ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ ১৮:৪০ Asia/Dhaka

মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের অভাবে দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার ফলে ক্ষতি হচ্ছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য থাকলে দুর্ভোগ কমে আসত। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন নাসির মাহমুদ।

রেডিও তেহরান: জনাব ফয়েজ আহমেদ ভুঁইয়া, আপনি ইরানের ইসলামি ঐক্য সপ্তায় অংশগ্রহণের জন্যই তেহরান সফরে এসেছেন। তো আপনার কাছে প্রথমে জানতে চাইব-মুসলামানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য এতসব আয়োজন, তো এর গুরুত্ব আসলে কতটা?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে এবং যাঁরা মুসলমান তাঁদের দৃষ্টিতে আমি বলব-মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য হওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্নস্থানে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। যদি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য থাকল তাহলে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দুর্ভোগ কমে আসত।

রেডিও তেহরান: আপনি মুসলমানদের ওপর আসলে কী ধরনের  দুর্ভোগের কথা বলতে চাইছেন?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: দেখুন মুসলমানদের দুর্ভোগ বলতে আমি বলতে চেয়েছি-বিশ্বের কোথায় কোথাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। কোথাও কোথাও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। সুনির্দিষ্ট কোনো ইস্যুতে দেখা যাচ্ছে-মুসলমানরা ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারছে না। দেখা যাচ্ছে কোনো একটি মুসলিম দেশ একটি পক্ষকে সমর্থন জানাচ্ছে আবার  আরেকটি মুসলিম দেশ সমর্থন জানাচ্ছে ভিন্ন একটি পক্ষ বা শক্তিকে। এরফলে মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের ক্ষতি হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা, এই যে মধ্যপ্রাচ্যে যুগযুগ ধরে ধরে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই আছে। যারা যুদ্ধ করছে কিংবা যাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে উভয় পক্ষই কিন্তু নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করছে। তারমানে যুদ্ধটা আসলে হচ্ছে মুসলমানদের সঙ্গে মুসলমানের। এটাও অনৈক্যের কারণে হচ্ছে বলে মনে করা হয়। তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই অনৈক্যটা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় বলে আপনি মনে করেন।

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যের বিষয়টি দেখা যায় অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯১৮ সালে যে 'বেলফোর' চুক্তি হয়েছিল সেখানেই মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে দেয়া হয়, একটা বিভাজন সৃষ্টি করে দেয়া হয়। তারপরও মুসলমানদের মধ্যে একটা ঐক্যের জায়গা ছিল সেটা হচ্ছে ফিলিস্তিন। সবাই ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকবে এই ঐক্যটা তখন ছিল। পররবর্তীতে বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহের পর দেখা গেল 'ক্যাম্প ডেভিডে'র মাধ্যমে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেই বিভক্তি চলছেই। ফিলিস্তিনের যেসব ইসলামি সংগঠন আছে তাদের মধ্যেও সেরকম ভূমিকা দেখা যায় না। আর সেকারণেই একথা অবশ্যই বলা যায় যে, যদি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য থাকে তাহলে তাদের পূর্বের যে জৌলুস ছিল সেটা আবার ফিরে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

রেডিও তেহরান: অনেকেই এই অনৈক্যের জন্য আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোকে দায়ী করতে চায়। এইযে মুসলিম বিশ্বে শিয়া সুন্নি ইত্যাদি বলে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ রেখা টেনে দিচ্ছে এবং এই বিভেদ তারা জিইয়ে রাখার পক্ষপাতি এটাও সেই সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র বলে মনে করা হয়। এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: দেখুন, আল্লাহর কুরআন ও সুন্নাহ এক। তবে পরবর্তীতে ব্যাখ্যাগত কারণে মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। তবে সেটাকে বড় করে দেখা উচিত নয়। বড় কিছুর জন্য মানুষ উইন উইন অবস্থানে যেতে ঐক্যে যায়। ফলে আমি মনে করি মুসলমানদের সেই ঐক্যের মধ্যে আসা উচিত। বিভাজন যা হয়ে গেছে সেটাকে ধরে নিয়েই মুসলমান হিসাবে কুরআন সুন্নাহর আলোকে ঐক্য হলে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরান: জনাব ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়ায় তাকফিরি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএসআইএলসহ আরো অনেক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এসব গোষ্ঠী নিজেদেরকেই শুধু মুসলিম বলে দাবি করে। যারা তাদের মতের বাইরে যাবে তাদেরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করে।

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: জ্বি আপনি যথার্থই প্রশ্ন করেছেন। এ ধরনের কিছু শিক্ষা মুসলিম নামধারী কিছু সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে দেয়া হয়ে থাকে। এমনও বলতে শোনা যায়- ধরুন কোনো নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে বলা হয়- তুমি যদি কাজটা কর তাহলে তুমি বেহেশতে যাবে। এই বেহেশতের টিকিট তোমার হাতে দিলাম। এরকম অবস্থা থেকে আমি মনে করি মুসলমানদের শিক্ষার মধ্যে কোথাও ক্রটি আছে। পবিত্র কুরআনের আয়াত কিংবা হাদিস একই আছে তবে ইন্টারপ্রিটেশনটা একেক ব্যক্তি একেকরকম করেছেন বিধায় এই বিভাজনগুলো পরিলক্ষিত হয়। 

রেডিও তেহরান: আচ্ছা, এই বিভাজন কাটিয়ে ওটা যাবে কিভাবে?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: এই যে ইরানে  প্রতিবছর ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো থেকে এবারও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাজধানী তেহরানে তিন দিনব্যাপী আন্তজাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনে হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের ৫২০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, মন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছেন। এই ঐক্য সম্মেলনের ডাক দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে একটা নিউ সিভিলাইজেশন গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। এরমাধ্যমে হয়ত কোনো একদিন মুসলমানদের মধ্যে সেই ঐক্য হয়ে যাবে। তখন আবার মুসলিম ঐতিহ্য ফিরে আসবে।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা ইরানের ইসলামি ব্প্লিবের রুপকার ইমাম খোমেনী (র.) বলেছিলেন যে, যারা শিয়া এবং সুন্নির দেয়াল তুলতে চায় তারা আসলে শিয়াও নয়; সুন্নিও নয়।

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: দেখুন, আমার ঘরে যদি দুর্বলতা থাকে তাহলে বাইরের শক্তি তো সুযোগ নিতে চাইবে। আমি প্রথম দিকে আমার আলোচনায় বলেছি 'অটোম্যান' সাম্রাজ্যের যারা অধিপতি ছিলেন একদিকে সমগ্র ইউরোপ এদিকে মিশরও শাসন করেছেন। ফলে ইউরোপীয় সভ্যতা এবং সেখানকার শাসকরা তো এটা পছন্দ করবেনই। সুযোগ পেলে তারা তো সুযোগ নেবেই। শক্রর সাথে তো বন্ধুত্ব হবে না। আমি যখন আপনাকে শক্র মনে করব তখন আপনিও তো সুযোগ পেলে সে সুযোগ নেবেন। আর সেক্ষেত্রে মুসলমানদের তো সেভাবেই সতর্ক থাকা উচিত।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক খুবই ভালো বলে আমি মনে করি। আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইরানের সাংস্কৃতিক বিষয়সহ বেশ কিছু ব্যাপারে চুক্তি রয়েছে। ফলে আমি মনে করি খু ভালো সম্পর্ক রয়েছে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা সম্পর্ক বৃদ্ধি করার ব্যাপারে কী আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে?

ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া: দেখুন, সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্যই আমরা এই যে বাংলাদেশ থেকে ঐক্য সম্মেলনে এসেছি। ইরানও আমাদের ওখানে যাবে। বাংলাদেশ তো অনেকটা উদার অনেক ব্যাপারে। ইরান সম্পর্কে বাংলাদেশে একটা ধারনা আছে যে এখানে গান-বাজনা বা সাস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তেমন নেই। কিন্তু আমি তো দেখলাম এখানে সাংস্কৃতির এসব বিষয় আমাদের চেয়ে বেশি। ফলে যদি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন বিষয় যদি পরস্পরের মধ্যে আদান প্রদান হয় তাহলে আমার মনে হয় সম্পর্ক আরো ভালো হবে।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৩