‘খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত হলে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার’
খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে বিএনপির রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং আইনগত মোকাবেলা খুবই যুক্তিসঙ্গত। তবে একটি মামলায় জামিনের পর আবার একটি মামলায় আটক দেখানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও একুশে টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল।
তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বললেন, অ্যাটর্নি জেনারেল যখন বিচার বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চ নিয়ে কথা বলেন তখন একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে বিচার বিভাগকেই প্রমাণ করতে হবে তারা স্বাধীন।
বুলবুল আরো বলেন, যদি আইনি প্রক্রিয়াতেই খালেদা জিয়ার মুক্তি পাওয়াটা বিলম্বিত হয় তাহলে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া দরকার।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। কিন্তু কুমিল্লায় দায়ের হওয়া একটি নাশকতার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তো খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর এবং পরবর্তীতে আবার গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: বেগম খালেদা জিয়ার এই মামলার বিষয়ে খালেদা জিয়া এবং বিএনপির প্রতিটি পদক্ষেপকে আমি খুব যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং বিএনপি একটি দল হিসেবে শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে বিষয়টিকে মোকাবেলার চেষ্টা করেন নি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপকে যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে।
বেগম খালেদা জিয়া নিজে আদালতে হাজির হয়েছেন এবং এই রায়ের ফলে নির্বাচনে তার কী প্রভাব পড়বে সেটি রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া নিজে আইনি বিষয়টিতে নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছেন। জেলে যাওয়ার আগেও খালেদা জিয়ার নিজের একটা প্রস্তুতি ছিল। তিনি দলকে গুছিয়ে গেছেন এবং দলকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজেই আমি মনে করি যে তারা আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন।
আর আইনি প্রক্রিয়াতেই নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার জেল হয়েছে এবং উচ্চ আদালতে জামিন হয়েছে। ধারনা ছিল যে উচ্চ আদালতে জামিন হওয়ার পর খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু দেখা গেল যে আরেকটি আইনি জটিলতায় তিনি পড়েছেন। তাছাড়া আদালতে আবার জামিন স্থগিত হয়েছে।
রেডিও তেহরান: কুমিল্লার মামলায় জামিন না নিয়ে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির কোনো অবকাশ নেই বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আসলে আইন কী বলছে?
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল যে কথা বলেন তার বিরুদ্ধে কিছু বলার মতো আমাদের অবস্থান নেই। কারণ আমরা আইনজ্ঞ নই। তবে সাধারণ মানুষের জায়গা থেকে ধারনা হয় এরমধ্যে হয়তো সরকারের কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা কাজ করছে কী না? যদিও পুরো বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কাজেই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সামগ্রিক অবস্থাটা পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার। দরকার এই জন্যে সাধারণ মানুষের পারসেপশন যাতে এমন না হয় যে সরকার রাজনৈতিক কারণেই আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। এরফলে যেটি হয় যে, ক্ষমতাসীন দল বা যারা সরকারে থাকেন তারা প্রাথমিকভাবে কিছুটা লাভবান হলেও চূড়ান্ত বিচারে মানুষের ধারনা তাদের বিরুদ্ধে যায়। এরফলে রাজনৈতিক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস বা উচ্চ আদালতের যেকোনো প্রক্রিয়া এবং দুর্নীতি দমন কমিশন যারা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বাদি হিসেবে লড়ছেন তাদের উচিত খুব স্পষ্টভাবে বলা আসলে আইনের ব্যাখ্যাটি কী?
আইনের ব্যাখ্যা যদি একরকম হয় এবং রাজনীতির মাঠে নেতারা আরেকরকম কথা বলেন তখন সাধারণ মানুষের ধারনার মধ্যে একটা সংঘাতের সৃষ্টি হয়। যদি আইনি প্রক্রিয়াতেই তার মুক্তি পাওয়াটা বিলম্বিত হয় তাহলে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া দরকার। ডক্টর কামাল হোসেনের মতো আইনজীবী এ বিষয়ে বলেছেন খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য এত দীর্ঘ সময় লাগার কোনো কারণ ছিল না। ডক্টর কামাল হোসেন যখন একথা বলেন তখন মানুষ বিভ্রান্ত হন। তখন মানুষের মনে হতে পারে তাহলে কী অন্য কোনো বিশেষ কারণে এই ঘটনা ঘটছে!
রেডিও তেহরান: খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়ার পর অনেক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী বলেছেন, এতদিন বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের লোকজন আইনের শাসন নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন হাইকোর্টের জামিন আদেশর মধ্যদিয়ে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন একটা বাস্তব জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোর্ট যখন বিপক্ষে রায় দেয় তখন বলা হয় যে প্রভাব খাটিয়ে বিচার বিভাগকে কারো বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার যখন আদালতের রায় পক্ষে যায় তখন বলা হয় যে ন্যায় বিচার পেয়েছেন। এটি শুধুমাত্র খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে নয় আগে বা পরে অনেক দৃষ্টান্ত হয়তো জানা যাবে। তবে একটু আগে যেকথা বল্লাম- সেটি হচ্ছে মানুষের ধারনাগত বিষয়। মানুষ ধারনা করে বোধহয় বিচার বিভাগ স্বচ্ছভাবে চলে না। মানুষের এমন ধারনা যে- ক্ষমতায় থেকে যেকোনো সরকার বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করতে পারে। আর মানুষের মধ্যে এই ধারনাগুলো তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময় আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কের কারণে। কাজেই আমি মনে করি বিএনপির মতো একটি দল এবং তাদের নেতারা যখন কোনো মন্তব্য করবেন তখন পূর্বাপর ভেবেই মন্তব্য করবেন।
রেডিও তেহরান: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন পাওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসনকে ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর মাধ্যমে সরকার বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার প্রত্যক্ষ নজির স্থাপন করেছে বলে বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। এ অভিযোগকে কীভাবে দেখবেন?
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: দেখুন, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে এটি আছে। এটি শুধুমাত্র বিএনপির অভিযোগের ক্ষেত্রেই বলছি না; আমরা অতীতেও দেখেছি এরকম অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ। বেগম খালেদা জিয়ার জামিন যখন বিএনপি পায় না তখন বলে দেশে ন্যায় বিচার নেই। বিএনপি নেতারা বলেন যে সরকার বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব খাটাচ্ছে। আবার জামিন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বলছেন ন্যায় বিচার পেয়েছি। এরফলে মানুষের মধ্যে দল এবং ব্যক্তি সম্পর্কে ভিন্ন ধারনার জন্ম হতে পারে। খুব ভালো হতো আমরা যদি এমন একটা সংস্কৃতি চালু করতে পারতাম যেখানে বিচার বিভাগ এবং বিচারকরা স্বাধীনভাবে স্বচ্ছভাবে তার মতামত দিতে পারে। যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের কোথাও কোথাও তো রাজনীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব আমরা দেখেছি। তখন মনে হয়েছে যে যুক্তির চেয়ে রাজনীতি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
রেডিও তেহরান: এ আলোচনার রেশ ধরে সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আপনার কাছে করতে চাই সেটি হচ্ছে- বেশ কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছে এবং এর মধ্যদিয়ে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়েছে বলে সরকার দাবি করে থাকে। আসলে বস্তবতা কী?
মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: দেখুন, এর বাস্তবতাটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। বলা মুশকিল এই কারণে যে আমি তো আইন অঙ্গনের মানুষ নই। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি যখন আসে –তখন এভাবে দেখা হয়, রায়টি যখন আমার পক্ষে তখন আমি মনে করি বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং বিচারক স্বাধীনভাবে রায় দিয়েছেন। আর যখনই রায়টি আমার বিপক্ষে যায় তখনই আমরা বলি বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়। এই একটি ধারনা মানুষের মধ্যে আছে।
আর বিচার বিভাগের অভ্যন্তরে কী ঘটে না ঘটে সে ব্যাপারে দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা বা অ্যাটর্নি জেনারেল কয়েক দিন আগে যেকথা বলেছেন তারচেয়ে ভালো করে বলার মতো সামর্থ্য আমার নেই। কয়েক দিন আগে নতুন প্রধান বিচারপতির শপথ অনুষ্ঠানের পরই আইনজীবীদের সাথে মতবিনিময়ের সময় খোদ অ্যাটর্নি জেনারেল বিচারালয় সম্পর্কে যেকথাগুলো বলেছিলেন সেটি আমরা বললে হয়তো আদালত অবমাননার দায়ে দোষী হতাম। কিন্তু খোদ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, বিচারক দেখে দেখে মামলা যায়। আরো অনেক সুনির্দিষ্ট তথ্য তিনি তুলে ধরেছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল যখন বিচার বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চ নিয়ে কথা বলেন তখন একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারনা হতেই পারে। সম্ভবত এই বিষয়গুলোর বাস্তবতা আছে। তবে বিচার বিভাগকেই প্রমাণ করতে হবে তারা স্বাধীন। এ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটির বিষয়টি আবার আসবে। খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় জামিনের পর যখন আরেকটি মামলায় জড়ানো হলো সেটি যে রাজনৈতিক কারণ নয় আইনি কারণ সে বিষয়টি বিচার বিভাগকে সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে। তা নাহলে মনে হবে যে একটির পর একটি মামলা দিয়ে তাকে আটকে রাখাটাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। মানুষের মধ্যে এই ধারনাটাই প্রতিষ্ঠিত হবে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৮