পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব: বিখ্যাত ইরানি কবি আবুল হাসান কিসায়ি মার্ভাজি
বিশিষ্ট ইরানি কবি আবুল হাসান আবু ইসহাক কিসায়ি মার্ভাজি’র জীবন, চিন্তাধারা ও লেখনী সম্পর্কে আলোচনা করব। মার্ভ অঞ্চলে জন্ম নেয়া এই কবির পরিচিতি তুলে ধরার সুবিধার্থে ইরানের এই প্রাচীন শহরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও তুলে ধরব।
আবুল হাসান আবু ইসহাক কিসায়ি মার্ভাজি জন্মগ্রহণ করেন হিজরি ৩৪১ সন মোতাবেক ৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন ইরানের পূর্বাঞ্চল মার্ভে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে এই কবিকে বলা হত মার্ভাজি। তিনি এখানেই সে যুগের প্রচলিত নানা বিষয়ে পড়াশুনা করেন এবং সেসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
প্রাচীন যুগের আর্যদের অন্যতম প্রধান শহর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল মার্ভ। প্রাচীন ইরানের সম্রাট প্রথম দারিউশ বিসুতুনের দেয়াল-লিপিতে মার্ভের নাম দিয়েছিলেন ‘মারগুশ’। বখতার বা মধ্য-এশিয়ার ব্যাকট্রিয়া অঞ্চলের সঙ্গে তিনি এ অঞ্চলের নাম নিয়েছিলেন। তবে প্রাচীন যুগের ভূগোলবিদরা মার্ভকে স্মরণ করেছেন ভিন্নভাবে। তারা এ শহরকে বলতেন মার্গইয়ানা। ইরানি পার্থিয়ান রাজাদের নিয়ন্ত্রনে ছিল এই শহর। সাসানীয় যুগেও মার্ভ ছিল বেশ সমৃদ্ধ শহর। এরপর বহু রাজবংশ শাসন করেছে এই অঞ্চল। কিন্তু শহরটির গুরুত্ব কখনও কমেনি।
মার্ভ ছিল প্রাচীন খোরাসানের চার প্রধান শহরের অন্যতম। এক সময় এ শহর ছিল খোরাসানের রাজধানী। খোরাসানের অন্য তিন প্রধান শহর ছিল নিশাপুর, বালখ ও হেরাত। খাওয়ারেজম, ট্রান্স-অক্সিয়ানা, সারাখস ও নিশাপুরের সঙ্গে সংযোগ কিংবা ঘনিষ্ঠতার কারণে এবং বাণিজ্য ও সামরিক গুরুত্বের প্রভাবে সাসানিয় যুগ থেকে শুরু করে আরবদের কর্তৃত্বের যুগে, আব্বাসিয় খলিফা মামুনের শাসনামলেও মার্ভ ছিল খোরাসানের রাজধানী।
আরবদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর প্রথম স্বাধীন ইরানি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা তাহেরিয়ানরা নিশাপুরকে করে খোরাসানের রাজধানী। ইরানি সামানিয়রা রাজধানী হিসেবে বেছে নেয় বালখ ও বোখারাকে। আর তুর্কি বংশদ্ভুত সালজুকরা মার্ভকে করে তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী। সিনজারের সুলতানের আমলেও মার্ভ ছিল খোরাসানের রাজধানী। এই যুগে মার্ভই ছিল ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। মার্ভ ছিল এতই সমৃদ্ধ যে এখানকার কৃষক ও ভূমির মালিকরা আশপাশের রাজ্যপতি ও আমির-ওমরাহদের মতই প্রভাব-প্রতিপত্তি রাখতেন।
খাওয়ারেজমের জোরজান বা গোরগানের জ্ঞানী-গুণিদের মতই মার্ভ ছিল রত্ন-গর্ভ। মার্ভের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরিগুলোতে ভীড় জমাতেন শিক্ষার্থী এবং জ্ঞানী-গুণিরা। ৫৫০ হিজরিতে মার্ভে ছিল দশটি বড় পাবলিক লাইব্রেরি। এই গ্রন্থাগারগুলোর একটিতে ১২ হাজার বই ছিল।
মোঙ্গলদের হামলার সময় ইয়াকুত হামাভি বসবাস করতেন মার্ভে। তিনি লিখেছেন, ৬১৬ হিজরিতে যখন মার্ভ থেকে চলে আসি তখন এই শহর ছিল সমৃদ্ধির শিখরে। কিন্তু মোঙ্গলদের হামলায় এই শহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। খাওয়ারেজমের সুলতান মুহাম্মাদ পালিয়ে গেলে মার্ভের সাবেক শাসক মুজির আল মুলক মোঙ্গলদের হাত থেকে মার্ভকে রক্ষার চেষ্টা করেন। মার্ভের প্রধান মুফতি ও সারাখসের বিচারপতি মোঙ্গলদের কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু মুজির আল মুলক তাদের হত্যা করেন। এ অবস্থায় মোঙ্গলরা মার্ভ শহরকে ঘিরে ফেলে।
মার্ভবাসী ৫ দিন ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে চেঙ্গিজ খানের পুত্র তুউলি খানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সোনার সিংহাসনে বসে তুউলি খান মার্ভের সবাইকে শহর থেকে বের হয়ে আসার নির্দেশ দেন এবং খাওয়ারেজমের শাসক-শ্রেণীর সবাইকে হত্যা করতে বলেন। তুউলি মার্ভের জনগণকে তার সেনাদের মর্জির ওপর ছেড়ে দেন। মোঙ্গল সেনারা মার্ভের নারী, পুরুষ ও শিশুদের সবাইকে হত্যা করে এবং এরপর গোটা মার্ভ শহর পুড়িয়ে দেয়।
মোঙ্গলদের আক্রমণে মার্ভের সাত লাখ অধিবাসী নিহত হয়। শহরটির আর কেউই বেঁচে ছিল না। মোঙ্গলদের হামলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর মার্ভ কখনও তার পুরনো সমৃদ্ধি ও গৌরবোজ্জ্বল অবস্থা ফিরে পায়নি।
যাই হোক কবি আবুল হাসান আবু ইসহাক কিসায়ি মার্ভাজির যুগে মার্ভ ছিল গবেষক ও শিল্প-প্রেমিকদের বেহেশত। আরবদের হাতে পরাজিত ইরানি সম্রাট ইয়াজদিগার্দ তার শাসনামলের শেষের দিকে রাজধানী প্রাচীন সিস্টোফেন তথা আধুনিক বাগদাদ-সংলগ্ন থেকে মাদায়েন থেকে যেসব বই নিয়ে এসেছিলেন সেগুলো রাখা হয়েছিল মার্ভের একটি গ্রন্খাগারে।
খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতক বা হিজরি সপ্তম শতকের ঐতিহাসিক ও পণ্ডিত ইয়াকুত হামাভির লেখা থেকে জানা যায় যে সেযুগে মার্ভে বেশ কয়েকটি লাইব্রেরি ছিল। এসবের মধ্যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠা করেছিল সামানীয় রাজবংশ। বহু গবেষক ও চিন্তাবিদ বই লেখার জন্য এ শহরের লাইব্রেরিগুলো থেকে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতেন। আর কবি-সাহিত্যিকদের জন্ম দেয়ার মত উপযুক্ত পরিবেশও ছিল মার্ভ শহরের।
হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতকে তথা খ্রিষ্টিয় নবম ও দশম শতকে সামানীয় শাসকরা ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দিতেন। ফলে প্রাচীন এই শহরের শিক্ষিত সমাজের অনেকেই বড় কবি-সাহিত্যিক হয়ে ওঠেন। আর তাদেরই একজন ছিলেন মাসউদি মার্ভাজি ও আবু নাসর মার্গাজি। মাসউদি ছিলেন ফার্সি ভাষায় শাহনামা জাতীয় বীরত্ব-গাঁথার প্রথম রচয়িতা। এই পথ ধরেই পরবর্তীকালে ফেরদৌসি লিখেছেন অমর কাব্য শাহনামা।
কবি আবুল হাসান আবু ইসহাক কিসায়ি মার্ভাজি এই মার্ভ শহরেই জন্ম নেন এবং এখানেই নিজ প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটান ও খ্যাতির শীর্ষে উঠে আসেন। আর এ শহরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
কিসায়ি’র যুগে সামানিয় সরকারের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছিল কিসায়ির জীবন ও কবিতার ধরনের ওপর। তিনি প্রথম দিকে কেবলই স্তুতিবাচক বা প্রশংসাসূচক কবিতার চর্চা করতেন। তার জীবন-কাহিনীগুলোতে সেইসব কবিতার কিছু নমুনা বা অংশ দেখা যায়। সে সময় সামানীয় রাজবংশের গুণ-কীর্তনই ছিল তার কাজ। কিন্তু সামানিয়দের পতনের পর কিসায়ি মার্ভাজির বিশ্বাস ও চিন্তাধারাও বদলে যায় এবং সেইসব গুণকীর্তণের জন্য তিনি অনুতপ্ত হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টির প্রশংসা করে আমি আমার নিজ আত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করেছি। আর সৃষ্টি ছাড়া কারও প্রশংসা করিনি বলে আমি তিরস্কারের যোগ্য হয়েছি’ ।
এরপর থেকে কিসায়ি মার্ভাজি ধর্মীয় সংযম সাধনায় মশগুল হন। এ সময় ধর্মীয় উপদেশ প্রচার এবং মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রশংসা ছাড়া তিনি অন্য কোনো ধরনের সাহিত্য-চর্চা করতেন না।
কিসায়ি মার্ভাজি’র কাব্য-সংকলন ষষ্ঠ হিজরি তথা খ্রিষ্টিয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর দৃশ্যত ওই সংকলনের সব কপি ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল তার কিছু কবিতার পংক্তি টিকে আছে। আমাদের আজকের আলোচনার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিসায়ি সম্পর্কে সম্ভব হলে আমরা আরও কথা বলবো এ ধারাবাহিকের আগামী পর্বে। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৭