সূরা বাকারাহ; আয়াত ২৬৪-২৬৭ (পর্ব ৬৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আল-বাকারাহ'র ২৬৪ থেকে ২৬৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। আল্লাহপাক সূরা বাকারাহ'র ২৬৪ ও ২৬৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا لَا يَقْدِرُونَ عَلَى شَيْءٍ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ (264) وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآَتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِنْ لَمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلٌّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (265
"হে বিশ্বাসীগণ, দানের কথা প্রচার করে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ঐ ব্যক্তির মত নিস্ফল কর না,যে নিজের সম্পদ থেকে লোক দেখানোর জন্য দান করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন শক্ত পাথরের মত, যার ওপর কিছু মাটি থাকে কিন্তু প্রবল বৃষ্টিপাত তা পরিস্কার করে দেয়, ফলে কোন বীজ থেকেই আর গাছ উদগত হয় না এবং যা তারা উপার্জন করেছে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (২:২৬৪)
"যারা আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য ও নিজেদের আত্মার উন্নতির জন্য ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা উচ্চ ভূমিতে অবস্থিত উদ্যানের মত যাতে প্রবল বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল মূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি প্রবল বৃষ্টি না-ও হয়, তবে শিশিরই যথেষ্ট। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন।" (২:২৬৫)
এর আগের কয়েকটি আয়াতে আল্লাহর পথে দান করার জন্য বিশ্বাসী বা মুমিনদেরকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আর এ দুই আয়াতে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দান ও অগ্রহণযোগ্য দানকে দু'টি উপমা দিয়ে বুঝানো হয়েছে। কপট দানশীল ব্যক্তির লোক দেখানো দানকে শক্ত পাথরের ওপর অল্প কিছু নরম মাটির সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর শক্ত পাথরে উদ্ভিদ জন্মে না। তাই তার দানে অন্য মানুষের উপকার হলেও তার নিজের মধ্যে কোন প্রভাব পড়ে না এবং নিজে ঐ দানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। আর যে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুটির উদ্দেশ্যে তথা মানুষের বাহবা পাবার আশা না করেই পবিত্র উদ্দেশ্যে দান করে তাঁর দান উচুঁ ভূমির উচ্চ ফলনশীল জমিতে বোনা বীজের মত। তাতে বৃষ্টি কম বা বেশী যা-ই হোক না কেন নীচু জমির চেয়ে অন্তত দুইগুণ বেশী ফলন হয়। কারণ, এই জমি বৃষ্টির পানিকে খুব ভালভাবে ধরে রাখতে পারে এবং গাছের মূলও এ জমিতে সুদৃঢ়ভাবে বিকাশের সুযোগ পায়।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-
প্রথমত : সৎ উদ্দেশ্যে বা পবিত্র নিয়তে সমাজের জন্য কিছু করা হলে তার মূল্য পাওয়া যাবে। অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বা লোক দেখানোর জন্য করা ভালো কাজের কোন মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।
দ্বিতীয়ত : লোক দেখানো ভাল কাজ কেয়ামত ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না থাকারই প্রমাণ।
এরপর ২৬৬তম আয়াতে বলা হয়েছে-
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَأَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ لَهُ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَأَصَابَهُ الْكِبَرُ وَلَهُ ذُرِّيَّةٌ ضُعَفَاءُ فَأَصَابَهَا إِعْصَارٌ فِيهِ نَارٌ فَاحْتَرَقَتْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآَيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ (266
"তোমাদের কেউ পছন্দ করে যে, তার একটি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে, এর তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে, আর এতে সর্বপ্রকার ফল-মূল থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌছবে, তার দুর্বল সন্তান সন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানের একটি অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিবায়ু আসবে, অনন্তর বাগানটি ভষ্মীভূত হয়ে যাবে। এমনিভাবে আল্লাহ তা'লা তোমাদের জন্যে নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেন- যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।" (২:২৬৬)
এই আয়াতেও একটি উপমা তুলে ধরা হয়েছে। কোন ব্যক্তি যখন লোক দেখানোর জন্য ভালো কাজ করে, কিন্তু এরপর অন্যকে কথা ও কাজে কষ্ট দেয়, এ ধরনের লোক যেন নিজেই নিজের কাজের ফল নষ্ট করে। দরিদ্র ও বঞ্চিতদেরকে দান করা হলো মানব-সমাজের বাগানে গাছ লাগানোর মত। খুব কষ্টকর এই কাজের প্রতিদান ও ফল রয়েছে। কিন্তু যদি এই কাজে সাবধানতা অবলম্বন করা না হয় এবং লোক দেখানোর মত সমস্যা এর সাথে যুক্ত হয় তাহলে এর কল্যাণ অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। পরিণামে দুর্ভোগ ও অনুতাপ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, একদিন মহানবী (সা.) মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বললেন,আল্লাহকে স্মরণ কর। প্রতিবার আল্লাহর জিকর বা আল্লাহর স্মরণের ফলে বেহেশতে তোমাদেরকে একটি গাছ দেয়া হবে। মুসলমানদের মধ্যে একজন বলল, তাহলে আমরা বেহেশতে অনেক বাগানের মালিক হয়ে যাব। নবী (সা.) বললেন, অবশ্য যে মুখ দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর, তা দিয়েই গীবত বা পরচর্চার কারণে সমস্ত গাছ পুড়ে যায়। বিচার দিবস বা কিয়ামতের দিন মানুষ সৎ কাজের মুখাপেক্ষী হবে। আর কিয়ামতের দিন যদি কেউ দেখতে পায় যে কপটতা এবং লোক দেখানো মানসিকতার কারণে তার কোন দান এমনকি কোন প্রার্থনা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি তাহলে তা কতই না বেদনাদায়ক হবে!
এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিক হলো, ভালো কাজ করে তা নিয়ে অহংকার করতে নেই। কারণ অন্য কোন খারাপ কাজ ভাল কাজের ফল ধ্বংস করে দেয়। অনেক কষ্ট করে গাছ লাগানোর পর বাগানের গাছ বড় হয় এবং ফলবান হয়। কিন্তু আগুনের কারণে এক মুহূর্তের মধ্যে বাগান পুড়ে যেতে পারে।
এরপরের আয়াত অর্থাৎ ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ وَلَسْتُمْ بِآَخِذِيهِ إِلَّا أَنْ تُغْمِضُوا فِيهِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ (267
"হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা যা উপার্জন কর ও যা আমি ভূমি থেকে উৎপাদন করি, তার মধ্যে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় কর এবং তা থেকে এমন মন্দ বস্তু ব্যয়ের ইচ্ছা কর না, যা তোমরা চোখ বন্ধ করে বা একান্ত অনিচ্ছায় গ্রহণ কর। জেনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী নন। তিনি মহাসম্পদশালী ও প্রশংসিত।" (২:২৬৭)
গরীব ও বঞ্চিতদেরকে কি দান করা উচিত এ নিয়ে মুসলমানরা রাসুল (সা.) কে প্রায়ই প্রশ্ন করতো। এই আয়াতে একটি সামগ্রীক নিয়ম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ভালো বা উৎকৃষ্ট সম্পদ থেকে দান করতে হবে। আয়-উপার্জন বা ব্যবসা থেকে যে টাকা বা সম্পদ অর্জিত হয় কিংবা ক্ষেত খামার থেকে যে ফসল উৎপাদিত হয়, তা থেকে দান করা উচিত। যেসব খাবার বা পোশাক পূরোনো বা মূল্যহীন হয়ে গেছে, সে সব অন্যদের দান করা উচিত নয়। মদীনার কোন কোন মানুষ শুকনো ও অপেক্ষাকৃত নষ্ট খেজুর ফকিরদের দান করে ভালো খেজুর নিজেদের জন্য রেখে দিত। তাদেরকে তিরস্কার করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যা ফকিরদেরকে দিলে তা যদি তোমাদেরকেই দেয়া হতো, তাহলে কি তোমরা সে সব গ্রহণ করতে?
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো-
প্রথমত : দান খয়রাতের ক্ষেত্রেও গরীবদের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। মূল্যহীন ও আজে বাজে জিনিস দান করার অর্থ হলো অন্যদের অসম্মান করা।
দ্বিতীয়ত : দানের উদ্দেশ্য হলো কৃপণতা থেকে মুক্তি পাওয়া, অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছ জিনিস থেকে পরিত্রাণ পাওয়া নয়।
তৃতীয়ত : মানুষের বিবেক অন্যদের সাথে আচরণে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। যা আমরা পছন্দ করে না, তা যেন অন্যদের দান না করি।#