'রাতের আকাশ বাঁচাও'
বাবাক আমিন তাফরেশি একটি নাম। তিনি সাধারণভাবে বাবাক তাফরেশি নামে পরিচিত। এই মানুষটির নাম নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাভরা আকাশের কথা মনে হবে অনেকের। তারাভরা আকাশ এবং বাবাক তাফরেশি আজ অনেকের কাছে প্রায় সমাথর্ক হয়ে উঠেছে।
ইরানের রাজধানী তেহরানে জন্মগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা পেশাদার আলোকচিত্রী বাবাক তাফরেশির ছবির প্রধান বিষয়বস্তু হলো রাতের আকাশ। তিনি দ্যা নাইট স্কাই বা সংক্ষেপে টোয়ান নামের সংস্থার পরিচালক এবং প্রতিষ্ঠাতা। রাতের তারাভরা আকাশকে মানুষসৃষ্ট আলোর দূষণ থেকে রক্ষার আন্দোলন করছে এ সংস্থা। এ ছাড়া, অ্যাস্ট্রোনর্মাস উইদাউট বর্ডারস নামের সংস্থার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও তিনি। আমেরিকার বোস্টনে বসবাসকারী এ আলোকচিত্রী সম্প্রতি তেহরানে এসেছিলেন। এখানে রাতের আকাশে আলোকচিত্র গ্রহণ নিয়ে দু'টো কর্মশালাও পরিচালনা করেন তিনি।
ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি রেডিও তেহরানকে ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আর এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং এটি তৈরি করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
রেডিও তেহরান: জনাব, বাবাক তাফরেশি বহু বছর ধরে গ্রহ-নক্ষত্র বিশেষ করে রাতের আকাশের ছবি তুলছেন আপনি। তা কি করে এ ছবি তোলায় আপনি আগ্রহী হলেন?
বাবাক তাফরেশি: যতদূর মনে পড়ে খুব ছোটবেলা থেকেই আমিই রাতের আকাশ দেখে মজা পেয়েছি এবং রাতের আকাশ আমাকে টেনেছে। মনে হয়, রাতের আকাশের প্রতি টান নিয়েই জন্মেছি। তবে ১৩ বছর বয়সে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে দূরবিন এক রাতের জন্য ধার করে আনার পর আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সে সময়ের প্রতিটি মুর্হুতের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ছোট ওই দূরবিন দিয়ে এবড়ো থেবড়ো চন্দ্রপৃষ্ট বিশদভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার চোখকে তখন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সে রাত আমার জীবনের গতি বদলে দেয়। তার পরপরই আমি রাতের আকাশের ছবি তুলতে শুরু করি। অবশ্য প্রথম কয়েক বছর প্রধানত ব্যর্থ হয়েছি। সে সময় রাতের আকাশের ভাল ছবি তুলতেই পারি নি।
আমার বয়স যখন ১৬ বা ১৭ তখন একটি ধুমকেতু উদয় হয়। এ ঘটনা আমার জীবনের একটি মাইলস্টোন হয়ে ওঠে। রাতের আকাশের অনেক ঘটনা আমাকে এর প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তার মধ্যে একটি হলো ধুমকেতুর উদয় এবং অন্যটি হলো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। ১৯৯৫ সালে এটি ঘটে। ইরান থেকে এর শুরু হয় এবং পরে এটি ভারতের দিকে যায়। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১৫ সেকেণ্ড। তা সত্ত্বেও আমার ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল।
রেডিও তেহরান: বাবাক তাফরেশি এ ঘটনার প্রভাব কিভাবে পড়ে আপনার ওপর?
বাবাক তাফরেশি: সেকথাই বলছি। পূর্ণ সূর্যগ্রহণ এবং ধুমকেতুর ঘটনাটির পরই আমি বিজ্ঞান সাংবাদিকতা শুরু করি। ইরানের নজুম বা জ্যোতির্বিদ্যা নামের পত্রিকার সঙ্গে সহযোগিতা করতে থাকি। এরপর টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং মহাকাশ ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে অনুষ্ঠান করতে থাকি। পাশাপাশি আলোকচিত্রের কাজও করতে থাকি।
পেশাদার হিসেবে এ কাজ করি এবং পেশাদার আলোকচিত্রের মেলা করেছি। এ সময়ে আমার মনে একটি ধারণা দানা বেধে ওঠে। তাহলো, রাতের আকাশ কেবলমাত্র জ্যোতির্বিদ্যার গবেষণাগারই নয় এর আরো অনেক ভূমিকা আছে। আমাদের প্রকৃতির ৫০ ভাগই হলো রাতের আকাশ। সে দিক থেকে হিসাব করলে এর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। কেবলমাত্র বিজ্ঞানী নয় বরং পৃথিবীর সবার সঙ্গেই রাতের আকাশে যোগসূত্র রয়েছে। রাতের আকাশের সঙ্গে সবাই অবাধে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে। অবশ্য কতোটা আলো আমরা তৈরি করছি তার দ্বারা এর সঙ্গে যোগসূত্রের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায়, মানুষের কাছে রাতের আকাশের বার্তাকে আমার আলোকচিত্রের মধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আর এর মাধ্যমে এমন একটি পেশার সূচনা হলো যাকে বিশ্বব্যাপী প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এটা হলো 'দ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাট নাইট' বা রাতের বিশ্ব অর্থাৎ টিডিব্লিএএন। রাতের আকাশের প্রতি আগ্রহী, রাতের আকাশ রক্ষায় ত্যাগী মনোভাব সম্পন্ন এবং রাতের আকাশ রক্ষায় লক্ষ্য রয়েছে এমন সব আলোকচিত্রী এর সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। তাদের একটি টিমে পরিণত করা হয়েছে।
রেডিও তেহরান: বাবাক তাফরেশি আপনি যে ধূমকেতুর কথা বললেন, সেটি কি হ্যালির ধুমকেতু?
বাবাক তাফরেশি: হ্যালির ধুমকেতু যখন উদয় হয় সে সময় আমি খুবই ছোট ছিলাম। আমার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। সে সময়ে জ্যোতির্বিদ্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেই নি। আমি হ্যালির ধুমকেতু দেখি নি। আমি যেটি দেখেছিলাম সেটি ছিলো 'হায়াকুতাকে ধূমকেতু'। ১৯৯৬ সালের কথা তখন আমি হাইস্কুলের ছাত্র। সে সময়ে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া, ১৯৯৭ সালে 'কমেট হ্যাল বোপের' উদয় ঘটে। গোটা বিশ্ব থেকে এটি দেখা গেছে। গোটা বিশ্ব এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। বড় বড় প্রায় সব শহর থেকে এটি দেখা গেছে। এ ধূমকেতুর চমৎকার ছবি তুলেছিলাম এবং একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে সেটি ছাপাও হয়েছিল। সম্ভবত এর মধ্য দিয়ে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে আমার জীবনের শুরু হয়।
রেডিও তেহরান: জনাব বাবাক তাফরেশি, রাতের আকাশের ছবি তোলা সত্যিই বেশ কঠিন। তো এজন্য কি দামি ক্যামেরার প্রয়োজন আছে বলে কি আপনি মনে করেন?
বাবাক তাফরেশি: না, ছবি তোলার চ্যালেঞ্জ কেবল ক্যামেরা বা যন্ত্রপাতিকেন্দ্রীক নয়। বরং প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, এমন স্থান খুঁজে বের করা যেখানে মানুষের তৈরি আলোর কোনো দূষণ নেই। উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায় আমাদের গ্রহটিতে আলোর দূষণ প্রতি বছর ২ শতাংশ হারে ঘটছে। আমাদের গ্রহ ক্রমেই রাতে উজ্জ্বল হতে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে আর এতে রাতের আকাশ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এ দিকটি হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জনবহুল দেশে এমনটি ঘটছে। অবশ্য, এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে প্রচুর স্থান আছে সেখান থেকে রাতের আকাশ নির্বিবাদে দেখা যায়। এ ছাড়া, অনেক দেশেই এমন স্থানগুলোকে রাতের আকাশ দেখার জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এ স্থানগুলোকে 'ডার্ক স্কাই পার্ক' 'রাতের আকাশের পার্ক' বলা হয়। এ ধরণের পার্ক করার চিন্তা মাত্র এক দশক আগে শুরু হয়েছে। এ ধারণার প্রসার ঘটিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ডার্ক স্কাই অ্যাসোসিয়েশন। এখন এ ধারণা অন্যান্য দেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে।
রেডিও তেহরান: জনাব বাবাক তাফরেশি, রাতের আকাশের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা নিয়ে প্রশ্ন করাকে কেন্দ্র করে সত্যিকার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরলেন। এখন রাতের আকাশের ছবি তোলার জন্য কি ধরণের ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে?
বাবাক তাফরেশি: রাতের আকাশে ছবি তোলার জন্য দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হবে ক্যামেরা এবং যন্ত্রপাতি। আজকের দিনের যে কোনো ডিএসএলআর ক্যামেরা বা আধা-পেশাদারি মিররলেস ক্যামেরা দিয়ে রাতের আকাশের ছবি তোলা যাবে। লং এক্সপোজার বা দীর্ঘ মেয়াদি এক্সপোজার করা যাবে এবং তাতে 'নয়েজ' নামে পরিচিত কিছু সমস্যা থাকবে না অর্থাৎ ছবিতে অনাকাংখিত সমস্যা থাকবে না তেমন যে কোনো ক্যামেরা দিয়ে রাতের আকাশের ছবি তোলা যাবে।
এ জন্য ১০ থেকে ৩০ সেকেন্ড এক্সপোজার দেয়া লাগবে এবং আইএসও থাকবে ৩২০০ থেকে ৬৪০০। এ ছাড়া ওয়াইড অ্যাংগেল লেন্স লাগবে। অল্প সময়ে সঠিক মাত্রার আলো ধারণের জন্য লেন্সকে ফার্স্ট হতে হবে। অর্থাৎ ওপেন অ্যাপারচার ২.৮ বা তার চেয়ে কম হতে হবে। ক্যামেরা যাতে কোনোভাবে নড়াচড়া না করে সেজন্য শক্ত-সামর্থ ট্রাইপড বা তেপায়ার ওপর রাখতে হবে। অন্ধকার রাতকে সঠিকভাবে পাওয়া গেলে ছবি তোলার জন্য দামী ক্যামেরার কোনো প্রয়োজন নেই। #
(ফিচারের ভেতরের ছবিগুলো তুলেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। আর নিচের রাতের আকাশের অনবদ্য ছবিগুলো বাবাক তাফরেশির নিজের তোলা। তার ওয়েবসাইট থেকে ছবিগুলো অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।)
রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/১৬