প্রধানমন্ত্রীর কোটা প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত বৈপ্লবিক: ড. আরেফিন সিদ্দিক
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবির ভিত্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা প্রথা বাতিল করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বৈপ্লবিক। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে গত কয়েকদিন বড় রকমের একটা আন্দোলন হলো। এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা কী?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: চাকরি প্রত্যাশী যারা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী-তাঁরা বেশ বেশ কয়েকবছর ধরে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। তাদের দাবি সরকারি, আধা-সরকারি কিংবা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে নিয়োগের জন্য যে কোটা প্রথা আছে সেটার সংস্কার করতে হবে।
বর্তমানে কোটাধারী প্রায় ৫৬ শতাংশ চাকুরিজীবী আছেন। মানে কোটার মাধ্যমে তাদের চাকুরি হয়ে থাকে। অন্যদিকে শতকরা ৪৬ ভাগ আসে মেধাবী ছাত্রদের মধ্য থেকে। মূলত সেটার সংস্কার তাঁরা চাচ্ছে। কারণ তারা মনে করে এবং আমারও মনে হয় সাধারণভাবে বলা যায় স্বাধীনতার পর পর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের সরকার প্রথম যে কোটা প্রথা চালু করে বাংলাদেশে তা পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। তবে তখন যুদ্ধবিধ্বস্থ বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন ছিল। সময়ের ব্যবধানে এখন কোটা প্রথাকে নতুন করে মূল্যায়ন করে এটার সংস্কার করা সময়ের দাবি এবং শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের দাবি। আর সেই দাবিতে তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করে সরকারের কাছে তুলে ধরেছে।
রেডিও তেহরান: গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা পদ্ধতি বাতিলের কথা বলেছেন। অনেকে বলছেন, আন্দোলন হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিতে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। তবে কেউ কেউ এ ঘোষণা বাস্তবায়নের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। আপনার কী মনে হয়?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: দেখুন, প্রধানমন্ত্রীর কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। আর সেই ঘোষণা বাস্তবায়নে এরইমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি করবে। তবে যারা এ বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করছে তাদের স্পষ্টভাবে বলা দরকার কেন তারা সংশয় প্রকাশ করছে? একজন সরকার প্রধান যখন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো ঘোষণা দেন সেটা কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে সেটাই তো প্রত্যাশিত।
আর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল কোটা পদ্ধতির সংস্কার। আর সেই সংস্কারের অর্থটা হচ্ছে চাকরিতে মেধাবীদের সংখ্যা বাড়ানো। একশভাগ চাকরি প্রত্যাশীদের মধ্যে কোটা যদি ১০ ভাগ হয় তখন ৯০ ভাগ হবে মেধাবীদের। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিলেন কোটা প্রথা আর থাকবে না। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ১০০ ভাগই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে। অর্থাৎ সকল চাকরি প্রত্যাশী উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মেধার ভিত্তিতে চাকুরি পাবে। এখন থেকে সরকারি চাকরির জন্য মেধাই হবে একমাত্র যোগ্যতা আর কোনো শ্রেণিবিন্যাস এখানে থাকবে না।
আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। তরুণদের উন্নয়নের জন্য তিনি শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অন্তত দশ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। আর তাই কোটা প্রথা সংস্কার নিয়ে তরুণদের দাবি থেকে একধাপ এগিয়ে গিয়ে সরাসরি কোটা প্রথা বাতিল করেছেন। ফলে আমার মনে হয় এখানে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই। বরং আমাদের উচিত এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে মেধাভিত্তিক একটি প্রশাসন গড়ে উঠবে।
রেডিও তেহরান: অভিযোগ রয়েছে- কোটা পদ্ধতির কারণে চাকরির ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। আপনার কী তাই মনে হয়?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: দেখুন, যারা দুর্নীতি করে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে দুর্নীতির সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। শুধুমাত্র কোটা প্রথার জন্য চাকুরি ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে এমনটি আমি মনে করি না। তবে কোটা প্রথার ক্ষেত্রে অনেকে কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নিয়েছে বা নিতে পারে ঠিক একইভাবে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা দুর্নীতি দেখতে পাই। কোটা প্রথা বিশ্বস্বীকৃত একটি পন্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোটা প্রথা প্রচলিত আছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে কিছুটা অগ্রাধিকার দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি পৃথিবীজুড়ে আছে। আমরা বৈষম্য চাই না তবে এরইমধ্যে সমাজে যে বড় বৈষম্য বিদ্যমান সেই বৈষম্যকে কমানোর জন্য ইতিবাচক একটি বৈষম্য প্রয়োজন। আর সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থকে এখানে কোটা প্রথা প্রচলিত ছিল। আর এখন ২০১৮ সালে এসে সার্বিক বিবেচনায় আমরা মনে করছি যে কোটা প্রথা তুলে দেয়া যায়-সে পরিপ্রেক্ষিতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কোটা প্রথা রহিত হয়ে গেল। তো আমার মনে হয় দুর্নীতির সাথে সরাসরি এটাকে সংযুক্ত করে আলাদাভাবে দেখার কিছু এখানে নেই।
রেডিও তেহরান: বলা হচ্ছে- কোটাপ্রথা দেশ ও জাতিকে মেধাশূন্য করছে। এ অভিযোগ কতটা যৌক্তিক বলে মনে করেন?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: কোটা প্রথা দেশ ও জাতিকে মেধাশূন্য করছে বলে যারা অভিযোগ করছেন তাদের এ বক্তব্যকে আমার কাছে একমুখী বলে মনে হয়েছে। কারণ আমাদের পিএসসির প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে দেখা যায় আড়াই লক্ষ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে থাকে। এরপর তাদের লিখিত পরীক্ষা হয়। তারপর মৌখিক পরীক্ষা। সেখানে ওই সাড়ে তিনলক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্য থেকে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার নির্বাচিত হয় এবং তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। ওই পরীক্ষাগুলোতে কিন্তু কোটায় কোনো মূল্যায়ন হয় না। সব পরীক্ষা শেষে যে তালিকা করা হয় সেখান থেকে কোটা প্রয়োগ করা হয়। অতএব কোটায় যারা আসছে তার কম মেধাবী এটা বলা বোধহয় তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে। তারাও মেধাবী কিন্তু কোটার জন্য তারা কিছুটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: জাতীয় সংসদে নারীর জন্য যে সংরক্ষিত আসন রয়েছে তাও তো একটা কোটা। এরও কী পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন? সেটাকে কী আপনি নারীর সুষ্ঠু ও সম্মানজনক ক্ষমতায়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: কোটা তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আছে। আমার মনে হয় এই যে আন্দোলনটা হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ জাতীয় সংসদে মহিলাদের স্বতন্ত্র আসন এগুলো আবার ভিন্ন বিষয়। সেগুলো কতটা যৌক্তিক,কতটা রাখা যেতে পারে, পরিবর্তন করা উচিত কি না তা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
তবে আমরা যে কোটা প্রথা নিয়ে আলোচনা করছিলাম সেটা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। সেই কোটা প্রথা রহিত করে আমাদের তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্খাকে পূরণ করা হলো। একইসাথে আমি মনে করি যে প্রজাতন্ত্রের সামনের দিনগুলোর জন্য এটা সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ কোটা দিতে গেলেই কারো বেশি হচ্ছে বা কারো কম হচ্ছে সেগুলো নিয়ে আবার বিভিন্ন সময় নানাধরনের অভিযোগ আসে। তাছাড়া মেধার দিক থেকে খুব বেশি পার্থক্য সেটাও হচ্ছে না। কোটাতে যারা যাচ্ছিলো তাদেরকে কোটার নাম নিয়ে দেয়া হচ্ছিলো তবে মেধার দিক থেকে তারাও কাছাকাছি কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটা বিভাজন হয়ে যায় যে সে কোটাতে এসেছে আর আমি মেধার ভিত্তিতে এসেছি। আর সেটা না থাকাটাই উচিত।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৬