"ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত"
ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। শুধু ক্লোজ করার মাধ্যমে অভিযোগের সমাপ্তি টানার চেষ্টা করা ভুল হবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন।
তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে একের পর এক নানা অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক, অর্থ এবং আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব নুর খান লিটন, সম্প্রতি বাংলাদেশে পুলিশের উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে নানা কেলেংকারির কথা বের হয়েছে। ঘটনার এক পর্যায়ে তাকে সদরদপ্তরে ক্লোজ করা হয়েছে। এই যে ক্লোজ করা -একে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নুর খান লিটন: দেখুন, একজন উচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন নৈতিক স্খলনের অভিযোগ আসে বিশেষ করে প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে কাউকে বিয়ে করা অথবা জোর করে কোনো নারীকে বিয়ে করা যেকোনো বিবেচনায় এ দুটো বিষয় আইনের চোখে অপরাধ।
আর এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যখন কোনো উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত থাকেন তখন বিষয়টির তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এখানে সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। আর এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজ করার মাধ্যমে এ ঘটনার সমাপ্তি টানার চেষ্টা করাও ভুল হবে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ক্লোজ করা হলেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
তবে এখানে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। পত্রপত্রিকায় বা মিডিয়ায় এ ব্যাপারে যা উঠে এসেছে তার যদি সত্যতা থাকে তাহলে এ ব্যাপারে খুব বেশি সময় নেয়াটা তদন্তকারী সংস্থার ঠিক হবে না। কারণ বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানারকম প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। যেহেতু পুলিশের হাতে জনগণের জান-মালের বিষয়টি রয়েছে আর খোদ রাজধানীতে সেই পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকতার নারীঘটিত অপরাধ এবং নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত এবং নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে সে ব্যাপারে অনেক তথ্য প্রমাণও উঠে এসেছে। সেক্ষেত্রে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ না করে শুধুমাত্র ক্লোজ করলেই হবে না তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন শুধু মিজানুর রহমান নন, পুলিশের অনেক কর্মকর্তা অনৈতিক ও অমানবিক কাজের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের শাস্তি হওয়া জরুরি। আপনি কী মনে করেন?
নুর খান লিটন: হ্যাঁ আমিও তাই মনে করি। দেখুন, এর আগে একবার আমরা সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখলাম এক পুলিশ কর্মকর্তা ব্যাংক থেকে ১ কোটি টাকা তুলল আর সেটা ঘুষের টাকা ছিল এবং জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছিল। আর এ ব্যাপারে সেই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগও ছিল। কিন্তু পরে দেখলাম সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে এসপি হিসেবে একটি জেলায় পাঠানো হয়েছে। ফলে এধরনের ঘটনায় কেবলমাত্র ক্লোজ করা বা ট্রান্সফার করার মধ্য দিয়ে সমাধান সম্ভব নয় এবং এটা কাম্যও নয়। এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেয়া এবং তার বিচার করা। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তা থেকে পুলিশকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই পুলিশের কাছে।
রেডিও তেহরান: ডিআইজি মিজানের কেলেংকারির পর অনেকে বলছেন, রক্ষক হয়েও পুলিশ এখন ভক্ষকের ভূমিকায়। কী বলবেন এই বক্তব্য সম্পর্কে?
নুর খান লিটন: দেখুন, পুলিশ রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় এ অভিযোগটি নতুন কোনো অভিযোগ নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। আর এসব অভিযোগ মনিটরিংয়ের জন্য যে শক্তিশালী সংস্থা এবং উন্নত পদ্ধতি থাকা দরকার সেটি ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। যেজন্যে এধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটছে এবং এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না। দেখা যায় কখনও কখনও রাজনৈতিক, অর্থ এবং আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে একেক জন অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু খবর বের হয়েছে- ডিআইজি মিজান কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান এবং মিজানের হুমকিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নুর খান লিটন: দেখুন, সমাজে যারা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে তারা ক্ষমতায় এতবেশি অন্ধ হয়ে যায় যে, কখনও কখনও প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা অন্যান্য আদেশ উপদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পর পরই মিজানুর রহমানের হুমকি দেয়ার বিষয়টি শুধু দুর্ভাগ্যজনকই নয় এটা বলা যেতে পারে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের সমান।
রেডিও তেহরান: অনেকে বলছেন, পুলিশের যেসব কর্মকর্তা এর আগে বড় ধরনের ধরনের অপরাধ করেছেন তাদের সঠিক বিচার না হওয়ার কারণে এই অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। আপনার ম্যূলায়ন কী?
নুর খান লিটন: দেখুন, এর আগেও পুলিশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ এসেছে। পুলিশ ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। থানায় একজন ছাত্র নেতাকে ধরে এনে প্রকাশ্যে পেটানোর ঘটনা দেখেছি খুলনায়। এছাড়া সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন সময় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করার অভিযোগ পেয়েছি। দেখা যায় কোনো একটি মামলায় ৫০ জনের নামে মামলা হয়েছে। এর বাইরে হাজার হাজার মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি বলে গণগ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ যাকে তাকে গ্রেফতার করে মামলায় ঢুকিয়ে দেয়ার নামে হয়রানি নির্যাতন করা হয়। এসব অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। যখন এই ধরনের অভিযোগের কথা মিডিয়াতে আসে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি মিলেমিশে সমাজকে একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। আর এরফলে পুলিশের প্রতি এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ক্রমান্বয়ে কমে গেছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২০