এপ্রিল ২৪, ২০১২ ১০:০৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৪৪ থেকে ৪৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৪ ও ৪৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يَشْتَرُونَ الضَّلَالَةَ وَيُرِيدُونَ أَنْ تَضِلُّوا السَّبِيلَ (44) وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِأَعْدَائِكُمْ وَكَفَى بِاللَّهِ وَلِيًّا وَكَفَى بِاللَّهِ نَصِيرًا (45)

"আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ বা তাওরাত পেয়েছিল, কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ কিনে নিয়েছে এবং তারা চায় আপনিও পথভ্রষ্ট হন।" (৪:৪৫)

"আল্লাহ আপনার শত্রুদের অবস্থা ভালোভাবে জানেন, আল্লাহই অভিভাবক এবং সাহায্যকারী হিসেবে যথেষ্ট৷" (৪:৪৫)

এই দুই আয়াতে একদল ইহুদী পণ্ডিতের কথা বলা হচ্ছে, যারা ইসলামের আবির্ভাবের সময় মদীনায় ছিলেন আল্লাহর বাণী সম্পর্কে জানার কারণে তারা ইসলামের নবী ও পবিত্র কোরআনের প্রতি সবার আগে ঈমান আনবেন এটাই ছিল স্বাভাবিক এবং কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু এর পরির্বতে তারা প্রথম থেকেই নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে এমনকি মক্কার মুশরিকদের সাথেও তারা ঐক্যবদ্ধ হয়। এই আয়াতে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এই ইহুদী পণ্ডিতরা তাওরাত বা ঐশী বাণীর সাথে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিজেদের ও অন্যদের জন্য মুক্তি এবং সৌভাগ্যের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেনি। বরং তারা অন্যদের পথভ্রষ্ট করতো এবং তাদের ঈমানের পথে বাধা সৃষ্টি করতো, এরপর মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলছেন, তোমরা তাদের শত্রুতার জন্য ভয় পেয়ো না। কারণ, তারা আল্লাহর কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত নয়। আর তোমাদের জন্যে রয়েছে আল্লাহর সাহায্য।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে- শুধুমাত্র আল্লাহর বাণী ও তাঁর বিধান সম্পর্কে জ্ঞানই মুক্তি এবং সৌভাগ্য অর্জনের জন্যে যথেষ্ট নয়। অনেক ধর্মীয় পণ্ডিত নিজেরাও পথভ্রষ্ট ছিলেন এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করেছেন। মুসলিম সমাজের আসল শত্রুরা ধর্ম ও জনগণের বিশ্বাসের শত্রু৷ তারা সমাজের ভেতরে থাকুক বা বাইরেই থাকুক তাতে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহর সাহায্য পাবার শর্ত হলো, তার মনোনীত প্রতিনিধি তথা ধর্মীয় নেতার আনুগত্য করা। নিজের বা অন্যদের বস্তুগত বা দুনিয়াবী শক্তির ওপর নির্ভর করলে আল্লাহর সাহায্য পাওয়া যাবে না।

সূরা নিসার ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ وَيَقُولُونَ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَاسْمَعْ غَيْرَ مُسْمَعٍ وَرَاعِنَا لَيًّا بِأَلْسِنَتِهِمْ وَطَعْنًا فِي الدِّينِ وَلَوْ أَنَّهُمْ قَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَاسْمَعْ وَانْظُرْنَا لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَأَقْوَمَ وَلَكِنْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًا (46

"ইহুদীদের মধ্যে কিছু লোক মূল অর্থ থেকে তাদের কথার মোড় ঘুরিয়ে নেয় এবং বলে আমরা শুনেছি, কিন্তু অমান্য করছি ৷ তারা মহানবীর উদ্দেশ্যে বেয়াদবী করে আরো বলে, শোন, না শোনার মত। মুখ বাঁকিয়ে ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তারা বলে "রায়িনা" বা আমাদের রাখাল। অথচ তারা যদি বলতো যে, আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি এবং যদি বলতো শোন ও আমাদের প্রতি লক্ষ্য কর তবে তা তাদের জন্য ভালো ও সংগত হতো। কিন্তু আল্লাহ তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন, তাদের কুফরীর জন্য। তাই তাদের অতি অল্প সংখ্যকই ঈমান আনবে।" (৪:৪৬)

ইসলামের শত্রুরা এই পবিত্র ধর্মের বিরোধীতা করেছে বিভিন্ন কুৎসিত পন্থায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা। এই আয়াতে এই সব বিদ্রুপের কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের অকাট্য যুক্তির মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েই তারা এভাবে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করত। যেমন- কোন কোন ইহুদী রাসূল (সা.)'র সঙ্গে কথা বলার সময় এমন সব শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করত, যার ভাল ও মন্দ দু'রকম অর্থই হতে পারে। এরা অবশ্য মুখ বিকৃত করে মন্দ অর্থেই ওই শব্দগুলো উচ্চারণ করতো। অথচ এমন ভাবও দেখাতো যে, তারা এসব ভালো অর্থেই বলছে।

মুসলমানরাও প্রতারিত হয়ে রাসূল (সা.)'কে যেন এসব বাক্যে সম্বোধন না করে সেজন্যে এই আয়াত উল্লেখিত কয়েকটি শব্দ ছাড়াও সূরা বাকারার ১২ নম্বর রুকুতে "রায়িনা" শব্দটি দিয়ে রাসুলে খোদাকে সম্বোধন না করতে মুসলমানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এসব ইহুদীরা রাসুলে খোদার সামনে বলতো "সামেনা" ও "আসাইনা"। এর অর্থ আমরা শুনেছি ও তা অমান্য করেছি। এর ভালো অর্থ হচ্ছে আমরা অপনার বাণী শুনেছি এবং আপনার বিরোধীদের বিভ্রান্তিমূলক কথা অমান্য করেছি। কিন্তু এর খারাপ অর্থ হলো, আমরা আপনার কথা শুনেছি সত্য, কিন্তু আমরা তা আমল করবো না৷ দ্বিতীয় একটি বাক্য যা ঐ ইহুদীরা রাসূলের সামনে বলতো তা হলো, তোমরা আমার কথা শোন এবং আল্লাহ করুন, তোমাদেরকে তিনি যেন কোন কথাই না শোনান। এর ভালো অর্থ হলো, কোন কষ্টদায়ক কথা যেন শোনানো না হয়, অর্থাৎ আপনি যাই বলুন তার উত্তরে যেন আপনাকে কোন খারাপ কথা শুনতে না হয়। বরং যেন ভালো কথাই শোনেন। আর এর খারাপ অর্থ হলো, অনুকুল ও আনন্দদায়ক কোন কথাই যেন আপনাকে না শোনানো হয়৷ তৃতীয় বাক্য 'রায়েনা'র ভালো অর্থ হলো, আমাদের দিকে লক্ষ্য রাখুন বা আমাদেরকে বোঝার জন্য আরো সময় দিন৷ এর মন্দ অর্থ হলো, বোকা বানানো। ইহুদীদের ভাষায় এটি একটি গালি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ইহুদীরা এসব দ্ব্যর্থবোধক কথা বলার পরিবর্তে স্পষ্ট শব্দগুলো ব্যবহার করতে পারতো। যেমন- তারা সামেনা ও আসাইনার পরিবর্তে বলতে পারতো সামেনা ও আতাইনা অর্থাৎ আমরা শুনে নিয়েছি এবং মান্যও করেছি।

"ইসমা গাইরা মুসমার" পরিবর্তে শুধু ইসমা বা আপনি শুনে নিন বলতে পারতো এবং রায়েনার পরিবর্তে বলতে পারতো উনজুরনা অর্থাৎ আমাদের মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রাখুন। কিন্তু তারা এসব সমোয়োচিত ও মঙ্গলজনক কথা না বলে বিদ্রুপাত্বক কথাগুলো বলেছে। রাসূলের মনে কষ্ট দেয়ার জন্যে ঐসব ইহুদীরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়৷ তাই তারা ঈমান আনতে পারেনি। কিন্তু যেসব ইহুদী এসব কাজ থেকে দূরে ছিল তারা ঈমান আনতে পেরেছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমতঃ বিরোধীদের সাথেও ন্যায় আচরণ করতে হবে। এ আয়াতে সব ইহুদীদের নিন্দা করা হয়নি। একদল ইহুদীর খারাপ কাজের দায় তাদের সবার ওপর চাপানো যায় না।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় বিধানই হোক বা ধর্মীয় নেতাই হোক তাদের কারো উদ্দেশ্যেই ঠাট্রা বিদ্রুপ করা জায়েজ নয়।

তৃতীয়তঃ মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণ নবীদের দাওয়াত গ্রহণ এবং খোদায়ী বিধান মেনে চলার ওপরই নির্ভর করছে।

সূরা নিসার ৪৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ آَمِنُوا بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًا لِمَا مَعَكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَطْمِسَ وُجُوهًا فَنَرُدَّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا أَوْ نَلْعَنَهُمْ كَمَا لَعَنَّا أَصْحَابَ السَّبْتِ وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا (47)

"হে আহলে কিতাব! ইসলামের নবীর কাছে আমরা যা নাজিল করেছি, তার ওপর অর্থাৎ পবিত্র কোরআনের ওপর ঈমান আন যা তোমাদের কাছে অবতীর্ণ গ্রন্থগুলোর সত্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। এর ওপর বিশ্বাস কর, এমন হবার আগেই যখন আমি মুছে দিব অনেক চেহারা তারপর তাদেরকে পেছন থেকে উল্টিয়ে দেব, যেমন করে অভিশপ্ত করেছি শনিবার অমান্যকারী ইহুদীদেরকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হবেই।" (৪:৪৭)

আগের আয়াতে আহলে কিতাব ও বিশেষ করে ইহুদীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যের পর এ আয়াতেও তাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে, তোমরা তো আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে পরিচিত, তাই তোমাদের উচিত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা। তোমরা তো মুশরিক বা অংশীবাদীদের মত নও যে, আল্লাহর ওপর ঈমানের অভিজ্ঞতা তোমাদের রয়েছে। এছাড়াও ইসলাম ধর্মের গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের সাথে তোমাদের ধর্মীয় গ্রন্থেরও মিল ও সমন্বয় রয়েছে। কারণ, এসব গ্রন্থই একই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। এরপর আল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তোমরা হিংসা ও একগুঁয়েমীর কারণে সত্যকে উপেক্ষা করে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের চিন্তা ও মানবীয় প্রকৃতিকেই উপেক্ষা এবং বিকৃত করেছ। আর এর ফলে, তোমাদের মানবীয় চেহারা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। মানুষের চিন্তা ভাবনা ও অভ্যাস শরীর ও চেহারায় প্রভাব ফেলে৷ তাই পবিত্র কোরআনে সত্য থেকে মানুষের দূরে থাকাকে চেহারা বিকৃত হওয়া এবং ক্রমেই মানবীয় চেহারা মুছে যাওয়ার সাথে তুলনা করেছে যা তাকে অধঃপতন ও চূড়ান্ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : অন্য ধর্মের অনুসারীদেরকে ইসলামের দিকে আহবানের সময় তাদের ভাল দিকগুলোকে স্বীকৃতি দেয়া ও মেনে নেয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত : সমস্ত খোদায়ী ধর্মের শিক্ষা এবং নবীদের বক্তব্য মূলত একই এবং এসবের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যেও কোন পার্থক্য নেই।

তৃতীয়ত : ইসলাম ধর্ম একত্ববাদী অন্যান্য ঐশী ধর্মের অনুসারীদেরকেও আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আআহ্বান জানায়।

চতুর্থত : ধর্মকে অবমাননার জন্য পৃথিবীতেই শাস্তি নেমে আসে। #