইউএনও’র ঘটনায় জেলা প্রশাসকের নিজ দায়িত্বে অবহেলার যথেস্ট চিহ্ন দেখা গেছে।  এ বিষয়ে দায়িত্ব পালনে দুই জেলা প্রশাসক সফলতা দেখাতে পারেন নি। আর সেই কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

রেডিও তেহরান: ইউএনও’র বিরুদ্ধে মামলার পর একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেছেন, “ঘটনার শেষ দেখে ছাড়ব।” এ থেকে বোঝা যায়- সরকার বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। এর কারণ কী? এটা তো আদালতেরও বিষয় ছিল।

মোফাজ্জল করিম: বরগুনার ইউএনও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন সরকারি দলের স্থানীয় একজন নেতা। তার অভিযোগটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সবার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে এটা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি অতি উৎসাহী হয়ে এবং দলের নেতা-নেত্রীদের কাছে প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য এমন অভিযোগ করেছেন। আর সে কারণে বিষয়টি তলিয়ে দেখার জন্য সরকারি দলের ওই প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়তো বলেছেন এর শেষ দেখে ছাড়বেন।

তাঁর বলার উদ্দেশ্য আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, সেটা হচ্ছে কেন ওই স্থানীয় নেতা এমন একটি অভিযোগ আনলেন, এরমধ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা। কারণ এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর সেকারণেই বিষয়টির শেষ দেখতে চাওয়ার কথা বলেছেন বলে মনে হয়।

যে ভদ্রলোক ইউএনও’র বিরুদ্ধে অভিযোগটি এনেছেন তিনি এমন নন যে ছাত্রলীগের কোনো তরুণ কর্মী। অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তি একজন প্রবীণ নেতা। তিনি হুট করে এমন একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ আনবেন এমনটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। অভিযোগকারী দলের একজন ব্যক্তি হওয়ায় সম্ভবত মন্ত্রী এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন, বরগুনার ইউএনও’র বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনার মধ্যদিয়ে আমলাতন্ত্রের ভেতরের একটা দ্বন্দ্বের প্রকট রূপ প্রকাশ পেয়েছে। আপনারও কী তাই মনে হয়?

মোফাজ্জল করিম: হ্যাঁ এটা হতেও পারে। এমন হতে পারে হয়তো ডিসির পছন্দ নয় ওই ইউএনও। হয়তো তাঁর কার্যকলাপ জেলা প্রশাসক পছন্দ করেন না। আমরা যতটুকু শুনেছি এবং মিডিয়ার খবরে দেখেছি-তাতে মনে হয় বরগুনার ইউএনও তারিক সালমন অত্যন্ত সৎ, নর্ভীক, সাহসী এবং দক্ষ কর্মকর্তা। আর এধরনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অন্যায় অনুরোধ ও নির্দেশ মানেন না। এসব কারণে ডিসির সাথে ইউএনওর দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে।

আর এসব বিষয় ভালোভাবে একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অন্যদিকে প্রশাসনের তরফ থেকে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সরকার বলতে আমি এখানে রাজনৈতিক দলের কথা বুঝাতে চেয়েছি। ফলে দুই ডিসিসহ সবাইকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

রেডিও তেহরান: বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করার অভিযোগ নিয়ে যে ঘটনার সূত্রপাত আসলে তা কতটা গ্রহণযোগ্য ছিল? অনেকে বলছেন, এমন অনেক সংবেদনশীল ইস্যুকে ব্যবহার করে অনেকেই স্বার্থ উদ্ধার করছেন। কতটা সত্য এ অভিযোগ?  

 মোফাজ্জল করিম: দেখুন, আমি সেকথাই বলছিলাম। হয়তো কেউ অতি উৎসাহী হয়ে দেখাতে চেয়েছেন যে তিনি বঙ্গবন্ধুর কত বড় প্রেমিক! এটা প্রমাণের জন্য ওই ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। আর সে বিষয়টিই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যে ভদ্রলোক মামলাটি করেছিলেন বরগুনার ইউএনও’র বিরুদ্ধে তাঁর প্রথমেই বোঝা উচিত ছিল যে ছবিটা নিয়ে মামলা করলেন সেই ছবিটা কে একেঁছে। একটি প্রতিযোগীতায় পঞ্চম শ্রেণির শিশুর আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবিটি প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। সেই ছবিটি দিয়ে আমন্ত্রণ পত্রে ছাপান হয়েছিল। আর এ বিষয়টি দোষণীয় কিছু বলে আমি অন্তত মনে করি না।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি শিশুর ছবিতে কতরকমের ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে। তাঁর আঁকা ছবিটিতে হয়তো বঙ্গবন্ধুর যথার্থ প্রতিকৃতি নাও হতে পারে। এ বিষয়টি তো বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল। সেটা না করে এ বিষয়টি নিয়ে মামলা করা ঠিক হয়নি। আর মামলার যিনি বিচারক তিনিও সেটাকে খতিয়ে না দেখে, ভালোভাবে তদন্ত না করে আমলে নিলেন- এটি তো বিশ্বাসযোগ্য নয়।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩