আদর্শ জীবনযাপন-১০
বলছিলাম,অন্যের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, ঠাট্টা মশকরা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ঘটনা অপরের অপমানের পাশাপাশি নিজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ হলো এ ধরনের লোকের ব্যাপারে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে যায়।
তারচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এই বিদ্রূপ প্রবণতা আল্লাহর স্মরণ থেকে নিজেকে এবং জনগণকে উদাসীন করে তোলে। কুরআন তাই হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছে এ ধরনের আচরণ পুরোপুরি অস্বাভাবিক। তাই এ রকম আচরণ পরিহার করতে হবে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান উপায় হলো আন্তরিকতার সঙ্গে মেলামেশা এবং কথা বলা। এটা একটা শিল্প। কল্যাণকর এবং সুন্দর করে কথা বলার মধ্য দিয়ে অনেক ইতিবাচক দিক অর্জিত হয়। এই গুণটি অর্জন করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সমব্যথী হওয়া, দু:খ-কষ্ট ভাগাভাগি করে নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
সহানুভূতি একটা বিরাট গুণ। অপরের দু:খ-কষ্ট নিজের ভেতরে লালন করতে পারা সহজ ব্যাপার নয়। কোনো মানুষ যখন কোনো সংকটে পড়ে, যখন কোনো বিপর্যয় নেমে আসে তার জীবনে তখন একটুখানি সহানুভূতি ওই ব্যক্তিকে আত্মি এবং মানসিক দুরবস্থা থেকে সহজেই মুক্তি দিতে পারে। অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এরকম সহানুভূতি কায়করি ভূমিকা রাখতে পারে। বিপদাপদে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় এবং ত্বরান্বিত হয়। মোটকথা সহানুভূতি হচ্ছে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার যোগসূত্র। তদুপরি সম্পর্কের ধরন এবং গভীরতাও বৃদ্ধি পায় সহানুভূতির মধ্য দিয়ে।
সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ অন্যের সহযোগিতা,সাহচর্যের মুখাপেক্ষি। নিজস্ব আবেগ অনুভূতির যথার্থ ও উপযুক্ত জবাব মানুষ মানুষের কাছ থেকেই পায় অন্য কারও কাছ থেকে নয়। নিজের প্রয়োজনের কথা মানুষ আর কাকে বুঝিয়ে বলবে। সে কারণেই নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্য কোনো মানুষকেই কাজে লাগানো হয়। একজন মানুষের কাজে অন্য একজন মানুষকে ব্যবহার করার বিষয়টা কখনো শক্তি সামর্থ আবার কখনো ধন সম্পদের ওপরও নির্ভর করে। তবে দুইভাবে এই সম্পর্কটি হতে পারে। তুচ্ছ ভেবে বা তুলনামূলকভাবে নিম্ন শ্রেণীর বলে উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা তাদের কাজকর্মে ব্যবহার করতে পার যাকে কামলা খাটানো বলা যেতে পারে। আবার ভালোবেসে কিংবা আন্তরিক অনুভূতির মাধ্যমেও একই কাজ করানো যেতে পারে। তবে সহৃদয় সহানুভূতি ও আন্তরিকতাপূর্ণ মানসিকতার মাধ্যমে যে সম্পর্কটা গড়ে উঠবে সেটা দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হবে-এটাই স্বাভাবিক।

সহৃদয় সহানুভূতি ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ীত্ব ও গভীরতা নিয়ে কথা বলছিলাম। এই সহানুভূতি নিয়ে আমরা আরেকটু বিস্তারিত কথা বলতে চাই। কেননা সহানুভূতির ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুসম্পর্ক ও সহানুভূতিপূর্ণ বন্ধনের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু-ও সম্প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। হু এই সহানুভূতিপূর্ণ সম্পর্ককে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করে। সহানুভূতি হলো সেই গুণ যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অন্যের জীবনের সুখ দু:খকে এমনকি দূর থেকেও উপলব্ধি করতে পারে।
বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের ওপর ইসলামের মাহাত্ম্য ও স্বাতন্ত্র্য হলো, ইসলাম বহু শতাব্দি আগে থেকেই মানুষের মাঝে ঐক্য, সংহতি, ভালোবাসা, আন্তরিকতা অর্থাৎ পারস্পরিক সুসম্পর্কের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে সহানুভূতি মানে অপরের মনকে সমানভাবে উপলব্ধি করা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর একটি বৈশিষ্ট্য। এই সহানুভূতির মাধ্যমে মানুষেরা অন্যের প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধা সম্মান ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে পারে। এই আন্তরিক অনুভূতি মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের চাকাকে সহজ ও অবাধ করে তোলে। যার ফলে সম্পর্কের চাকা সুন্দরভাবে ঘুরতে থাকে। সহানুভূতি বা অন্তরের মিল থাকলে মানুষ অন্যকে তার কঠিন দু:সময়ে কিংবা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতেও মানসিক ও আত্মিক চাপ,উত্তেজনা,অস্থিরতা থেকে রেহাই দিতে পারে।
অন্যের কষ্ট অন্যের মানসিক অবস্থা, হৃদস্পন্দন উপলব্ধি করতে না পারলে সম্পর্ক স্থাপন করবো কীভাবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে সহানুভূতি হলো অন্যের ব্যক্তিগত পৃথিবীতে প্রবেশ করার শক্তি। মনের অবস্থা যথাসময়ে বুঝতে পারলে যে-কোনো উপায়ে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। তাকে যে বুঝতে পেরেছি তাও বোঝানো যায়। আর যখন আমরা অন্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবো তখন স্বাভাবিকভাবেই সে আমাদের কথা শোনার জন্য এবং আমাদেরকে গ্রহণ করার জন্য বেশি বেশি আগ্রহী হবে ও প্রস্তুত থাকবে। সহানুভূতি ও অনুভূতির প্রতিফলন আরোগ্যের এমন একটি উপাদান যা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং মানুষকে কোনঠাসা অবস্থা ও আত্ননিমগ্নতা থেকে মুক্তি দেয়।

যেসব লোক অন্যদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অহমিকা দেখায় এবং অন্যের মতামত ও চাওয়া পাওয়াকে গুরুত্ব না দেয় তারা খুব কমই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তারা অন্যদের বিশাল পৃথিবী সম্পর্কে অনবহিত থাকে। এ ধরনের লোকেরা এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মাঝে কারো সাথেই আন্তরিক হতে পারবে না কিংবা আন্তরিকতা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেও আবদ্ধ হতে পারবে না।
বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের ওপর ইসলামের মাহাত্ম্য ও স্বাতন্ত্র্য হলো, ইসলাম বহু শতাব্দি আগে থেকেই মানুষের মাঝে ঐক্য, সংহতি, ভালোবাসা, আন্তরিকতা অর্থাৎ পারস্পরিক সুসম্পর্কের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে সহানুভূতি মানে অপরের মনকে সমানভাবে উপলব্ধি করা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর একটি বৈশিষ্ট্য। হয়তোবা একই পিতা মাতার সন্তান হবার কারণেই এই গুণবৈশিষ্ট্যটি মানুষের ভেতর বিদ্যমান। এই অভিন্ন জন্মধারার কারণেই হতে পারে একজন আরেকজনকে অনুভব করতে পারে, স্বজনের বন্ধন, আত্মীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের মায়াডোরে একে অপরকে বাঁধতে পারে মানুষ।
ইসলামের নীতিমালা ও আদেশ নির্দেশগুলোর প্রতি মনোযোগের সঙ্গে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে যেসব গুণবৈশিষ্ট্য থাকার কারণে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মাঝে ভালোলাগা এবং ভালোবাসা যুগে যুগে বিস্তার লাভ করেছে এবং করছে সেইসব গুণকে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে। ওই গুণগুলো অর্জনের ব্যাপারেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে: অন্যদের সঙ্গে ভালো ও সুন্দর আচরণ করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে সদয় সদ্ব্যবহার ও উত্তম আচরণ করা, সন্তানদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ও আচরণ করা, মানুষের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো এবং সহানুভূতিশীল হওয়া সর্বোপরি মানুষকে ভালোবাসা ইত্যাদি।

স্নেহ, আন্তরিক সহানুভূতি এবং অন্যের মনের অবস্থা বুঝে এগিয়ে যাওয়া ইসলামের অন্যতম অর্জন। ইসলামের এই বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষা কী পরিমাণ গুরুত্ববহ তা নবী করিম (সা) এর সময়কার জাহেলি সমাজে বিস্তৃত নানা কুসংস্কার ও বিভ্রান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই কেবল উপলব্ধি করা সম্ভব। সেই সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার মাঝে এতোটুক স্নেহ ভালোবাসা ছিল অকল্পনীয় রহমত। সুরা আল-ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লা রাব্বুল আলামিন মুসলমানদের অন্তরে এই স্নেহ প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে বলেছেন: তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জু মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরো এবং দলাদলি করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন সে কথা স্মরণ রেখো: তোমরা পরস্পরের কীরকম শত্রু ছিলে। তিনি তোমাদের হৃদয়গুলোতে স্নেহ-মায়া-মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহ ও নিয়ামতের বরকতে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো।
এই আয়াত অনুযায়ী পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হবার পর এবং ঈমানের আলোকে মানুষের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতি সৃষ্টির পর মানুষের মাঝ থেকে বিভেদ বিচ্ছিন্নতা দূর হয়ে গেল। জাহেলি সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং ফেতনা ফাসাদের ভয়াবহ আগুণ নিভে গিয়ে সবাই একাত্ম ও ঐক্যের ডোরে আবদ্ধ হয়ে গেল। তাদের মাঝে স্নেহ, মায়া-মমতার বন্ধন তৈরি হলো, সহানুভূতিশীল সম্পর্ক সৃষ্টি হলো। মানুষ এক ও অভিন্ন ভাষী হলো। অর্থাৎ চিন্তা চেতনা আর বোধ ও বিশ্বাসে যেমন অভিন্ন হয়ে উঠলো সবাই তেমনি কথা বলার ধরনেও অভিন্নতা দেখা গেল। ভাষাগত, গোত্রগত বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও অন্তরের দিক থেকে তারা হয়ে উঠলো একাত্ম। বিখ্যাত মরমি কবি জালালুদ্দিন রুমি এই অবস্থাকে তুলে ধরে ঠিকই বলেছেন: অভিন্ন ভাষার চেয়ে অভিন্ন অন্তর শ্রেষ্ঠ।
এই অভিন্ন চিন্তা মনের বৃত্ত বা কল্পনা থেকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে সৎ ও কল্যাণময় অভিপ্রায় মানে নিয়্যত থাকতে হবে। তার মানে দাঁড়ায় কেউ কার্যকর কোনো বিষয় বাস্তবে করতে গেলেও সৎ নিয়্যত থাকা দরকার। যা কিছু সে বিশ্বাস করে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন বাস্তব কাজেকর্মে আচার আচরণেও ঘটাতে হবে। অপরদিকে অন্যদের প্রতিও সুদৃষ্টি এবং ভালোবাসা থাকতে হবে যাতে তাদের অনুভূতিগুলিও উপলব্ধি করা যায় এবং সহানুভূতি জানানো সম্ভব হয়।

রক্তের সম্পর্ক কিংবা স্বজনের ক্ষেত্রে এই সহানুভূতি যে অবলীলায় কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিকভাব। পবিত্র কুরআনের সূরা কাসাসে এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন: ওদিকে মূসার মায়ের মন অস্থির হয়ে পড়েছিল। সন্তান ছাড়া তার মনে আর কোনোকিছুই যেন অবশিষ্ট ছিল না। যদি আমরা তার মন আশা ও ঈমান দিয়ে সুদৃঢ় না করে দিতাম, তাহলে সে তার রহস্য প্রকাশ করে দেওয়ার অবস্থায় প্রায় চলে গিয়েছিল।
প্রতিপক্ষের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং তার কথা শোনার মধ্য দিয়ে আন্তরিকতা ও অনুভূতি বৃদ্ধি পায়। যদি প্রতিপক্ষের কথা শোনার ক্ষেত্রে বারবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় কিংবা তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় তুমি ই-মেইল দেখো তাহলে প্রতিপক্ষের প্রতি কোনোরকম মনোযোগ আকৃষ্ট হবে না। এ কারণে কিছু কিছু শৃঙ্খলা, কৌশল ও আচরণ শেখার প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো শিখলে সহকর্মী, পরিচালক, বন্ধু কিংবা সঙ্গী হিসেবে অন্যদের সাথে সহানুভূতি ও আন্তরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।
কারো সমস্যা উপলব্ধি করা সম্ভব হলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে কিছু বলতে যাওয়ার দরকার নেই বরং বলা ভালো একদম কোনোরকম প্রেসক্রিপশন দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। তুমি তাকে বুঝতে দিতে পারো যে তার প্রতি তোমার সহানুভূতিপূর্ণ মন রয়েছে, তুমি তার হিতৈষী কিন্তু তা সত্ত্বেও তুমি কোনো সাহায্য করতে পারছো না। কুরআনের আয়াতসহ বহু বর্ণনায় এসেছে যে রাসুলে খোদা (সা) অন্যদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও অন্তরের টান থেকেই তিনি এই মনোযোগ দিতেন এবং সেইসঙ্গে এর মাধ্যমে তিনি শত্রুদের ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টির সুযোগ নষ্ট করে দিতেন। সুতরাং আন্তরিক সহানুভূতি ক্ষেত্রে আমরা ভালো ও মনোযোগী শ্রোতা হবার চেষ্টা করবো। শ্রোতা যেন বুঝতে পারে আমরা তার বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে উপলব্ধি করছি। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সততা বজায় রাখতে হবে। অহংকারী হওয়া যাবে না। সদাচারী হতে হবে। সহানুভূতিশলি হওয়ার চর্চা করার মধ্য দিয়ে আসুন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈশিষ্ট্যটি আমরা রপ্ত করার চেষ্টা করি।
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৭