মার্কিন ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ইরান এগিয়ে যাচ্ছে: মুনির হুসাইন খান
ইরানের ইসলামি বিপ্ববের গৌরবময় ৩৯ তম বিজয় বার্ষিকী পালিত হয়েছে।তো বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং বিপ্লব পরবর্তী সাফল্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা কথা বলেছি ইরান প্রবাসী বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক জনাব মুনির হুসাইন খানের সঙ্গে। তিনি বললেন সুযোগ্য নেতৃত্ব, ব্যাপক জনসমর্থন ও ইসলামি মতাদর্শের কারণে এখানে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়েছে। আর এগুলো নেই বলেই পৃথিবীর অন্য কোথায় এ ধরনের বিপ্লব সংঘটিত হয় নি। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: আধুনিক যুগে ইসলামি বিপ্লব বিশ্বের অন্য কোনো দেশে না ঘটে ইরানের মতো একটি দেশে কেন ঘটলো? এর কারণ কী?
মুনির হুসাইন খান: যেকোনো বিপ্লব সফল হওয়ার জন্য তিনটি কারণ বিদ্যমান থাকা জরুরি। এ তিনটি কারণ হচ্ছে
(১) সুযোগ্য নেতৃত্ব (২) ব্যাপক জনসমর্থন (৩) মতাদর্শ
আর এ তিনটি কারণ ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল বলেই এখানে বিপ্লব সফল হয়েছে।
বিষয়গুলো যদি ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে আমরা দেখব-
ইমাম খোমেনীর মতো ন্যায়পরায়ণ সুযোগ্য নির্ভীক ফকীহ মুজতাহিদ নেতার নেতৃত্ব ছিল। সমগ্র ইরানি জাতির স্বতস্ফূর্ত সমর্থন ও সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ছিল ইসলামি বিপ্লবে। নেতার প্রতি আনুগত্য এক মহান বৈপ্লবিক আদর্শ এবং দ্বীনি ইসলামের জন্য আত্মত্যাগ ও শাহাদাত, খাঁটি তৌহিদী মুহাম্মাদী বিপ্লবী ইসলাম যা মহানবী(সা.) এর পবিত্র আহলে বাইত (আ.) বিশেষ করে ইমাম হুসাইন (আ.)এর সংগ্রাম, আদর্শ, আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের শিক্ষা ও দর্শনের মধ্য দিয়ে পুরোপুরি বিকশিত ও পরিস্ফুটিত হয়েছে। এ তিনটি কারণ অন্য কোনো মুসলিম দেশে না থাকায় সেসব দেশের কোনো একটিতেও আজ পর্যন্ত ইসলামি বিপ্লব সফল হয় নি।
উল্লেখিত তিনটি কারণের যে কোনো একটির অনুপস্থিতি আসলে এ ধরনের বিপ্লব বিজয়ের পথে অন্তরায় হবেই। আর অন্য যেকোনো মুসলিম দেশের দিকে তাকালে আমরা এ বাস্তব সত্য পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি।
রেডিও তেহরান: ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অব্যাহত নানা সাফল্য বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাফল্যকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মুনির হুসাইন খান: ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সাফল্য বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাফল্যের কারণ হচ্ছে-মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস, স্বনির্ভরতা, সাহস, আত্মবিশ্বাস। এসব বিষয় ইরানি জাতিকে ইসলামি বিপ্লবের সাফল্য এনে দিয়েছে।
ইসলামি বিপ্লব ইরানি জাতির মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের উজ্জীবন ঘটিয়েছে যা যুগের পর যুগ ধরে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর শাহানশাহী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। আর আত্মবিশ্বাস, সাহস, উচ্চ মনোবল ও স্বনির্ভরতা যে কোনো জাতিকে সবক্ষেত্রে সফল করবে। তাই আমি মনে করি যে, ইসলামি বিপ্লবের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার মাধ্যমে ইরানি জাতি যে মনোবল, আস্থা, আত্মবিশ্বাস ও সাহস অর্জন করেছে তা তাদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে।
তাছাড়া পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা এবং নিরবিচ্ছিন্ন ষড়যন্ত্র, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম এবং অসহযোগিতাও ইরানি জাতিকে এপথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
ইমাম খোমেনী(র.) এর অনুপ্রেরণাদানকারী বাণী ও বক্তব্য যেমন ইরানি জাতিকে ইসলামি বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত, আত্মবিশ্বাসী, সাহসী ও দৃঢ় মনোবলে বলীয়ান করেছিল ঠিক তেমনি পরবর্তীতে ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর বলিষ্ট বক্তব্য, বাণী ও সময় উপযোগী বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ও দিক নির্দেশনও এক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। যে কারণে ইসলামি ইরান এগিয়ে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের পররাষ্ট্রনীতি কতোটা স্বাধীন ও সফল? জুলুম-িবিরোধী ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য ইরানকে কী অর্থনীতি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে মূল্য দিতে হচ্ছে না?
মুনির হুসাইন খান: ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের পররাষ্ট্রনীতি তদানীন্তন দু’মেরুতে বিভক্ত বিশ্বে এক অভূতপূর্ব ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল। তখন গোটা বিশ্ব কিছু ব্যতিক্রম ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য বলয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়েনের নেতৃত্বে প্রাচ্যবলয়- এই দুই বলয়ে বিভক্ত ছিল। তখন এই দুই বলয়ের বাইরে কেউ থাকতে পারে বলে কারো ধারনাও ছিল না। ঠিক সে সময় ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরান বিশ্ববাসীর কাছে এক নতুন স্বাধীন সফল পররাষ্ট্রনীতি উপস্থাপন করে। ইরান বলে “ না পাশ্চাত্য না প্রাচ্য, ইসলামই সর্বোত্তম”।
ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত মার্গবার অমরিকা(মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক), মার্গবার ইসরাইল( ইসরাইল ধ্বংস হোক), মার্গবার ইংগেলিশ( বিট্রেন নিপাত যাক) এবং মার্গবার শোরাভি( সোভিয়েতে ইউনিয়ন ধ্বংস হোক) ইত্যাদি স্লোগান ধ্বনিত হতো। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এখন আর মার্গবার শোরাভি স্লোগান শোনা যায় না। এখন আর তার যৌক্তিকতা নেই কিন্তু বাকি তিনটি স্লোগান এখনও পুরোমাত্রায় বহাল আছে।
ইরানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ হচ্ছে দীর্ঘ ৮ বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধাবস্থায় সাদ্দামের আগ্রাসন ও যুদ্ধ মোকাবেলা করার পাশাপাশি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনী জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করা। ইসরাইলী আগ্রাসনের শিকার লেবাননের ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন সংগ্রাম ও যুদ্ধে সহায়তা করা।
ইরানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য দেশটিকে প্রথম যে মূল্য দিতে হয়েছিল তা হচ্ছে- ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের যুদ্ধ(১৯৮০-১৯৮৮)। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য বিপ্লব বিজয়ের শুরুতেই ইরানের বিভিন্ন এলাকায় যেমন-কুর্দিস্তান, খুজিস্তান ও বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে এবং ইরানের অভ্যন্তরে মুজাহিদীনে খালকসহ বিভিন্ন বিপ্লব বিরোধী গ্রুপগুলোকে সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কার্যকলাপে উসকে দিয়েছিল।
তাদের সেই ষড়যন্ত্রে ইরানের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট রাজায়ী, প্রধানমন্ত্রী বাহোনার, আয়াতুল্লাহ মোতাহহারী এবং প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ বেহেশতীসহ বহু আলেম এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সেই ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল সিআইএ, এমআই-৬, মোসাদ।
বিপ্লব বিজয়ের কয়েক মাস পর তেহরানে মার্কিন গুপ্তচরদের আখড়াবল খ্যাত আমেরিকার দূতাবাস দখল করা হলে ক্রুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র বিপ্লবী ইরানের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালেই নিষেধাজ্ঞা জারী করে যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ওইসব নিষেধাজ্ঞা প্রতিবছর তীব্র থেকে তীব্রতর করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যাতে করে ইরানের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে যায় মুখ থুবড়ে পড়ে সেজন্যেই তাদের এ অপতৎপতরা। কিন্তু তাদের দেয়া সেইসব নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে ইরান এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইরান তার ব্প্লিবী স্বাধীন স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি বিসর্জন দেয় নি। আর এজন্য ইরানকে অর্থনীতি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তারপরও ইরান অব্যাহতভাবে সবকিছুর মোকাবেল করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৯