'খুলনা সিটি নির্বাচনে চোখের আড়ালে অনেক কিছু হয়েছে'
সম্প্রতি শেষ হওয়া খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী জিতলেও তারা খুব বুদ্ধিমানের সাথে ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাহফুজউল্লাহ। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, সরকার ইচ্ছে করলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক ভালোভাবে বিজয়ের হাসি হাসতে পারত। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কী হতো তা বলা শক্ত।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ, তৈরি ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
- খুলনা সিটি নির্বাচনে চোখের দেখায় আসলে কিছু হয় নি, যা হয়েছে তা চোখের আড়ালে।
- নির্বাচন কমিশন শক্তি ও মেরুদণ্ডহীন প্রতিষ্ঠান।
- সরকার পুলিশের সাহায্যে নির্বাচন করতে চায় ও অন্যান্য বৈতরণী পার হতে চায়।
- খুলনার সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আগের মতো আবারও গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছে।
- ইচ্ছে করলে আওয়ামী লীগ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক ভালোভাবে বিজয়ের হাসি হাসতে পারত।
- খুলনায় ক্ষমতাসীন দল অনেক বুদ্ধিমানের মতো ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করেছে।
রেডিও তেহরান: জনাব মাহফুজউল্লাহ, খুলনা সিটি কর্পোরশেন নির্বাচনে আ. লীগের প্রার্থী আবদুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। পরাজিত বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য এটা 'অশনি সংকেত'। মঞ্জুর এই বক্তব্য কেন এবং তা কতটা যৌক্তিক?
মাহফুজউল্লাহ: খুলনায় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু কেন মন্তব্য করলেন, এটি গণতন্ত্রের জন্য 'অশনি সংকেত' সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি বুঝি জয় পরাজয়টা বড় কথা নয়; এরচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে... খুলনার সিটি নির্বাচন নিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে যেটি আমাদের জন্য দুঃখজনক।
এর একটি হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের কোনো শক্তি ও মেরুদণ্ড নেই এবং জনগণের আশা-আকাঙ্খা উপলব্ধি করার মতো মানসিকতা নেই। এ বিষয়টি বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনরায় প্রমাণ করেছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, বর্তমান সরকার প্রশাসনের সাহায্যে বিশেষ করে পুলিশের সাহায্যে নির্বাচন করতে চায় এবং অন্যান্য বৈতরণী পার হতে চায় সেটাও পুনরায় খুলনা সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রমাণিত হয়েছে।
অতি সম্প্রতি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা এবং খুলনা সিটি নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা সেটা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। মানুষ উপলব্ধি করেছে পুলিশ কী ধরনের ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে।
আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। অথচ সর্বশেষ খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তাদের ভূমিকার ফলে তারা নিজেরাই প্রমাণ করেছে যে গণতন্ত্রকে তারা কেবল অতীতেই কবর দেন নি বর্তমানেও তারা কবর দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের একটি গণতান্ত্রিক মর্যাদা ছিল সেটি সাংঘাতিকভাবে এই নির্বাচনে ক্ষুন্ন হয়েছে। আওয়ামী লীগ ইচ্ছে করলে এ নির্বাচনে অনেক ভালোভাবে বিজয়ের হাসি হাসতে পারত যদি সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হতো। অবশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল কী হতো সেটা বলা শক্ত।
আর নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে যে কথাটা বলা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, এমন অনেক ভোট কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে যেখানে যদি ধরে নেই এক'শ জন ভোটার তারমধ্যে ৯৯ জন ভোট দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতিতে একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। নির্বাচন কমিশন এসব বিষয় দেখেও না দেখার ভান করেছে এবং যেখানে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত সেখানে তা করেনি। খুলনা সিটি নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন যেভাবে পুলিশের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না বলেও স্পষ্ট করে জানিয়েছে। এরপর নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু না। আমি জানি না বাংলাদেশের মানুষ পুরো বিষয়টা কিভাবে নেবেন! তবে আজকে যে বিষয়টি ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে সেটি হচ্ছে বর্তমান ব্যবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্রমশ তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: বিএনপি বলেছে, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। খুলনা সিটি নির্বাচনে আবারো প্রমাণ হলো এ সরকার এবং ইসির অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে দলটি নির্বাচনে গেল কেন- এমন প্রশ্ন কিন্তু আসে। এ প্রশ্ন কী অযৌক্তিক?
মাহফুজউল্লাহ: না, এটি মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিএনপি হোক বা আওয়ামী লীগই হোক তারা নিজেরা গণতন্ত্রের কথা বলে এবং এও বলে যে তারা গণতান্ত্রিক দল। কাজেই ক্ষমতায় যেতে হলে তাদের কাছে নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতায় যেতে হলে তাদেরকে নির্বাচন করেই যেতে হবে। আমি নিজে বিশ্বাস করি সকল প্রতিরোধের মুখে জনশক্তিতে নির্ভর করে বিজয় অর্জন করা সম্ভব। সবশেষে রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে বলতে চাই ' যে মানুষ মুক্তি চায় কেউ তাকে ঠেকাতে পারে না'।
রেডিও তেহরান: খুলনা সিটি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে আ. লীগ প্রাথী বিজয়ী হয়েছে। সাধারণত দেখা যায়- কোনো দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের জনপ্রিয়তা কমে এবং স্থানীয় নির্বাচনে তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এবার ব্যতিক্রম ঘটল। এটা নিশ্চয় সরকার ও আ. লীগের সফলতা। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মাহফুজউল্লাহ: দেখুন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক সাহেব এবার খুলনা সিটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর আগে ২০০৮ তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০১৩ সালে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার আবার তাকে আওয়ামী লীগ মাঠে নামিয়েছেন। ভোটের অংক হিসাব করলে খুলনায় ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। তারমধ্যে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ভোট তারা পেয়েছেন। এক হিসাবে এটা খুব বেশি ভোট নয়। সম্ভবত অংকের হিসাবে এটা দাঁড়াবে ৩৫ ভাগ। কাজেই ৩৫ ভাগ ভোট নিয়ে উল্লাসের তেমন কিছু নেই। এই ভোট পেয়ে আমরা সকলের মন জয় করেছি এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই।
অন্যদিকে বিএনপি যে ভোট পেয়েছে- সেই ভোট পাওয়ার পরও যারা বলেন যে বিএনপি নিঃশেষ হয়ে গেছে, দলটির কোনো জনসমর্থন নেই সেকথা কতোটা গ্রহণযোগ্য! বিএনপি এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও শতকরা ২৫ ভাগ ভোট পেয়েছে। যদি সর্বনিম্ন ধরে নেই ১৫ টি ভোট কেন্দ্রে তারা দখল করেছে তাহলেও কেল্লা ফতে! কারণ ওইভাবে ভোটকেন্দ্রগুলো দখল করা হয় যাতে প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৩ হাজার ভোট আছে। আমি যে হিসাবটা দিলাম আপনাকে সেভাবে ব্যালটে সিল মারা হলে তিন পনেরো ৪৫ হাজার ভোট হয়; এতে স্বাভাবিকভাবে বিজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। অন্যেরা বলছে কিছুই হয় নি। হ্যাঁ একথা সত্যি চোখের দেখায় আসলে কিছু হয় নি। যা হয়েছে তা চোখের আড়ালে হয়েছে এবং এবার ক্ষমতাসীন দল অনেক বুদ্ধিমানের মতো ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করেছে।
রেডিও তেহরান: খুলনার নির্বাচনকে গণতন্ত্রের বিজয় বলে আখ্যা দিয়েছে আ. লীগ কিন্তু সংঘটিত অনিয়ম ও হুমকির ঘটনায় হতাশ যুক্তরাষ্ট্র। এসব ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট। কীভাবে দেখবেন মার্কিন এই অবস্থানকে?
মাহফুজউল্লাহ: দেখুন, বর্তমান বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ। বিশ্বের দেশে দেশে যোগাযোগ বেড়েছে। এক দেশের পরিস্থিতি নিয়ে অন্যদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করে। এক দেশের পরিস্থিতি নিয়ে অন্য দেশ কথা বলে। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মন্তব্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমাদের বাংলাদেশও অন্যান্য দেশের অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করে। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের মন্তব্যগুলো দেখেন তাহলে দেখা যাবে তারা বলে এসেছে যে বাংলাদেশে তারা একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চায়। আর এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্হিবিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া আমেরিকার অভ্যন্তরেও একধরনের জনমত তো আছে যাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশে যাতে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল হয় সেদিকে নজর রাখা বা ভিন্ন কিছু হলে উদ্বেগ প্রকাশ করা। এটাকে আমি অস্বাভাবিক বলে মনে করি না।
আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো- যারা ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার বাইরে আছেন তারা বিভিন্ন সময় কখনও এককভাবে কখনওবা যৌথভাবে বিদেশি বন্ধুদের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনে সাহায্য - সহযোগিতার জন্য।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৬