সূরা আন নিসা; আয়াত ৪৮-৫২ (পর্ব ১৪)
পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৪৮ থেকে ৫২ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا (48)
"আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, এ ছাড়া যাকে ইচ্ছে তার পাপ ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর শরীক করে সে মহাপাপ করল।" (৪:৪৮)
আগের আয়াতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের উদ্দেশ্যে কিছু সাবধান বাণী উচ্চারণের পর আল্লাহ এ আয়াতে মুসলমানদেরকেও এটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, যেসব বিশ্বাস বা কাজ মানুষকে খাঁটি একত্ববাদ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় অর্থাৎ মানুষ যেসব কাজ বা বিশ্বাসের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে অন্যকিছু বা কাউকে শরীক করে সেসব বড় গোনাহ। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু হওয়া সত্ত্বেও এইসব গোনাহ ক্ষমা করবেন না। কারণ, অংশীবাদিতা মানুষের ঈমানের ভিত্তিকে নষ্ট করে দেয়। আল্লাহর ক্ষমাশীলতা বলতে এখানে যা বোঝানো হয়েছে তা হলো, ক্ষমা না চাইলেও বা তওবা না করলেও আল্লাহ কোন কোন পাপ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু আল্লাহ শির্কের অপরাধ তওবা করে পুনরায় ঈমান না আনা পর্যন্ত ক্ষমা করেন না। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী পবিত্র কোরআনের এ আয়াত মুমিনদের জন্য সবচেয়ে আশাব্যাঞ্জক। কারণ, মুমিনদের গোনাহ যত বড় বা বেশীই হোক না কেন, তাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো, শির্ক মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অংশীবাদী নিজেই নিজেকে আল্লাহর বিশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত করে। আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার অর্থ হলো, আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলা এবং এটা আল্লাহর ওপর সবচেয়ে বড় অপবাদ।
সূরা নিসার ৪৯ ও ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللَّهُ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَلَا يُظْلَمُونَ فَتِيلًا (49) انْظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَكَفَى بِهِ إِثْمًا مُبِينًا (50)
"তুমি কি তাদের দেখনি? যারা নিজেদের পবিত্র ও নিষ্পাপ মনে করে? বরং আল্লাহই যাঁকে ইচ্ছা তাঁকে পবিত্র করেন, তাদের ওপর বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না।(৪:৪৯)
"লক্ষ্য কর, তারা কিভাবে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করছে এবং এটিই প্রকাশ্য পাপ হিসেবে যথেষ্ট।" (৪:৫০)
এই আয়াতে আল্লাহ তা'লা বলছেন- তোমরা কেন একে অপরকে বিভ্রান্ত এবং নিজেদেরকে সব সময় সঠিক ও নির্ভুল মনে করছ? অথচ আল্লাহ তোমাদের মনের খবর জানেন। তোমাদের মধ্যে কারা প্রশংসা পাবার যোগ্য সেটাও আল্লাহই ভালো জানেন। আল্লাহই কাজের মাধ্যমে মানুষকে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করেন এবং তাদের প্রশংসা করেন। অন্যকথায়, আল্লাহ যেসব বৈশিষ্ট্যকে ভালো মনে করেন, সেসবই হচ্ছে সৎগুণ। স্বার্থপর ও অহংকারী লোকেরা যেসব বিষয়কে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বলে মনে করে সেগুলো সৎগুণ নয়। এ ধরনের মানুষ ঐসব খারাপ দিককে আল্লাহর ওপরও চাপিয়ে দেয়। এসব হলো, আল্লাহর ওপর মিথ্যা চাপিয়ে দেয়া তথা আল্লাহকে অপবাদ দেয়া। ধার্মিক লোকেরা ধর্ম পালন করতে অহঙ্কারী হয়ে পড়লে তবে তা হবে মারাত্মক বিপর্যয়। এটা এমন এক বড় বিপদ যা ঐশী ধর্মের প্রত্যেক অনুসারীকেই ফাঁদে ফেলতে পারে। ইসলাম ধর্ম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে উন্নত বলে এটা ধরে নেয়া যায় না যে, প্রত্যেক মুসলমানই অন্যদের চেয়ে ভালো। অর্থাৎ এ আয়াতে ধর্মীয় অহঙ্কারের বিপদ থেকে দূরে থাকতে মুসলমানদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে। হযরত আলী (আ.) বলেছেন, "খোদাভীরু লোকেরা প্রশংসা শুনে ভয় পায়।" খোদাভীরু লোকেরা আত্ম প্রশংসা তো করেনই না, বরং কেউ প্রশংসা করলে অহংকার সৃষ্টির ব্যাপারে ভয় করেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : আল্লাহ যদি কোন মানুষের প্রশংসা করেন সেটাই গ্রহণযোগ্য ও মূল্যবান। আত্ম প্রশংসার কোন মূল্য নেই।
দ্বিতীয়ত : নিজের প্রশংসা ও প্রচার অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। এটা আল্লাহর দাসত্বের চেতনারও পরিপন্থী।
তৃতীয়ত : নিজেকে আল্লাহর কাছাকাছি বা অতি ঘনিষ্ঠ মনে করার অর্থ হলো, আল্লাহর ওপর সবচেয়ে বড় অপবাদ দেয়া। এ ধরনের অহঙ্কারের জন্য কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।
সূরা নিসার ৫১ ও ৫২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آَمَنُوا سَبِيلًا (51) أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَنْ يَلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا (52)
"তুমি কি তাদের লক্ষ্য করোনি, যারা ঐশি গ্রন্থের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, তারা মূর্তি এবং শয়তানদের বিশ্বাস করেছে? তারা অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে বলে আমরা তো ইসলামের প্রতি বিশ্বাসীদের চেয়ে বেশী সুপথগামী। (৪:৫১)
"এদের ওপরই আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে অভিশাপ দেন তুমি তার জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।" (৪:৫২)
ইতিহাসে এসেছে ওহুদ যুদ্ধের পর মদীনার একদল ইহুদী মক্কায় গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাথে জোটবদ্ধ হয়। তারা মুশরিকদের সুদৃষ্টি পাবার জন্য তাদের মূর্তিগুলোকে সেজদা করে এবং বলে যে, মূর্তিপূজা মুসলমানদের ঈমানের চেয়ে ভালো। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে না বলে ইহুদীরা মহানবীর সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তারা সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোরাইশদের সঙ্গে ঐক্যজোট গঠন করে। এ থেকে বোঝা যায়, ইহুদীরা নিজেদের অশুভ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের নীতি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল। ইহুদীরা ঐশী ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের অনুসারী বলে দাবি করা সত্ত্বেও মূর্তিপূজারীদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাসকে ইসলামের চেয়ে উত্তম বলে ঘোষণা দেয়, এমনকি তারা ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য মুশরিকদের সঙ্গে জোট বাঁধে। এত বড় অপরাধের জন্য আল্লাহ তাদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : ইহুদীরা ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে শত্রুতার জন্যে ধর্মহীন কাফেরদের সঙ্গেও ঐক্যজোট করতে প্রস্তুত। তাই তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকা উচিত।
দ্বিতীয়ত : হিংসা ও ঘৃণা মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। যারা ইসলামের সাথে শত্রুতা করছে তারা ইসলাম ধর্মকে খারাপ মনে করে তা করছে না। ইসলাম ধর্ম তাদের জড়বাদী অশুভ লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা বলেই তারা এর বিরোধী।
তৃতীয়ত : মানুষের প্রকৃত সাহায্যকারী হলেন আল্লাহ। কেউ যদি নিজের খারাপ কাজের জন্য আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে যেন নিজেই নিজেকে সাহায্যকারী থেকে দূরে সরিয়ে নিল।#