নভেম্বর ২৭, ২০১৭ ১৭:৩৬ Asia/Dhaka
  • ‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’: ইরানি জ্যোতির্বিদ গিয়াসউদ্দিন জামশিদের অবদান (৪)

বিখ্যাত ইরানি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির পরিচিতি এবং অবদান তুলে ধরতে গিয়ে আমরা বলেছিলাম তার জন্ম হয়েছিল ইরানের কাশান শহরে ৭৯০ হিজরির দিকে।

জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে তার একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘জিজে খ’কানি’ বা খ’কানির সারণী। এ বইটি তিনি উপহার দিয়েছিলেন তৈমুর লংয়ের নাতি সুলতান উলুগ বেগকে। এরপর সুলতান উলুগ বেগ এই বিজ্ঞানীকে সমরকন্দে আসার আমন্ত্রণ জানান।  জামশিদ কাশানি সে যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত এই শহরে এসে বেশ কয়েকটি মূল্যবান বই লিখেছেন। এর পাশাপাশি তিনি সমরকন্দে একটি বিজ্ঞান গবেষণাগার ও মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্র নির্মাণে প্রধান ভূমিকা রাখেন। তিনি এই কেন্দ্র পরিচালনার নানা পদক্ষেপ শুরুও করেছিলেন। অবশেষে ৮৩২ হিজরির ১৯ রমজান মাত্র ৪২ বছর বয়সে ওই মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্রের ভেতরেই অজ্ঞাত-পরিচয় সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন এই মহান বিজ্ঞানী।

সম্ভবত উলুগ বেগের নির্দেশেই অজ্ঞাত-পরিচয় সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যা করে।

 

মহান ইরানি বিজ্ঞানী জামশিদ কাশানি নিহত হওয়ার পর সমরকন্দের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র ও মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্রটির তৎপরতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং এক্ষেত্রে সমরকন্দ হারিয়ে ফেলে তার অতীতের খ্যাতি ও গৌরব যা আর কখনও ফিরে আসেনি।  

 

গণিত শাস্ত্রে গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির অনন্য কিছু উদ্ভাবনের কথা স্বীকার করেন সব গবেষক। তাদের মতে কাশানি ছিলেন একজন সৃষ্টিশীল উদ্ভাবক, বিচক্ষণ ও বড় মাপের সমালোচক এবং অতীতের গণিতবিদদের অবদানের বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তাদের মতে কাশানি গণনার ক্ষেত্রে ও গণিতের নানা সমস্যা সমাধানের প্রায় নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কারে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।  আর তাই কাশানি ইসলামী যুগের অন্যতম সেরা বা শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদ। কাশানি গণিতে বেশ কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। ষোলো অংক পর্যন্ত দশমাংশ সংখ্যা গণনা এবং নানা ধরনের দশমিক ভগ্নাংশ চালু ও পরিচিত করা তার  অমূল্য অবদান।  

 

গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির যুগে জ্যোতির্বিদদের অনেকেই জ্যোতিষি-চর্চা বা গণক-বৃত্তির মত কুসংস্কার চর্চায় লিপ্ত হলেও কাশানি এইসব লাভজনক ও রমরমা ব্যবসা থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রেখেছিলেন।

 

জ্যোতির্বিদ্যায় অনেক উদ্ভাবনের জনক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি। গ্রহ-নক্ষত্র বিষয়ক নানা পরিমাপ যেমন, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান,  দ্রাঘিমা রেখা ও নিরক্ষ রেখার মত বিষয়গুলোর মাপ নেয়ার জন্য একটি বিশেষ যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন কাশানি। তিনি এই যন্ত্রের নাম দিয়েছিলেন ‘এলাকার পরিমাপক থালা’ বা ‘তাবাকুল মানাত্বেক্ব’। এই যন্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য  তিনি ‘নুজহাল হাদায়েক্ব’ বা ‘প্রফুল্লতার বাগান’ নামের একটি বই লেখেন। গবেষকরা এ ব্যাপারে একমত যে কেপলারের দুই’শ বছর আগেই কাশানি চাঁদ ও বুধ গ্রহকে  ডিম্বাকৃতির বলে উল্লেখ করেছিলেন।

 

মাত্র ৪২ বছরের জীবনে বিশ্বখ্যাত ইরানি বিজ্ঞানী গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি বিশ্বকে দিয়ে গেছেন অনেক কিছু। তার ‘সুল্লামুস সামা’ বা ‘আকাশের সিঁড়ি’ শীর্ষক বইটি এক অনন্য কীর্তি। আরবিতে লেখা বিশ্বকোষ-জাতীয় এ বইটি ‘রিসালাতুল কামালিয়া’ নামেও পরিচিত। কাশানি বইটি লেখা শেষ করেন ৮০৯ হিজরিতে বা ১৪০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ। বলা হয় এ বইটি তিনি কামালউদ্দিন মাহমুদ নামের এক মন্ত্রীর নামে উৎসর্গ করেছিলেন। ‘আকাশের সিঁড়ি’ শীর্ষক বইয়ে কাশানি পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের ব্যাসসহ অন্য অনেক গ্রহ-নক্ষত্রের নানা পরিমাপ এবং পৃথিবী থেকে সেগুলোর দূরত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আকাশে নানা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সেসবের নানা দিক নিয়ে যেসব মতপার্থক্য আছে তা দূর করার উদ্দেশ্যেই এ বইটি লেখার কথা উল্লেখ করেছেন জামশিদ কাশানি।

 

গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই হল ‘মুখতাসার দার এলমে হায়াত’ তথা ‘সংক্ষিপ্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান’। বইটি তিনি লিখেছিলেন ফার্সি ভাষায়। কাশানি এ বই লেখা শেষ করেন হিজরি ৮১৩ সনে বা তারও কিছু আগে। তিনি বইটি উৎসর্গ করেছিলেন মির্জা ইস্কান্দার বাহাদুর খানের নামে। ইনি ছিলেন ফার্স ও ইস্ফাহানের শাসক। কাশানি এ বইয়ে চাঁদ ও সূর্যসহ নানা গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

 

‘জিজে খ’কানি’ বা খ’কানি’র সারণী কাশানির আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম। খাজা নাসিরউদ্দিন তুসির লেখা ‘জিজে ইলখানি বা ইলখানির সারণী’ বইটিকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্যই বইটি লিখেছেন তিনি। বইটি লেখা শেষ হয় হিজরি ৮১৬ সনে। কাশানি তার এ বইটি উৎসর্গ করেন সুলতান উলুগ বেগের নামে। খ’কানি’র সারণী লেখা হয়েছে ফার্সি ভাষায়। পঞ্জিকা, ত্রিকোনোমিতি, গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা এবং গ্রহ-নক্ষত্রের নানা নিয়ম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ছয় অধ্যায়ের এ বইটিতে। উলুগ বেগ এ বইটির ভিত্তিতেই লিখেছিলেন নিজস্ব বই ‘জিজে উলুগ বেগ’ বা ‘উলুগ বেগের সারণী’। এ বইয়ে বিধৃত কাশানির গণনার পদ্ধতি পরবর্তীতে তার লেখা পাটি গণিত ও ত্রিকোনোমিতির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

 

জ্যোতির্বিদ্যার ‘জিজ’ বা ‘সারণী’ নামের বইগুলোতে থাকতো  গ্রহ-নক্ষত্রসহ মহাকাশের বস্তুগুলোর অবস্থান সম্পর্কিত নানা তথ্য। যেমন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের উদয় ও অস্ত যাওয়ার সময়সহ সেসবের স্থান-ইত্যাদি সারনীর আকারে লেখা থাকতো। এ ধরনের বইয়ের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দিন ও রাতের সময় নির্ধারণ, পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার তৈরি করা, গ্রহ-নক্ষত্রসহ আকাশের নানা বস্তু পর্যবেক্ষণ করা হত। এ ছাড়াও দিক-নির্ণয়ের মত মহাকাশ সম্পর্কিত নানা কাজ করা হত ‘জিজ’ দিয়ে।

 

অতীতে প্রত্যেক বড় জ্যোতির্বিদ কিংবা প্রত্যেক বড় মহাকাশ পর্যবেক্ষন কেন্দ্রের থাকতো জ্যোতির্বিদ্যার নিজস্ব সারণী এবং এভাবে অতীতের এ সংক্রান্ত সারণীগুলোকে সংশোধন করা হত। এইসব সারণীর কোনো কোনোটির নাম রাখা হত রাজা-বাদশাহ বা শাসকদের নামে। এইসব সারণীর কোনো কোনো কপি এখনও জাদুঘরগুলোতে দেখা যায়। এমনকি আধুনিক এই যুগেও সেইসব প্রাচীন সারণীর মত বই বা সারণী ব্যবহার করা হয় মহাকাশ এবং বিজ্ঞান সম্পর্কিত নানা তৎপরতায়। তবে বর্তমান যুগের এইসব সারণী অনেক বেশি ত্রুটিমুক্ত। আরবিতে ‘জিজ’ শব্দটি সম্ভবত মধ্যযুগীয় ফার্সি শব্দ ‘জিগ’ থেকে এসেছে যার অর্থ তারকা সম্পর্কিত তালিকা বা সারণী কিংবা পঞ্জিকা।

 

‘মহাকাশ পর্যবেক্ষণ-সামগ্রীর বর্ণনা সংক্রান্ত গবেষণা-পত্র’ বা ‘রিসালেহ দার শারহে আলাতে রাসাদ’  গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই। বইটি তিনি লিখেছেন হিজরি ৮১৬ সালে বা খ্রিস্টিয় ১৪১৬ সনের জানুয়ারি মাসে। ফার্সি ভাষায় লেখা এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ইস্ফাহানের শাসক সুলতান ইস্কান্দারের নামে। কাশানি বইটি সম্ভবত ইস্ফাহানে লিখেছিলেন। এতে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত নিজের আবিষ্কৃত ৮ টি যন্ত্রের পরিচিতি, সেগুলো তৈরির পদ্ধতি ও ব্যবহার সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এ বইটির পর প্রায় একই সময়ে তথা ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি কাশানি তার ‘প্রফুল্লতার বাগান’ বা ‘নুজহাল হাদায়েক্ব’ নামের বইটি লেখা সম্পন্ন করেন।  তিনি এ বইটিতেও নিজের আবিষ্কৃত মহাকাশ পর্যবেক্ষন সংক্রান্ত কয়েকটি যন্ত্রের পরিচিতি ও সেসব তৈরির পদ্ধতি তুলে ধরেন। কাশানি এ দু’টি বইয়ের সংযোজনীতে মহাকাশ সংক্রান্ত কয়েকটি পরিমাপ ও পর্যবেক্ষনের ফলাফল তুলে ধরেন এবং চাঁদ ও বুধ গ্রহ যে ডিম্বাকৃতির তা উল্লেখ করেন।

 

 কাশানি তার ‘প্রফুল্লতার বাগান’ বা ‘নুজহাল হাদায়েক্ব’ নামের বইয়ে ‘এলাকার পরিমাপক থালা’ বা ‘তাবাকুল মানাত্বেক্ব’ নামক যন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার আবিষ্কৃত এই যন্ত্রের মাধ্যমে চাঁদ ও সূর্য এবং আরও ৫টি গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং পৃথিবী থেকে সেগুলোর দূরত্ব দেখানো যায়। এ ছাড়াও দেখানো যায় কখন চন্দ্র ও সূর্য-গ্রহণ ঘটবে।  বইটির শেষাংশে কাশানি তার আবিষ্কৃত যন্ত্র ‘সংযোজক বোর্ড’ বা ‘লওহে এত্ত্বেসালাত’ সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন।

 

জামশিদ কাশানি গণিত বিষয়েও কয়েকটি অমর বই রেখে গেছেন। তিনি ‘রিসালা আল মুহিত্বিইয়া’ বা ‘বৃত্তের পরিধি সম্পর্কে গবেষণা-পত্র’ শীর্ষক বইটি লেখা সম্পন্ন করেন ৮২৭ হিজরিতে।  কাশানি আরবি ভাষায় এ বইটি লিখেছিলেন সমরকন্দে। অত্যন্ত মূল্যবান এ বইয়ে তিনি বৃত্তীয় পরিমাপ বিষয়ে কালোত্তীর্ণ নানা পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। গণিতের ইতিহাস বিষয়ক ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞরা এ বইটিকে গণিত শাস্ত্রের এক মহামূল্য কর্ম ও সম্পদ বলে অভিহিত করেছেন। এ বইয়ে তুলে ধরা গণনার পদ্ধতিগুলো এতই সহজ যে সেসব দিয়ে বর্গমূলের সীমানা অতিক্রম না করেও  নির্ভুল ফল বের করা যায়।

 

জামশিদ কাশানির গণিত বিষয়ক আরেকটি অমর কীর্তি হল ‘মিফতাহুল হিসাব’ বা ‘পাটিগণিতের চাবি’ শীর্ষক বই। বইটি লিখতে তার ছয় বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। কাশানি বইটি ৮৩০ হিজরিতে সমরকন্দে সম্রাট উলুগ বেগের নামে উৎসর্গ করেন। ছাত্রদের জন্য একটি পাঠ্য বইয়ের স্টাইলে তিনি এ বইটি লিখেছিলেন। আরবি ভাষায় লেখা তার এ বইটি স্কুলগুলো ছাড়াও অতীতের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতেও পাঠ্য বই হিসেবে পড়ানো হত। অবশ্য শেখ বাহাই-এর বই ‘পাটিগণিত সারাংশ’ বা ‘খুলাসা আল হিসাব’-এর পরই ছিল এর স্থান। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৭