অক্টোবর ২৪, ২০১৭ ২০:২৬ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুটি বড় রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমঝোতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামী নির্বাচন নিয়ে দল দুটির মধ্যে দুরকমের দুর্বলতা রয়েছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ডেইলি নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি কৌশল অবলম্বন করতে পারেন তাহলে দুটি বড় দল এবং তাদের জোটের পক্ষে যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটা করা সম্ভব।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান:  জনাব নূরুল কবির, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর আগেও এরকম সংলাপ হয়েছে। কিন্তু আপনার কী মনে হয়- সংলাপের ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায়?

নূরুল কবির: দেখুন, সংলাপে পরিষ্কারভাবে একটা বিষয় বোঝা গেছে সেটি হচ্ছে দুটো বিবদমান রাজনৈতিক দল তাদের নিজ নিজ অবস্থানের কথা জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদেরকে একত্রিত করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সংলাপ করেছে কিন্তু দুটো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার মতো কোনো আশ্বাস প্রধান নির্বাচন কমিশন  এখনও পান নি। তারা যে যার অবস্থানকে পুনর্ব্যক্ত করেছে।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও  বিএনপির যে সংলাপ হলো সে সম্পর্কে কী বলবেন?

নূরুল কবির: দেখুন, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে সংলাপ করেছে তাতে তিনটি প্রধান বিরোধের জায়গা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

দুটো দলের মধ্যে প্রথম বিরোধের জায়গাটা হচ্ছে-সরকারি দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করতে চায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বলেছে, যে নামেই হোক না কেন আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য যেকোনো দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। এখানে দুপক্ষের মধ্যে একটা ভীষণ দূরত্ব রয়েছে।

দ্বিতীয় বিরোধের বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং তাদেরকে বিচারিক ক্ষমতা দিতে হবে বলে প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের প্রস্তাবে এর বিরোধীতা করেছে।

তৃতীয় বিরোধের জায়গাটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চাইছে ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম বা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে- যেখানে বিশ্বের বহু দেশে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এরইমধ্যে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেছে। ফলে তারা ইভিএম পদ্ধতি মানতে রাজি নয়। অন্যান্য প্রস্তাবনার কথা না হয় বাদই দিলাম। উল্লেখিত তিনটি বিষয়ে যে প্রকট মতপার্থক্য রয়েছে সে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা গেছে।

রেডিও তেহরান:  আচ্ছা সংলাপ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন?

নূরুল কবির: দেখুন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন পরিচালনার বিষয় সংবিধানে যেভাবে উল্লেখ আছে-তার ভিত্তিতে দুটো বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর করে নির্বাচন কমিশন কিভাবে নির্বাচন করবেন, কিভাবে তাদেরকে একত্রিত করবেন সেটা এখন বলা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে বিষয়টি দেখবার বিষয়।

রেডিও তেহরান:  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে তিনটি মৌলিক বিরোধীতার কথা আপনি বললেন- তাহলে শেষ পর্যন্ত পরিণতি কী হবে বলে মনে করেন।

নূরুল কবির: দেখুন, পরিণতির বিষয়টি নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞা ও দক্ষতার ওপর। এর বাইরে অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে সমাজের অপরাপর সংগঠন আছে তাদের সবার প্রচেষ্টার ওপরও নির্ভর করবে।

তবে প্রথমেই নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞা ও দক্ষতার কথা বলার কারণ হচ্ছে-  নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুটো বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে দুধরনের দুর্বলতা রয়েছে। যেমন ধরুন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে-নির্বাচন বলে দাবি করে। অথচ সব  বিরোধী রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচনকে বয়কট করেছিল। আর সেই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ কিন্তু সেই ক্ষমতার আসার মধ্যে রাজনৈতিক ন্যায্যতা নেই সেকথাটা আওয়ামী লীগ ঘরে-বাইরে টের পায়। তারা ঘরে বাইরে ওই নির্বাচন নিয়ে যাই বলুক না কেন। ফলে তারা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময় নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব না। এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতরকার একটা অন্তর্গত দুর্বলতা।

অন্যদিকে, বিএনপিরও  ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একট দুর্বলতা রয়েছে। তারা নীল নকশার নির্বাচন বলে সেময় নির্বাচন বয়কট করেছিল। তবে নির্বাচন বয়কটের পর বাংলাদেশেরা রাজনীতিতে যে ধরনের ট্রেডিশন ছিল অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে ন্যায্যতা নেই এমন একটি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিভাবে চাপ প্রয়োগ করে নতুন নির্বাচনে বাধ্য করার যে সামর্থ্য সেটা এই দলটি দেখাতে পারে নি। এ বিষয়টি বিএনপি বুঝতে পেরেছে। তাদের যতই জন সমর্থন থাকুক না কেন তাদের সেই সাংগঠনিক শক্তি এবং সাহস- এ দুটোই তারা দেখাতে পারে নি। ফলে এবারও তারা হুট করে নির্বাচন বয়কট করবে এমনটি মনে করার খুব একটা কারণ নেই। আবার আওয়ামী লীগও আগের মতো নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চাইবে এটাও বিশ্বাস করার মতো কারণ নেই।

দুটি দলের এই দুটি দুর্বলতা শনাক্ত করা প্রয়োজন। আর এটি যদি নির্বাচন কমিশন করতে পারে তাহলে একটা মাঝামাঝি অবস্থায় নিয়ে আসার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা, জনাব নূরুল কবির, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যে কথা আপনি বললেন-সেক্ষেত্রে তো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দূরত্ব। তো তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার জায়গায় কী তারা যেতে পারবে বলে আপনি মনে করেন।

নূরুল কবির: দেখুন, সেটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংগঠনিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করবে। বড় দুটো রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

দুটো দলেরই তাদের নিজেদের প্রয়োজনে নির্বাচনে আসার একটা বাধ্যবাধকতা আছে বলে আমি মনে করি। বিএনপির টিকে থাকার সমস্যা। আর সেই টিকে থাকার মধ্য দিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে এমনটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট সুযোগ আছে যে তারা নির্বাচনে জয়লাভ করবে। আওয়ামী লীগের দিক থেকেও তাদের যে বৈধতার সংকট রয়েছে সেটা কাটিয়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার জন্য ২০১৪ সালের মতো একই ঘটনা আর ঘটাতে চাইবে না। ফলে এই জায়গাটাই হচ্ছে সমঝোতার জায়গা। পরস্পরকে  কৌশলগত কারণে হলেও কিছুটা ছাড় দিতে তারা প্রস্তুত থাকবে। সেই জায়গাটাকে এক্সপ্লয়েট করার দক্ষতা এবং যোগ্যতা যদি নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারে তাহলে সেটা ভালো হবে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা হচ্ছে- আমরা পত্রপত্রিকায় বা মিডিয়ার খবরে দেখেছি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের একটি রাজনৈতিক পূর্বপরিচয় আছে। তবে এটা দোষের কিছু নয়। এদেশের অধিকাংশ ব্যক্তিদের ছাত্র জীবনে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। আর ওই জেনারেশনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

তবে এখানে প্রশ্নটি হচ্ছে একটি সাংবিধানিক পদে  দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর নিজস্ব চ্যালেঞ্জ হচ্ছে-তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি তার পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব করছেন না কিংবা প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রতি কোনো বৈরীতাও দেখাচ্ছেন না। এটা যদি তিনি দেখানে পারেন এবং কৌশল অবলম্বন করতে পারেন তাহলে দুটি বড় দলের পক্ষে বা দুটি বড় জোটের পক্ষে যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেটা করা সম্ভব।

রেডিও তেহরান:  আমরা সবশেষে আপনার কাছে যে বিষয়টি জানতে চাইব সেটি হচ্ছে-বিভিন্ন সময় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আপনার কী মনে হয় কমিশন সম্পর্কে সে প্রশ্ন এখনো বহাল আছে?

নূরুল কবির: দেখুন, বাংলাদেশের সংবিধানে যে পরিমাণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এমন ক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়ার বহু কমিশনের নেই। কারণ নির্বাচনের সময় পরিষ্কারভাবে বলা আছে নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রের যে নির্বাহী শাখা তারা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। অথচ আমাদের এখানে বরাবরই এ ব্যাপারে যে সমস্যা দেখেছি সেটি হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের সাংগঠনিক ক্ষমতা ব্যবহারের চেয়েও কখনও কখনও নির্বাচন কমিশনারগণ তাদের আপন আপন নৈতিক দুর্বলতা দেখিয়েছেন। তাঁরা এই দল বা সেই দলের প্রতি তাদের আনুগত্যের কারণে যে ক্ষমতা কাগজে কলমে দেয়া হয়েছে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেন না বা করতে পারেন না। এটি হচ্ছে ব্যক্তিত্ব এবং নৈতিক মূল্যবোধ আকড়ে থাকার বিষয়। আর এ ব্যাপারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারগুলোকেও আমরা লক্ষ্য করেছি যে সার্চ কমিটি করে নির্বাচন কমিশন গঠন করছে। নানাভাবে দুর্বল নৈতিকতার লোকদেরকে খুঁজে বের করতে পছন্দ করে সরকার যাতে তোদেরকে রাজনৈতিভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়। সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যদি এই সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করেন যে তারা যা পেয়েছে তা যথেষ্ট, তাদের জীবন তারা যাপন করেছেন অর্থাৎ তাদের আর কিছু পাবার নেই মানুষের প্রশংসা এবং উপকার করা ছাড়া। একটা সুন্দর নির্বাচন করার মধ্যদিয়ে নির্বাচন কমিশনাররা সেই কাজ করতে পারেন। আর সেই ক্ষমতাও তাদের রয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে তাঁরা নৈতিকতা বজায় রেখে বাস্তবে সেই কাজটি করার যোগ্যতা তারা প্রদর্শন করতে পারবেন কি না?#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪