'এ বাজেট মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তুষ্টির জন্য'
বাংলাদেশের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক সাধারণ একটি বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, এ বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য না, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তুষ্টির জন্য।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
- একটি সাধারণ দিক নির্দেশনাবিহীন বাজেট।
- সরকার বাজেটে ব্যাংক সংকটের ব্যাপারে নির্বিকার।
- বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ের কথা বলা হলেও স্বল্পসময়ে জনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নিয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা নেই।
- ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত নয়, ব্যাংক এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে।
- প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য না, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তুষ্টির জন্য।
রেডিও তেহরান: জনাব ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ, গত ৭ জুন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছেন। আপনার মতে কেমন হলো এবারের বাজেট?
- ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ : ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটা বড় বাজেট তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বড় বাজেট বলে কথা নয় আসল বিষয়টি হচ্ছে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য বলে আমার মনে হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই বাজেটে নতুন কিছু নেই। বাজেটের ধারবাহিকতায় এটি একটি গতানুগতিক বাজেট। এ বাজেটে নতুন কোনো বিশেষত্ব নেই। যে কারণে আমি বলব যে, সময় এসেছে আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সেজন্য অভিনব আইডিয়া আনতে হবে বাজেটে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়ন, বৈষম্য নিরসনের ব্যাপারে বাজেটে নির্দেশনা থাকতে হবে। কিন্তু সেসব বিষয়ে তেমন কিছু দেখছি না এই প্রস্তাবিত বাজেটে। যেকারণে আমার কাছে এটি একটি সাধারণ বাজেট বলে মনে হয়েছে।
রেডিও তেহরান: নতুন বাজেটে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, বিদেশ-নির্ভরতা কমানোর নামে সরকার জনগণের ওপর প্রতিবছর এমন বিরাট আকারের কর ও শূল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, সরকার বাজেটে আগে খরচ ঠিক করে তারপর আয়ের সংস্থান করে। বিশেষ করে এনবিআরের করের যে বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে তা গতবারের যে রিভাইস টার্গেট ছিল তারচেয়েও ৩২ শতাংশ বেশি। এটা কিভাবে সম্ভব! আমাদের দেশে করের বৃদ্ধিটা শতকরা ১৩ থেকে ১৪ ভাগের বেশি হয় না। অন্যান্য খাত বিশেষ করে গ্যাসেও খুব বেশি কিছু আসবে না। তাছাড়া সরকার পরোক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। ভ্যাট হয়তো তার লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যেতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি আছে ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। তারমধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ধার করবে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মতো। সঞ্চয় পত্র থেকে কিছু আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণের বিষয়টি কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ ব্যাংক এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে। ব্যাংক তার বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। উল্টো সুদের হার বাড়িয়েছে। সেজন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া মানে বেসরকারি খাতগুলো সমস্যায় পড়বে। সেখানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রেডিও তেহরান: অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের পর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এমন সময় ছিল যখন বাজেটের বিশাল একটা অংশ বাস্তবায়নের জন্য বিদেশি সাহায্যের আশায় থাকতে হতো। এখন আর সেটা নেই। তাহলে বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশ-নির্ভরতা কেটে গেছে?
ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, এটা ঠিক যে আমাদের বাজেট আগের মতো বিদেশ নির্ভর নয়। আগে যেমন ৩০ থেকে ৪০/৪৫ ভাগ বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো এখন সেটা ১২ থেকে ২০/২২ ভাগের বেশি না। তবে সেটাও অঙ্কের দিক বেড়ে ছোটো নয়। আর বিদেশি সাহায্য কখন আসে যখন কোনো প্রজেক্টের গুণগত মান ভালো হয় এবং সময় মতো শেষ হয় তখন সেটা আসে। যেমন ধরুন পাইপ লাইনে অনেক টাকা। কিন্তু এবারে সেটি বাস্তবায়নের দিক লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এডিবির কাজের মাত্র ৫২ শতাংশ শেষ হয়েছে। হয়তো কোনোরকমে গোজামিল দিয়ে বলবে ৮০বা ৯০ শতাংশ কাজ হয়েছে। অতএব করসহ অন্যান্য অর্থ সংস্থানের বিষয়গুলো খুব যুক্তিযুক্ত না।
রেডিও তেহরান: ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ আপনি ব্যাংকিং খাতের কথা বলছিলেন। তো ব্যাংকিং খাতে এত অনিয়ম-দুর্নীতি ও যোগসাজশের ফলে ধুঁকতে থাকা ব্যাংক খাত সংস্কারে বাজেটে কোনো উদ্যোগ আছে কী?
ড.সালেহউদ্দীন আহমেদ: ব্যাংকের বিষয়ে বাজেটে কোনো কিছুই নেই। ব্যাংকের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী একেবারে নির্বিকার। ব্যাংক থেকে যে টাকাটা ধার নেবে বলে সরকার জানিয়েছে-এরঅর্থ হচ্ছে ব্যাংক খাত খুব ভালোভাবে চলছে। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণও নিতে পারবে। আসলে ব্যাংকের ব্যাপারে সরকার একেবারেই নির্বিকার। ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়া তো দূরের কথা ব্যাংক প্রাইভেট সেক্টরকে ঋণ দিতে পারবে কি না তাতেও সন্দেহ রয়েছে। আর বাংলাদেশের যেসব সংস্থা বাজেট বাস্তবায়ন করে সক্ষমতা এখনও বাড়ে নি। এনবিাআরের সক্ষমতা একদম বাড়ে নি। তাদের লোকবল কিছুটা বেড়েছে কিন্তু তারা সেই আগের ধাঁচেই কাজ করে। তাছাড়া রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ধরুন বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিটিআরসিএ- তাদের দক্ষতা বাড়ে নি। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা মনিটর করে (আইএন ইডি) তাদের দক্ষতা মোটেও বাড়ে নি। তারমানে কোনোদিকে সামর্থ্য বাড়ে নি।
রেডিও তেহরান: অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন এটা নির্বাচনী বাজেট। প্রশ্ন হচ্ছে- এ বাজেট থেকে কতটা সুবিধা পাবে জনগণ?
ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ: দেখুন, প্রস্তাবিত বাজেটের আলোকে বলা যায় জনগণ বা প্রান্তিক জনগণের ওপর ইতিবাচক তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। বাজেটে ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এতে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে। ভ্যাটের প্রতক্ষ্য প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। তাছাড়া সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ- এসব বিষয়ে বাজেটে তেমন কিছুই নেই। স্বাস্থ্যখাতের জন্য তেমন কোনো কিছুই বাজেটে নেই। সাধারণ মানুষ এমনিতেই স্বাস্থ্যখাত নিয়ে সংকটে আছে। শিক্ষাখাতে ১২ পার্সেন্ট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষা উপকরণ, ক্লাসরুম ডেভালাপমেন্ট, শিক্ষকদের বেতন ভাতা এসব নিয়ে তেমন কোনো কিছুই নেই বাজেটে। তাছাড়া সাধারণ মানুষের বাসস্থান নিয়ে তেমন কোনো কিছুই নেই। ফলে একথা খুব স্পষ্টভাবে বলা যায় আসলে প্রান্তিক বা সাধারণ মানুষের জন্যে বাজেটে কিছু নেই।
বৈষম্য, সম্পদের বন্টন, আয়ের পার্থক্য দূর করার কোনো প্রয়াস নেই বাজেটে।
রেডিও তেহরান: দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবারের বাজেটকে ‘জনগণের রক্ত চোষার ও লুটের বাজেট’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কতটা যৌক্তিক এই বক্তব্য?
ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ: রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বাজেট মন্তব্য কিছুটা রাজনৈতিক হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের বক্তব্যে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে সেটি হচ্ছে এবারের প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য না, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তুষ্টির জন্য এ বাজেট।
একথা ঠিক যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের কল্যাণের জন্য এবারের প্রস্তাবিত বাজেট হয় নি। এছাড়া অর্থনীতিবিদরা এবারের বাজেট নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন বা করছেন সেটি বাজেটের বাস্তব দিকগুলোর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। অতীতের বাজেটের আকার এবং বাস্তবায়নের যে রেকর্ড আছে এবং তার কি প্রভাব পড়ছে সেগুলোর সাথে বর্তমান বাজেটের তুলনা করলে একটা চিত্র ফুটে ওঠে। সেই বাজেটের সাথে বর্তমান বাজেটের কী কী ভালো দিক আছে বা কি নেই সেসবের কোনো পর্যালোচনা নেই। গত বাজেটে ছিল না অথচ এই বাজেটে বিশেষভাবে আনা হয়েছে এমন কোনো নিদর্শন দেখতে পাচ্ছি না। বর্তমান বাজেটে এসডিজি যে গোলের কথা বলা হয়েছে..সেটা দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। কিন্তু বাজেটে দরকার ছিল একবছরের বিষয়গুলো। অথচ জনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো নিয়ে তেমন কোনো নির্দেশনা বাজেটে নেই। একটা সাধারণ গাণিতিক হিসেবে আয়-ব্যায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু বাজেট তো এরকম একটা বিষয় নয়; এরচেয়ে অনেক বেশি কিছু। বাজেটে স্ট্রাটিজি থাকবে, থাকবে পর্যালোচনা, দিক-নির্দেশনা থাকবে। এসব ব্যাপারে আসলে বাজেটে তেমন কিছু দেখছি না।
দেখুন, পৃথিবীর কোনো দেশেই বাজেট নিয়ে এত হৈচৈ করা হয় না। তারা শুধু লক্ষ্য করে বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না? আর সেজন্যই আমরা বাজেট নিয়ে আলোচনা করছি কিন্তু সরকার বাজেটের ব্যাপারে নির্বিকার। অর্থমন্ত্রী এসব ব্যাপারে কথা বলছেন না এমনকি সংসদেও না। মনে হচ্ছে বিষয়গুলো তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে শেষ কথায় বলব গতবার বাজেটে যা হয়েছিল এবারও তার ব্যতিক্রম কিছু নয় এবং এভাবে চলতে থাকবে এমনই একটি ভাব।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৮